• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪১

বাঁচল না সোহেল

ফায়ার সার্ভিসে সোহেলের মতো সাহসী বীর দরকার

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৯ এপ্রিল ২০১৯

image

কিশোরগঞ্জ : সোহেল রানার মৃত্যুর খবরে মা-স্বজনের আহাজারি

রাজধানীর বনানী এফআর টাওয়ারে লাগা আগুন নিভাতে গিয়ে গুরুতর আহত ফায়ারম্যান সোহেল রানা মারা গেছেন। সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ১৭ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৭ মিনিট) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘ ১২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেলেন সোহেল রানা। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ফায়ার সার্ভিস সদর দফতরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ জানান, আজ রাতেই (গতকাল) সিঙ্গাপুর থেকে সোহেলের মরদেহ ঢাকায় আনা হবে। সিঙ্গাপুরে কিছু ফরেনসিক ফরমালিটিজ রয়েছে, সেগুলো সম্পন্ন হয়েছে। ইসলামিয়া বাস্কেট কোম্পানির কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকা সিএমএইচ মরচুয়ারিতে নেয়া হবে মরদেহ। সোহেল রানার পরিবারকে খবর দেয়া হয়েছে। তারা ঢাকার এসেছেন। আজ ঢাকায় জানাজার ব্যবস্থা করা হবে। এরপর ফায়ার ফাইটার সোহেল রানার মরদেহ গ্রামের বাড়ি পাঠানো হবে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে মুন্সীগঞ্জের কমলাঘাট নদী ফায়ার স্টেশনে দায়িত্বপালনের মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু সোহেল রানার। এর কয়েক মাস পরেই বদলি হন কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনে। তার সঙ্গে একসঙ্গে থাকতেন কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান রনি বিশ্বাস। তিনি বলেন, আমরা ফায়ারম্যানরা এক সঙ্গে ব্যারাকে থাকতাম। আমি সোহেল রানার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। আমাদের অনেক কথা হতো। একই রুমে ঘুমাইতাম। একসঙ্গে সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বঙ্গভবনসহ অনেক ভিআইপি ডিউটি করেছি। সে খুবই নম্র ছিল। কাজ নিয়ে পেশাদার ছিল। কোন কিছু না ভেবেই ঝাঁপিয়ে পড়ত। সোহেলের মৃত্যুতে শোক নেমে আসে পুরো ফায়ার সার্ভিসেই।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) খন্দকার আবদুল জলিল বলেন, ওই দিন আমি ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই সোহেল সেখানে আহত হয়। আমি অন্যের জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়া সোহেলের পুরো ঘটনাটি শুনে মর্মাহত হই। আজ আরও বেশি খারাপ লাগছে তার জন্য। ফায়ার সার্ভিসে তার মতোই সাহসী বীর দরকার। নিহত সোহেল রানার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার চৌগাংগা গ্রামে। চার ভাই, এক বোনের মধ্যে রানা দ্বিতীয়। তবে পরিবারের বড় ছেলে ছিলেন তিনি। তার বাবা নুরুল ইসলাম ও মা হালিমা খাতুন কিশোরগঞ্জেই রয়েছেন। সোহেলের মৃত্যুতে পুরো পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। মা হালিমা খাতুন সন্তানের শোকে কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।

এদিকে সোহেল রানার মৃত্যুতে আজ রাজধানীর আরমানিটোলা মাঠে অগ্নিকা-ের মহড়ার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়।

গত ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার পর উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন রানা। ২৩ তলা ওই ভবনে আটকা পড়া মানুষদের ল্যাডারের মাধ্যমে নামাচ্ছিলেন তিনি। সোহেল যখন ৪-৫ জন আটকে পড়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করে নিচে নামাতে চান তখন উদ্ধারকারী ল্যাডারটি ওভারলোড দেখাচ্ছিল। ওভারলোড হলে সাধারণত সিঁড়ি নিচে নামে না, স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যায়। তাই ল্যাডারের ওজন কমাতে একপর্যায়ে সোহেল ল্যাডার থেকে বেয়ে নিচে নামছিলেন। এরপর ল্যাডারটির ওজন কমে যাওয়ায় সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায়। এরপরই ঘটে যায় সেই ঘটনাটি যা তার জীবনের আলো নিভিয়ে দিল। ল্যাডারের ভেতরে সোহেলের একটি পা ঢুকে যায়। এছাড়া তার শরীরের সেফটি বেল্টটি ল্যাডারে আটকে পেটে প্রচন্ড চাপ লাগে। এরপর থেকেই সংজ্ঞাহীন হন সোহেল।

দুর্ঘটনার পরপরই সোহেল রানাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রতিদিন চার ব্যাগ রক্ত দেয়া হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নতি হচ্ছিল না। পেটের ক্ষতের কারণে সমস্যা হচ্ছিল রানার। সে কারণে সিএমএইচের চিকিৎসকদের পরামর্শে গত শুক্রবার রানাকে পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে। তার দেখাশোনা করার জন্য ফতুল্লা ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার রায়হানুল আশরাফকেও তার সঙ্গে পাঠানো হয়। সর্বোচ্চ চিকিৎসা আর শত চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হলো না সোহেলের।