• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মহররম ১৪৪০

মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদীন

বিক্রমপুরে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়েছিল ১৩ মার্চ

সংবাদ :
  • সেবিকা দেবনাথ

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৩ মার্চ ২০১৮

image

একাত্তর সালে মো. জয়নাল আবেদীন ছিলেন শ্রীনগর কলেজের ইন্টারমেডিয়েটের প্রথম বর্ষের ছাত্র। সে সময় ছাত্রলীগ শ্রীনগর থানা ও শ্রীনগর কলেজ শাখার সভাপতির দায়িত্বও ছিল এই মুক্তিযোদ্ধার ওপর। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তিনি শুনেছিলেন ৮ মার্চ সকালে বেতারে। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে পতাকা উত্তোলন করা হয়। এই খবরটি তারা জেনেছিলেন ৩ মার্চ দৈনিক পত্রিকা পড়ে। এর পরই তারা সিদ্ধান্ত নেন শ্রীনগরে পতাকা উত্তোলন করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ শুরু করলেন। ঢাকায় গিয়ে এলাকার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে দেখা করেন জয়নাল আবেদীনসহ আরও কয়েকজন। তাকে শ্রীনগর এসে পতাকা উত্তোলন করার অনুরোধ করা হয়। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন জানালেন, বঙ্গবন্ধু তাদের ঢাকা ছাড়তে নিষেধ করেছেন। ছাত্রলীগের কোন নেতাকে নিয়ে গিয়ে পতাকা উত্তোলনের পরামর্শ দেন তিনি। সেই পরামর্শ অনুযায়ী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস শহীদ খান সেন্টুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ঠিক হয় ১৩ মার্চ বিকেলে শ্রীনগর খেলার মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলন করা হবে।

জয়নাল আবেদীন বলেন, সেন্টু ভাইয়ের আশ্বাসে আমরা শ্রীনগর ফিরে আসি। পতাকা তৈরি জন্য কাপড় সংগ্রহ করি। ১২ মার্চ সারারাত জেগে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লালবৃত্তের সবুজ বর্ণের একটি বড় সাইজের পতাকা তৈরি করে দেন শ্রীনগর বাজারের দক্ষ দর্জি কাজী এমারত হোসেন। ১৩ মার্চ বিকেলে শ্রীনগর খেলার মাঠে থানা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে জনসভা হয়। সভায় আমি সভাপতিত্ব করি। ঢাকা থেকে যথাসময়ে সভায় উপস্থিত হন আবদুস শহীদ খান সেন্টু, আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া, ইউসুফ খান। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা দিলওয়ার হোসেন, মাহফুজুর রহমান রিপন আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সেন্টু ভাই আমাদের বাম হাত বুকে ও ডান হাত উপরে তুলে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ বাক্য পাঠ করান। সভা শেষে পাকিস্তানি চাঁদতারা পতাকায় আগুন দিয়ে আমরা জয় বাংলা সেøাগান ধরি। এর সঙ্গে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। মে মাসে শ্রীনগরে পাকিস্তানি বাহিনী আসার আগ পর্যন্ত এ পতাকা আমরা নিয়মিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ অফিসে উত্তোলন করতাম।

২১ মার্চ শ্রীনগর থানা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে স্থানীয় খেলার মাঠে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই জনসভায় জয়নাল আবেদীনের পরিচালনায় আওয়ামী লীগ নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগকে ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের সুযোগ দেয়া না হলে আমরা এক দফার সংগ্রাম শুরু করব। ‘এবারের সংগ্রাম এক দফার সংগ্রাম- বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ওই জনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের মালিক মধুসূদন দে (মধুদা) উপস্থিত ছিলেন। তিনিও জনসভায় সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন।

২৮ মার্চ ঢাকা থেকে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন শ্রীনগরে আসেন। শ্রীনগর পৌঁছেই তিনি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয় ওই দিনই শ্রীনগর থানার রাইফেল ও গুলি লুট করা হবে। যারা থানার অস্ত্র লুট করেছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন জয়নাল আবেদীন। শ্রীনগরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে ২৮ মার্চ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে লুণ্ঠিত থানার রাইফেল দিয়ে। যদিও তখন কেউ গুলি ছুড়তেও জানতেন না। পরে অবশ্য সেই অস্ত্রগুলো স্থানীয় শান্তি কমিটির পরামর্শে থানায় ফেরত দেয়া হয়। ১১ মে শ্রীনগরে পাকিস্তানি আর্মি আসে। এর আগে জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে স্থানীয়ভাবে একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে ওঠে।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ভারত থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে এসে থানা পর্যায়ের ছাত্রলীগের নেতাদের প্রশিক্ষণ দেন। তৎকালীন ‘মুজিব বাহিনী’র ঢাকা বিভাগীয় প্রধান মহিউদ্দিন আহমেদের একটি চিঠি নিয়ে ২৬ জনের একটি গ্রুপ আগরতলায় যায়। ওই গ্রুপে জয়নাল আবেদীনও ছিলেন। তারা আগরতলায় গিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় রসদ ও অস্ত্র সরবরাহ কমিটির সদস্য আবদুল কুদ্দুস মাখনের সঙ্গে দেখা করেন। অল্প দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ দলটি দেশে চলে আসে। তখন ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা ফেরিঘাট ও তৎসংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকাররা অবস্থান নেয়। এদের সঙ্গে ওই গ্রুপটি গজারিয়া থানার মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার নজরুল ইসলামের গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।

তারা থ্রি ইঞ্চি মর্টার সেল পাকিস্তানিদের লক্ষ্য করে ছোড়ার পরে পাকিস্তানি সৈন্যরা ভয়ে পালিয়ে যায়। এভাবেই গজারিয়া সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়।

সেই বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করতে পারেননি তারা। এ প্রসঙ্গে জয়নাল আবেদীন বলেন, আমাদের প্রথম সফল অভিযানের আনন্দ আমরা উপভোগ করতে পারিনি। কেননা, আমাদের গজারিয়া মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার নজরুল ইসলাম এই অভিযানে শহীদ হন। যা আমাদের প্রাপ্তির আনন্দকে ম্লান করে দেয়।