• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২০, ১৪ সফর ১৪৪২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৭

প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবিলায় প্রস্তুত দেশ

দশ ফিট জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা ২২ লাখ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , বুধবার, ২০ মে ২০২০

image

অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফান বাংলাদেশ ও ভারতে আজ সকাল ৬টায় আঘাত হানতে পারে। এর ক্ষতি থেকে রক্ষায় মানুষ ও গবাদী পশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে কাজ করছে সরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। দেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলায় সতর্কতা জারি করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। ১২ হাজার ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৯১ লাখ ৫৪ হাজার মানুষকে আশ্রয় দেয়া সম্ভব। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে আশ্রয়কেন্দ্রসমূহে ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে।

সমুদ্রবন্দরগুলোতে সতর্কতা সংকেত জারি করা হয়েছে। এর প্রভাবে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫-১০ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। শতাব্দীর প্রথম সুপার সাইক্লোনটি অতি ভারি বর্ষণসহ ঘণ্টায় ১৪০-১৬০ কি. মি. বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে । বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতরের হিসাবে খুলনা ও চট্টগ্রাম উপকূলের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে আম্পান। আর ভারতীয় আবহাওয়াবিদরা বলছেন পশ্চিমবঙ্গের দীঘা এবং বাংলাদেশের হাতিয়ার মাঝামাঝি সুন্দরবন ও আশপাশের এলাকার কথা।

আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ বলেন, বুধবার মহাবিপদ সংকেত দেয়া হবে।

গত শতাব্দীর প্রথম সুপার সাইক্লোনটি ছিল ১৯৯৯ সালের উড়িষ্যা সাইক্লোন। চলতি শতাব্দীর প্রথম অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। উপকূলের দিকে এগোতে থাকা সুপার সাইক্লোন আম্ফানের শক্তি কিছুটা কমেছে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতর ও ভারতের আবহাওয়া অধিকতর (আইএমডি) বলছে, ঘূর্ণিঝড়ের গতি বাড়ুক কিংবা কমুক, এর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় আম্ফান উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে একই এলাকায় (১৭.০ক্ক উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৭.০ক্ক পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) অবস্থান করছে। এটি গতকাল বেলা ৩টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৮৫ কি. মি. দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৪০ কি. মি. দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৭০ কি. মি. দক্ষিণ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ৬৬৫ কি. মি. দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি আরও উত্তর-উত্তর-পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে আজ বিকেল/সন্ধ্যার মধ্যে বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড়কেন্দ্রের ৮৫ কি. মি. এরমধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২০০ কি. মি. যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ২২০ কি. মি. পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে।

সতর্ক সংকেত : মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ০৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ০৭ নম্বর বিপদ সংকেত (পুনঃ) ০৭ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ০৬ (ছয়) নম্বর পুনঃ ০৬ (ছয়) নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ০৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

সতর্কতা : ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রাম এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫-১০ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলাসমূহ এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণসহ ঘণ্টায় ১৪০-১৬০ কি. মি. বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

জেলেদের জন্য সতর্কতা : উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবিলায় ১২ হাজার ৭৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ৯১ লাখ ৫৪ হাজার মানুষকে আশ্রয় দেয়া সম্ভব। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে আশ্রয়কেন্দ্র সমূহে ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষকে আশ্রয় দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে উপকূলীয় এলাকার মানুষজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা শুরু হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী গতকাল ঢাকায় তার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষ থেকে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি বিষয়ে সাংবাদিকদের অনলাইন ব্রিফিংয়ে এ সব কথা বলেন।

উপকূলীয়সহ মোট ১৯টি জেলার জন্য ৩১ হাজার মেট্রিক টন চাল, ৫০ লাখ নগদ টাকা, শিশু খাদ্য ক্রয়ের জন্য ৩১ লাখ টাকা, গো-খাদ্য ক্রয়ের জন্য ২৮ লাখ টাকা এবং শুকনো ও অন্য খাবারের ৪২ হাজার প্যাকেট ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে।

সকাল ৬টায় মহাবিপদ সংকেত

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান দেশের উপকূল অঞ্চলের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে। বর্তমানে দেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোর মধ্যে পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে সবচেয়ে কাছাকাছি, ৬৯০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে ঘূর্ণিঝড়টি।

ঘূর্ণিঝড়টি ঘণ্টায় ২৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে এগিয়ে আসছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৮১০ কিলোমিটার, কক্সবাজার বন্দর থেকে ৭৬৫ কিলোমিটার ও মোংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ৬৯৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থান করছে।

স্কুল-কলেজগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেয়ার নির্দেশ : ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবিলায় উপকূলীয় এলাকার স্কুল-কলেজগুলো জনসাধারণের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। আর আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে পাঠাতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ে কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে তথ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা অধিদফতরে পাঠাতে বলা হয়েছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের। মাউশি থেকে গতকাল এ বিষয়ে আদেশ জারি করেছে।

এছাড়া ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট যে কোন তথ্য জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে (০১৭১১৭০৪৭২৫) যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে কর্মকর্তাদের।

প্রস্তুত ৫৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান গতকাল শেষরাত থেকে বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে বরিশাল ও খুলনা উপকূলে আঘাত হানতে পারে। পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে বরিশাল বিভাগের ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ৫৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রত্যন্ত এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে অবহিত করছে বলে জানিয়েছেন সিপিপি’র বরিশাল বিভাগীয় উপ-পরিচালক আবদুর রশিদ।

তিনি জানান, একই সঙ্গে প্রতিটি ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রে ২টি করে পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সিপিপি ঘূর্ণিঝড় শুরুর আগেই মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। তাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান এবং অবশ্যই মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। জনগণকে ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়ে সতর্ক এবং সচেতন করতে বলা হচ্ছে। বরিশাল জেলায় ৩১৪টি আশ্রয়কেন্দ্র এবং ৭৩৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘূর্ণিঝড় দুর্গত মানুষকে আশ্রয় দেয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান। এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ২ লাখ ৪০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে।