• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬, ১২ শাবান ১৪৪১

বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণে অনিয়ম ও প্রতারণা

সংবাদ :
  • রাকিব উদ্দিন

| ঢাকা , রোববার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

image

সরকারের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপতে গিয়ে অনিয়ম ও প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাপাখানার মালিকরা। তারা পাঠ্যবই ছাপার কাজে নিম্নমানের কাগজ, কালি ও বাঁধাইয়ে নিম্নমানের গ্লু (আঠা) ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ এনসিটিবির কিনে দেয়া কাগজের পরিবর্তে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি ১০টি প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যবই মুদ্রণে অনিয়ম ও প্রতারণার প্রমাণ পেয়েছে এনসিটিবির মনিটরিং টিম। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের দায়িত্বে থাকা ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড’ (এনসিটিবি) কয়েক দফা সতর্ক করলেও অসাধু ছাপাখানার মালিকরা তা আমলে নিচ্ছেন না।

সরকার ২০২০ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের চার কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ৩৫ কোটি ৩১ লাখ ৪৪ হাজার ৫৫৪ কপি বই ছাপছে। এরমধ্যে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ কোটি ৫৪ লাখ দুই হাজার ৩৭৫ কপি এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ১৭৯ কপি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। আগামী বছর ১ জানুয়ারি সারাদেশে একযোগে ‘পাঠ্যপুস্তক উৎসব’ আয়োজন করে এসব নতুন বই সব স্কুলে বিতরণ করা হবে। এনসিটিবির তিনটি মনিটরিং টিমের সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ১০টি ছাপাখানার মালিককে সতর্ক করা হয়েছে এনসিটিবির পক্ষ থেকে। প্রিন্টিং প্রেসগুলোর মধ্যে ভাই ভাই, নুরুল ইসলাম, শিশির, বলাকা, সমা, পলাশ, আবুল, টাঙ্গাইল ও লেটার অ্যান্ড কালার অন্যতম। এগুলোর দু’টিকে মৌখিকভাবে এবং বাকিগুলোকে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছে। এরমধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানকে দু’দফা সতর্ক করার পরও প্রতিষ্ঠানটি নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার চেষ্টা করছিল। একই কারণে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের দশ হাজার কপি বই বাতিল ও অপর একটি প্রতিষ্ঠানের কিছু বই ধ্বংস (কেটে ফেলা) করা হয়েছে। আর ছপি অস্পষ্ট ছাপায় একটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ হাজার কপি বই বাতিল করা হয়েছে।

এছাড়া একটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ছাপাখানায় বই না ছেপে অন্যের ছাপাখানা ভাড়া করে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার টেষ্টা করছিল। এনসিটিবির মনিটরিং টিম এই দু’টি প্রতিষ্ঠানকেই সতর্ক করার পাশাপাশি নিজ প্রতিষ্ঠানে বই ছাপতে বাধ্য করছেন। আগামীতে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে বলে এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ন চন্দ্র সাহা সংবাদকে বলেছেন, ‘এটা চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। কেউ ছাপায় ত্রুটি করলে বা ছবি অস্পষ্ট হলে, খারাপ কাগজ ব্যবহার করলে, বাঁধাই ভালো না করলে কিংবা অন্য অনিয়ম করলে তাদের সতর্ক করা হয়। আমাদের মনিটরিং টিমগুলো নিয়মিত ছাপাখানায় যাচ্ছেন, অনিয়ম ও ত্রুটি পেলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। গুরুতর অনিয়ম করলে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

২০২০ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ কার্যক্রম মনিটরিংয়ের (তদারক) জন্য মোট ৩৩টি তদারক ও পর্যবেক্ষণ টিম গঠন করেছে এনসিটিবি। টিমগুলো পুরোদমে কাজ শুরু করেছে। এবার বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ পেয়েছে সারাদেশের প্রায় আড়াইশ’ ছাপাখানা। বিদেশি কোন প্রতিষ্ঠান এবার বই ছাপার কাজ পায়নি। কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোদমে বই ছাপার কাজ করছেন। ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক বই ছেপে উপজেলাপর্যায়ে সরবরাহ করেছেন ছাপাখানার মালিকরা।

তদারক ও পর্যবেক্ষণ টিমগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করছেন এনসিটিবির সদস্য (টেক্সট) প্রফেসর ফরহাদুল ইসলাম। তিনি সংবাদকে বলেছেন, ‘দেশীয় বাজারে গত বছরের চেয়ে এবার প্রতি টন কাগজের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা কম। এরপরও অতি মুনাফার লোভে এক শ্রেণীর প্রিন্টার্স (ছাপাখানার মালিক) সরকারের বই ছাপায় নানারকম অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন। এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা সবাইকে নিয়েই কাজ করতে চাই। কিন্তু অনিয়ম ও প্রতারণা করে কেউই রেহাই পাবে না।’

আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে জানিয়ে ফরহাদুল ইসলাম বলেন, ‘একটি প্যাকেজের কাজের পূনর্দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সেটি একটু দেরি হলেও কোন সমস্যা হবে না। কারণ প্রতিবারই বাফার স্টকের (উদ্বৃত্ত বা আপদকালীন মজুদ) ৫ শতাংশ বই ছাপা হয়।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, ‘প্রায় চারশ’ প্রতিষ্ঠান বই ছাপার কাজ করছেন। এরমধ্যে দু’চারজন যে অনিয়ম করছে না, তা নয়। যারা অনিয়ম করবে তাদের দায়দায়িত্ব মুদ্রণ শিল্প সমিতি নেবে না। আবার আমাদের কাগজ শতভাগ মানসম্মত হওয়ার পরও এনসিটিবি বারবার পরীক্ষার নামে আমাদের হয়রানি করছে। অযথা সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। কন্টিনেন্টাল নামের নিম্নমানের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাগজ পরীক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যাদের ভালো মানের ল্যাব (পরীক্ষাগার) নেই। এই হয়রানি থেকেও আমরা পরিত্রাণ চাই।’

এবার বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে সরকারের মোট ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১১শ’ কোটি টাকা। এরমধ্যে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপাতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা এবং মাধ্যমিক স্তরসহ অন্যান্য বই ছাপাতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। ২০১০ শিক্ষাবর্ষ থেকেই সরকার ধারাবাহিক সাফল্য হিসেবে নতুন বছরের শুরুতেই সারাদেশের শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করে আসছে।

এনসিটিবি জানায়, এবার ৩২০টি লটে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই ছাপার কাগজ ক্রয় করেছেন ব্যবসায়ীরা। একই স্তরের ৩৪০টি লটের বই ছাপার কাগজ কিনে ব্যবসায়ীদের সরবরাহ করেছে এনসিটিবি। মোট ২৫৩টি প্রিন্টার্স মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ পেয়েছে। বর্তমানে পুরোদমে চলছে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহ কার্যক্রম।

এনসিটিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে বলেন, ‘৩৪০টি লটের বই ছাপার কাগজ আমরা কিনে দিয়েছি। কিন্তু কয়েকজন অসাধু প্রিন্টার্স সরকারের কিনে দেয়া ভালো মানের কাগজে বিক্রি করে খোলাবাজার থেকে নিম্নমানের কাগজ কিনে বই ছাপা শুরু করেছিল। ওইসব বই বাতিলের পাশাপাশি ওইসব ব্যক্তিকে সরকারের কিনে দেয়া কাগজে বই ছাপতে বাধ্য করেছে এনসিটিবি। এরপরও কেউ অনিয়মের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ পেয়েছে ৪৩টি প্রতিষ্ঠান এবং প্রি-প্রাইমারি বই ছাপার কাজ পেয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠান। প্রাক-প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও ইতোমধ্যে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেনেছ এনসিটিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। এই প্রতিষ্ঠানও ছাপার কাজ শুরু করেছে।