• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২০, ১৬ কার্তিক ১৪২৭, ১৪ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

করোনার আঘাত বিশ্বজুড়ে

বিভিন্ন দেশে ৭০ হাজার রোগী সুস্থ হয়েছেন

বাংলাদেশে আক্রান্ত দু’জন সুস্থ তবে বাড়ি ফিরলেন একজন

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , রোববার, ১৫ মার্চ ২০২০

image

একুশ শতকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মহামারী হিসেবে আঘাত হানা এই ভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্বে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের ১২৩টি দেশে আঘাত হানা এই ভাইরাসে ৫ হাজারের অধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতা বিবেচনায় এটিকে নিরাময়যোগ্য প্যানডেমিক বা ‘অতিমারী’ (মহামারীর চেয়েও ভয়াবহ) ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রী-এমপি কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না করোনা। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশ বিমান-সড়ক- নৌ-স্থলবন্দর দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিচ্ছে। ইন্টারনেট ছাড়া দেশগুলো কার্যত একে অন্য থেকে বিচ্ছিন্ন। খেলাসহ বড় বড় (ইভেন্ট) অনুষ্ঠানগুলো স্থগিত। বিভিন্ন দেশের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে বিশ্বে ৭০ হাজার রোগী সুস্থ হয়েছেন বলে জানা গেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে শুরু করে দৈনিক আয়-রোজগারেও করোনার ধাক্কা। করোনার প্রভাবে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব শেয়ারবাজারে ধস, ট্যুরিজম-এভিয়েশন, শিল্প-কারখানা, আমদানি-রপ্তানিসহ আর্থিক খাতে স্মরণকালের সর্বোচ্চ ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশংকাজনকহারে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও বাংলাদেশে অবশ্য কিছুটা কম। কিন্তু ভাইরাস আতঙ্কে জনসমাগম, গণপরিবহন কিংবা বিপণি-বিতানগুলো ক্রমেই ফাঁকা হচ্ছে। সব মিলিয়ে এক বড় ধরনের নেতিবাচক ও ক্ষতিকর পরিস্থিতির দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে পুরো বিশ্ব।

একুশ শতকের ত্রাস করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া অনেকেই অবশ্য সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরেছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৭০ হাজার রোগী সুস্থ হয়েছেন বলে জানা গেছে। অনেকেই স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইনে গেছেন। চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা করোনা থেকে বাঁচতে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে এই ভাইরাসের ভয় সবার ভিতরেই বাসা বেধেছে।

গতকাল রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, করোনায় আক্রান্তের পর যে দু’জন সুস্থ হয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন বাড়ি ফিরেছেন। সুস্থ আরেকজন বাড়ি যাননি। কারণ তার পরিবারের একজন অসুস্থ এবং বাড়িতে পরিবারের সদস্যরা সবাই কোয়ারেন্টাইনে আছেন। সে জন্য তাকে হাসপাতালেই রাখা হয়েছে। বাকি আরেকজনের রিপোর্ট এখনও পজিটিভ আসেনি।

আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ২৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। আর এখন পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে মোট ১৮৭ জনের। তবে নতুন করে কারও শরীরে করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল (ইউরোপীয় সেন্ট্রাল টাইম) পর্যন্ত বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৬৭ জন। আর মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৯৪৭ জনের।

তবে চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন (সিএনএইচসি) ওয়েব সাইডে সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী (নিউজটি লেখা পর্যন্ত), ৫ হাজার ৫২ জন এই রোগে প্রাণ হারিয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৯৬ জন। রিকভার্ড (সুস্থ হয়েছেন) ৭০ হাজার ১৭২ জন।

একবিংশ শতাব্দির প্রথম দুই দশকেই সার্স, মার্স, ডেঙ্গু, জিকা, ইবোলার মতো মারণ ভাইরাসের মুখে পড়েছে পৃথিবী। ২০০২ সাল থেকে চীনে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৭৭৪ জনের মৃত্যু এবং ৮০৯৮ জন সংক্রমিত হয়েছিল। অবশ্য সেটিও ছিল এক ধরনের করোনাভাইরাস। তবে একুশ শতকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মহামারি হিসেবে আঘাত হেনেছে নভেল করোনা ভাইরাস। ২০২১ সালের শুরুতে নতুন শতকের আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে করোনাভাইরাস। মানবজাতির সামনে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে সম্প্রতি হাজির হয়েছে করোনা ভাইরাস।

আক্রান্ত ও সুস্থ

বিভিন্ন দেশের দেয়া করোনাভাইরাস সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ ভাইরাসে চীনে ৮০ হাজার ৮১৪ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এতে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ১৭৭ জনের। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন ৬৪ হাজার ১৩১ জন। এখনও চিকিৎসাধীন আছেন ১৩ হাজার ৫০৬ জন। এদের মধ্যে ৪ হাজার ২০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। চীনের পরে বেশি ক্ষতি হয়েছে ইতালিতে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১৮৯ জনসহ দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৬ জনে। বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যাও। দেশটিতে আক্রান্ত ১৫ হাজার ১১৩ জনের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ২৫৮ জন। এখনও চিকিৎসাধীন ১২ হাজার ৮৩৯ জন। এদের মধ্যে ১ হাজার ১৫৩ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইতালির পর ইরানে করোনাভাইরাস প্রাণ কেড়েছে ৪২৯ জনের। সেখানে ১০ হাজার ৭৫ জন আক্রান্তের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ২৭৫ জন। এখনও চিকিৎসাধীন ৬ হাজার ৩৭০ জন। দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫১০, স্পেনে ১৮৯, জাপানে ১১৮, সিঙ্গাপুরে ৯৬, হংকংয়ে ৭৭, থাইল্যান্ডে ৩৫, বাহরাইনে ৩৫, মালয়েশিয়ায় ৩২, যুক্তরাষ্ট্রে ৩১, মিসরে ২৭, অস্ট্রেলিয়ায় ২৬, জার্মানিতে ২৫, ইরাকে ২৪, তাইওয়ানে ২০, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০, যুক্তরাজ্যে ১৮ ও ভিয়েতনামে ১৬ জনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরা সুস্থ হয়ে উঠছেন।

বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষের মতোই মন্ত্রী-এমপিরা আক্রান্ত হচ্ছেন করোনায়। সর্বশেষ তথ্যনুযায়ী, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী সোফি গ্রেগয়ের ট্রুডো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার শরীরে করোনাভাইরাসের কারণে দেখা দেয়া কোভিড-১৯ রোগের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে তিনি নির্ধারিত সময় আইসোলেশনে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সুস্থই আছেন। তবে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে তিনিও ১৪ দিন আইসোলেশনে থাকবেন। মারাত্মক ছোঁয়াচে এই রোগে ব্রিটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাদিন ডরিস আক্রান্ত হয়েছেন। করোনায় ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, হস্তশিল্প ও পর্যটনমন্ত্রী এবং শিল্প, বাণিজ্য ও খনিমন্ত্রী আক্রান্ত হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার ডাটন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পর এ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। অনেক নামী ব্যক্তিত্বও আক্রান্ত হয়েছেন এই ভাইরাসে।

অর্থনীতিতে প্রভাব

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী না পাওয়া গেলেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। গতকাল রাজধানীর শাহ আলী মার্কেট, মুক্তবাংলা মার্কেট, কো-অপারেটিভ মার্কেট, ফরচুন শপিংমল, মৌচাক মার্কেট, আনারকলি মার্কেট, ইস্টার্ন প্লাজা, গাজী ভবন শপিং সেন্টার, পাওয়েল মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতা নেই। বিপণি-বিতানগুলো প্রায় ফাঁকা।

আনারকলি মার্কেটের দোকানি হাবিব আহমেদ বলেন, দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর খবর প্রকাশের পর থেকেই বলতে গেলে ক্রেতা নেই। গতকাল অন্তত ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার বেচা-কেনা হয়। কিন্তু আজ এখন পর্যন্ত মাত্র ৮০০ টাকা বিক্রি করেছি।

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্কে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ইতালিতে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে প্রায় সব দোকান। ভারতও প্রায় সব ধরনের ভিসা বন্ধ করেছে। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোও একই রীতি অনুসরণ করছে। অর্থাৎ বিমান চলাচল স্থগিত করে দিচ্ছে। অনেক দেশে পণ্যের আমদানি-রপ্তানিও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের এক গবেষণায় জানা যায়, চলতি বছরের মধ্যেই বিশ্ব পুঁজিবাজার বিগত ১১ বছর ধরে চলমান সম্প্রসারণ হারাবে। ভাইরাস বিস্তারের আগে থেকেই জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির অর্থনীতি সংকোচন চক্রে পড়ে। এর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি বাড়তি নেতিবাচক অবস্থা যোগ করে এসব দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ক্রীড়াঙ্গনে প্রভাব

করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে। ইতালিতে সব ধরনের ম্যাচ স্থগিতের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কাতার বিশ্বকাপের বাছাইয়ের ম্যাচ স্থগিত হয়েছে। স্থগিত করা হয়েছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ। বাংলাদেশের আর্চারি, সাইক্লিং ও ভলিবলের বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট স্থগিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ গেমস স্থগিত করে দিয়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ)। ফুটবলের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ও ইউরোপা লীগের ম্যাচ স্থগিত করা হয়েছে। ভারতে আইপিএলও স্থগিত করে দেয়া হয়েছে।