• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭, ২১ জিলকদ ১৪৪১

ফেসবুকে বন্ধু বানিয়ে প্রতারণার শিকার

সংবাদ :
  • বাকী বিল্লাহ

| ঢাকা , শুক্রবার, ০৪ অক্টোবর ২০১৯

রাজধানীর মিরপুর এলাকার এক দম্পতি লন্ডনে বসবাস করেন। তারা দীর্ঘদিন পর লন্ডন থেকে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। দেশে আসার পর সম্পত্তি নিয়ে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে তাদের বিরোধের সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে গত আগস্টে লন্ডন প্রবাসী স্বামী-স্ত্রীর লন্ডনে থাকা অবস্থায় আপত্তিজনক বিভিন্ন ছবি গোপনে ধারণ করে ফেসবুক, ইমু অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ছেলে, মেয়েসহ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও ফেসবুক আইডি অ্যাকাউন্টে পাঠায়। শুধু তা-ই নয়, মা-বাবার ছবি মেসেঞ্জার থেকে নাতিনের স্বামী ও মামার কাছে পর্যন্ত পাঠিয়ে পুরো পরিবারের মধ্যে বিশৃঙ্খলা এবং অশান্তি সৃষ্টি করছে। সর্বশেষ এ চক্র মেয়ে ও মেয়ের স্বামীর অন্তরঙ্গ ছবি মেয়ের বাবার ফেসবুকে পাঠিয়েছে। এভাবে এক প্রবাসী দম্পতির ছবি গোপনে ধারণ করে আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠিয়েছে। এভাবে ছবি পাঠিয়ে মেয়ের সুখের সংসার ভাঙার জন্য এবং অসৎ উদ্দেশ্যে দুষ্কৃতকারীদের স্বার্থ হাসিলের জন্য একের পর এক অপকর্ম করছে। পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে বিষয়টি নিয়ে মেয়ের বাবা ঘটনাটি পুলিশের সাইবার ক্রাইমের অপরাধ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। ঘটনায় জিডি ব্যবহৃত ইমুর স্ক্রিনশর্ট, ফেসবুক মেসেঞ্জারের স্ক্রিনশর্ট কপি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে অপরাধীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। শুধু তা-ই নয়, ঘটনাটি নিয়ে মিরপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। সাইবার ক্রাইমের অপরাধ বিশেষজ্ঞ টিম ঘটনাটি তদন্ত শুরু করেছে। তারা আসামিকে শনাক্ত ও তাদের কাছ থেকে আপত্তিজনক ছবিসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারে চেষ্টা করছেন।

সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি চক্র পারিবারিক ও জমি সংক্রান্ত বিরোধসহ নানা ইস্যু কাজে লাগাতে এখন নারীদের বিপাকে ফেলছে। তারা তাদের বিভিন্ন ছবি সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন। এর আগে দেশের একটি নামিদামি কোম্পানিতে একজন চাকরি করতেন। কিছুদিন পর নানা অনিয়মের অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এতে ওই চাকরিজীবী ওই কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের পরিবারের কারও ছবি সংগ্রহ করে তা নানাভাবে ফেসবুকের মাধ্যমে প্রচার করেছে। এ নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর পর তারা তদন্ত করে আসামিকে গ্রেফতার ও তার কম্পিউটার থেকে হাতেনাতে ছবিসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করেন। তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটি চক্র পরস্পর যোগসাজশে অসৎ উদ্দেশ্যে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য এ সব অপকর্ম করছে। অনেক পরিবার মানসম্মানের ভয়ে এসব বিষয় নিয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতেও অনীহা প্রকাশ করছে। আবার অনেকেই অতিষ্ঠ হয়ে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

সাইবার অপরাধ সম্পর্কে অনেকের ধারণা না থাকায় তারা নিজেদের অজান্তে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এমন বহু সাইবার অপরাধ পুলিশ উদ্ঘাটন করেছে। এখন নতুন করে জমি, দোকান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরোধ কেন্দ্র করে সাইবার অপরাধ বা ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। এসব ব্ল্যাকমেইলে নারীরা বেশি সমাজিকভাবে নির্যাতনের শিকার হন।

সাইবার ক্রাইম থেকে জানা গেছে, এক নারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফেসবুকে গ্রেন্ট অনিল নামে এক বিদেশির কাছ থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেলে তিনি তা অ্যাকসেপ্ট করেন। এরপর ফেসবুকে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ওই বিদেশি নিজেকে ইংল্যান্ডের নাগরিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে পরিচয় দেয়। সে বড়লোকের ছেলে। তার মা-বাবা, ভাইবোন এখন কেউ নেই। ওই নারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাকে বোন হিসেবে দাবি করে রস। একপর্যায়ে তাকে সপরিবারে লন্ডনে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। ফোন করে সে বলে, তার জন্য ডিপ্লোম্যাটিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে একটি পার্সেল পাঠিয়েছে। এর কয়েকদিন পর এক ব্যক্তি কুরিয়ার সার্ভিসের এজেন্ট পরিচয় দিয়ে নারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাকে ফোন করে বলে, তার একটি পার্সেল এসেছে। কাস্টমস ক্লিয়ারিং চার্জ বাবদ ৪০ হাজার টাকা দরকার এবং টাকাগুলো পাঠানোর জন্য বলে। পার্সেলে কী আছে, টাকা কীভাবে পাঠাব প্রশ্ন করলে জানানো হয়, পার্সেলটি কাস্টমস হেফাজতে আছে। স্ক্যান করার পর জানা যাবে এতে কী আছে। এরপর টাকাগুলো পাঠানোর জন্য ডাচ্-বাংলা বাংকের একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর দেয়া হয়। পরে ডাচ্-বাংলা বাংকে ৪০ হাজার টাকা জমা দেন। একদিন পর টেলিফোনে একই ব্যক্তি আবার বলে, পার্সেলটিতে গোল্ড, ডায়মন্ড, ল্যাপটপ, আইফোন, অনেক ব্রিটিশ পাউন্ড ও বহু মূল্যবান জিনিসপত্র আছে বলে স্ক্যান করে জানা গেছে। এসব পণ্য ছাড়াতে আরও ২ লাখ ২৯ হাজার ৫৩৫ টাকা ব্যাংকে জমা দিতে হবে। টাকা জমা না দিলে পুলিশ কেসসহ নানা সমস্যাও হতে পারে। এ নিয়ে একদিকে পুলিশ কেসের ভয়, অন্যদিকে পার্সেলে থাকা জিনিসপত্রের লোভ ওই নারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাকে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। ওই নারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা প্রতারক চক্রের ভয় ও প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে নিজের যাবতীয় সঞ্চয় থেকে এবং ব্যাংক থেকে লোন করে টাকা পাঠান। এভাবে বিভিন্ন সময় ১৮ লাখ ৪৯ হাজার টাকা প্রতারক চক্র নারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। পরে বিষয়টি জানালে পুলিশ ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে দেশি-বিদেশি প্রতারক চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করে এবং প্রতারিত টাকা ফ্রিজ করতে সক্ষম হয়।

সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা সাইবার অপরাধের কিছু কারণ তুলে ধরেন। তা হলো, ওই নারী কর্মকর্তা শিক্ষিত হলেও সাইবার অপরাধের কৌশল সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় ফেসবুকের একটি অপরিচিত আইডিকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে প্রতারণার শিকার হন।