• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪ মহররম ১৪৪২, ০৫ আশ্বিন ১৪২৭

প্রবেশ ও বাহির পথে তল্লাশি চৌকি প্রত্যাহার

বাধাহীনভাবে ঢাকা থেকে ছুটছে মানুষ গ্রামে

ঘাটে ঘাটে উপচেপড়া ভিড় বাড়ছে ঝুঁকি ও শঙ্কা

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , শনিবার, ২৩ মে ২০২০

image

বাধাহীনভাবে ঢাকা থেকে গ্রামে ছুটছে মানুষ -সংবাদ

আকস্মিক সিদ্ধান্তে ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার প্রবেশ পথ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে পুলিশের তল্লাশি চৌকি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপি রাজধানীতে প্রবেশ এবং বের হওয়ার পথ থেকে বৃহস্পতিবার রাতেই তল্লাশি চৌকি সরিয়ে ফেলে। একই সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়কে, ফেরিঘাট, নৌ রুটসহ সব জায়গা থেকে তল্লাশি চৌকি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষকে ঢাকা ছাড়তে বাধা দেয়া হলেও গতকাল রাত থেকে তল্লাশি চৌকি সরিয়ে ফেলার কারণে বিনা বাধায় ঘরমুখো মানুষ ছুটতে শুরু করেছে ঢাকা থেকে। এমন পরিস্থিতি করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া এবং প্রাণহানীর আসংখ্যা করছেন চিকিৎসকরা। শুরুতে ঢাকা থেকে কাউকে গ্রামে যেতে না দেয়া, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত বন্ধ রাখা এবং ঈদের দিন চলাফেরা সীমিত রাখার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ থাকলেও তা ওঠে গেছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হওয়া থেকে নমনীয় অবস্থায় ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে সাধারণ মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে ঢাকা না ছাড়ার অনুরোধ করা হলেও কেউ শুনছে না কারো কথা।

ঈদের ঠিক আগে আগে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে রাজধানীর বাইরে যাওয়া বা বাইরে থেকে রাজধানীতে প্রবেশ করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা পালন করছি। সরকার হয়তো যথাযথ সিদ্ধান্তই নিয়েছে। তবে গণপরিবহন তো চলছে না। যারাই ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন বা আসছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই আসছেন। ঈদের পরে ছুটি শেষে যখন মানুষ ফিরবে, তখন আবার করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে জানতে চাইলে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সবাইকে আহ্বান করব, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ভালো মতো ফিরবেন। গাদাগাদি করে ফিরবেন না।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মল্লিক ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়িতে গিয়ে যারা ঈদ করতে চেয়েছেন, সরকার তাতে সম্মতি দিয়েছেন। কিন্তু গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। পুলিশ সড়কে নিরাপত্তা দেবে, তবে সবাইকে নিজস্ব পরিবহনে যেতে হবে।

ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, কেউ বাড়ি যেতে চাইলে যেতে পারবেন। তবে গণপরিবহন বন্ধ। তাহলে কীভাবে যাবেন, সহজেই অনুমেয়। ইতোমধ্যে রাজধানী প্রবেশ বা বের হওয়ার যে পয়েন্টগুলো রয়েছে সেগুলো থেকে তল্লাশি চৌকি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কোন বাধা দেয়া হচ্ছে না। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজধানী থেকে বের হওয়া বা প্রবেশে বাধা দেয়া হয়েছিল।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে সরকার প্রথম দফায় ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে সারাদেশে সব ধরনের যানবাহন চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এরপর ধাপে ধাপে ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ৩০ মে পর্যন্ত। এর মধ্যে বিপণি বিতান ও দোকানপাট, মসজিদ এবং পোশাক কারখানার ক্ষেত্রে কিছু বিধি-নিষেধ তুলে নেয়া হলেও আন্তঃজেলা বাস ও গণপরিবহনে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। নতুন করোনাভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক বলেই সরকারের তরফ থেকে এসব বিধিনিষেধ জারি করা হয়, যাতে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের এলাকাগুলো থেকে ঈদের সময় মানুষের সঙ্গী হয়ে গ্রামে গ্রামে এ রোগ ছড়িয়ে না পড়ে। গত ১৪ মে সর্বশেষ ছুটির আদেশে বলা হয়, ‘সাধারণ ছুটি/চলাচলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কেউ কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবে না উক্ত সময়ে সড়কপথে গণপরিবহন, যাত্রীবাহী নৌযান ও রেল চলাচল এবং অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল বন্ধ থাকবে এবং মহাসড়কে মালবাহী/জরুরি সেবায় নিয়োজিত যানবাহন ব্যতীত অন্যান্য যানবাহন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জরুরি পরিসেবার বাহন; খাদ্যসহ সব ধরনের পণ্য; রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের মালামাল; জ্বালানি, শিশুখাদ্য, ত্রাণ, কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য, সার ও কীটনাশক, পশুখাদ্য; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদিত পণ্য; দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য এবং জীবনধারণের মৌলিক পণ্য পরিবহনের যানবাহন; ওষুধ, ওষুধশিল্প, চিকিৎসা সেবা ও চিকিৎসা বিষয়ক সামগ্রী বহনকারী গাড়ি এবং গণমাধ্যমের গাড়ি এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। তবে পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। সরকারের ওই নির্দেশনা আসার পর ১৭ মে থেকে রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে চেকপোস্ট জোরদার করে পুলিশ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঢাকায় প্রবেশ বা বের হতে চাইলে বাধার মুখোমুখি হতে হয় সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘ছুটিতে অনেকেই গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। তা ঠিক হবে না। এটি কোনভাবেই হতে দেয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রী জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য যে সব নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সবাইকে যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু ঈদের মাত্র দুদিন বাকি থাকতে ব্যক্তিগত পরিবহনে বাড়ি ফেরার সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত আসে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা থেকে বা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গাড়িতে মানুষের চলাচলে বন্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থান নিলে, তল্লাশি চৌকি বসিয়ে গ্রামে যাওয়া বন্ধ করে দেয়ার মধ্যে গত বুধবার রাতে গাইবান্ধায় রড বেঝাই ট্রাকের মধ্যে লুকিয়ে কিছু মানুষ গ্রামে ফিরছিল। পুলিশের নজর এড়াতে ওই সব লোকজনকে ট্রাকের তেরপাল দিয়ে ঢেকে নেয়া হয়েছে। উপর থেকে তেরপাল আটকে দেয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে ঝড়ের মধ্যে ট্রাক উল্টে গেলে ভিতরে আটকে থাকা শিশুসহ ১৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এ মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আলোচনার পর ব্যক্তিগত গাড়িকে ছাড় দেয়ার ওই সিদ্ধান্ত আসে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তারা জানিয়েছে, লকডাউনের মধ্যেও মানুষ ভিন্নপথে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা এবং ঢাকা থেকে গ্রামে যাওয়া আসা করেছে। পুলিশ বাধা দিলেও নানা অজুহাতে যাতায়াত অব্যাহত রেখেছে। রোজা শুরুর পর থেকেই ঢাকা থেকে গ্রামে যাওয়া বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ কঠোর অবস্থান নিয়েও ঢাকা থেকে গ্রামে যাওয়া বন্ধ করতে পারেনি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ ট্রলার, নৌকা, পায়ে হেঁটে গ্রামে ফিরতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতি দুর্ঘটনা, মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়া, নানা ধরনের অসুবিধা তৈরি হতে থাকে। এসব বিষয়গুলো নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চ মহলে জানানো হয়েছিল। মূলত সাধারণ মানুষ কোনভাবেই পুলিশকে মানছিল না। বল প্রয়োগও করা যাচ্ছিল না। যটোতা বুঝিয়ে মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত না করার অনুরোধ করার পরও মানুষ কোন কথা শুনছিল না। সব মিলিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রতিবছর ঈদ যাত্রায় সড়ক ও নদী পথে ১ কোটির বেশি মানুষ রাজধানী ছাড়ে। এবার লকডাউন থাকায় রোজার শুরুতেই মানুষ গ্রামে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে যাওয়া শুরু করেছে। সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলেও তারা কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করছিল না। মানুষ নিজে সচেতন না হলে তাকে মারপিট করে বা জেলা জরিমানা করে সচেতন করা সম্ভব নয়।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় গঠিত ‘জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির’ সদস্যরা বলেছেন, এটা করা হলে সারাদেশে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি আরও বাড়বে। আক্রান্ত এলাকা থেকে মানুষ গ্রামে নিয়ে নিজের পরিবারকে যেমন ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন তেমনি এলাকার লোকজনকেও ঝুঁকিতে ফেলবেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাবে। সংক্রমণ ও মৃত্যু কোথায় গিয়ে ঠেকবে সে হিসেব করা কঠিন হয়ে যাবে।

চিকিৎসকরা বলছেন, ঢাকায় ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সারাদেশের সব জেলায় তত নয়। এখন ঢাকা থেকে মানুষ যদি নিজস্ব পরিবহনেও যায়, ভাইরাসটা তো ছড়িয়ে গেল। এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে। ওইসব গাড়িতে অন্য যারা ঢাকায় ফিরবেন তারাও সংক্রমিত হবে।