• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২২ জিলহজ ১৪৪০

হাইকোর্টের নির্দেশের চারদিন পরও

প্রত্যাহার হয়নি নিম্নমানের পণ্য

সাত প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল

সংবাদ :
  • অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯

image

মান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ ৫২টি পণ্যের বিষয়ে হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশনার পর কেটে গেছে চার দিন। গতকাল বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর। কিন্তু এরপরও দু’একটি ছাড়া বাজার থেকে অধিকাংশ পণ্যই প্রত্যাহার করেনি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো। বরং ভোক্তার কাছে এগুলো বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, পণ্যগুলো বাজার থেকে তুলে নেয়ার কোন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না কোম্পানিগুলোর মধ্যে। উল্টো পণ্যের মান ঠিক আছে বলে দাবি করছে কোন কোন প্রতিষ্ঠান। এবিষয়ে বিএসটিআইকে চ্যালেঞ্জ করে চিঠিও দেয়া হয়েছে বলে জানান তারা। সেই চিঠির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বলেও দাবি করেছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এদিকে গতকাল বিএসটিআই ৭টি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল ও ১৮টি পণ্য উৎপাদনের অনুমোদন স্থগিত করেছে।

লাইসেন্স বাতিল হওয়া কোম্পানিগুলোর তালিকায় ড্রিংকিং ওয়াটারের মধ্যে আল সাফি ড্রিংকিং ওয়াটার, শাহারী অ্যান্ড ব্রাদার্সের নারজান ড্রিংকিং ওয়াটার, মর্ন ডিউ পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার এবং আর আর ডিউ ড্রিংকিং ওয়াটার রয়েছে। কেরানীগঞ্জে শান্তা ফুড প্রোডাক্টসের টেস্টি, তানি ও তাসকিয়া এবং কামরাঙ্গীরচরের জাহাঙ্গীর ফুড প্রোডাক্টসের প্রিয়া ব্র্যান্ডের সফট ড্রিংক পাউডারেরও লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া মিরপুরের বনলতা সুইটস অ্যান্ড বেকারির বনলতা ব্র্যান্ডের ঘি-এর লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।

লাইসেন্স স্থগিত হওয়া পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে, সরিষার তেলে সিটি অয়েল মিল-গাজীপুর (তীর), গ্রিন ব্লিসিং ভেজিটেবল অয়েল-নারায়ণগঞ্জ (জিবি), শবনম ভেজিটেবল অয়েল-নারায়ণগঞ্জ (পুষ্টি), বাংলাদেশ এডিবল অয়েল-নারায়ণগঞ্জ (রূপচাঁদা); সুপেয় পানির মধ্যে আররা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ (আররা), ডানকান প্রোডাক্ট (ডানকান), দিঘী ড্রিংকিং ওয়াটার (দিঘী); প্রাণ এগ্রো লিমিটেডের প্রাণ ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই; হলুদের গুড়ার মধ্যে ড্যানিশ, প্রাণ ও ফ্রেশ। কারী পাউডারের মধ্যে প্রাণ ও ড্যানিশ; আয়োডিনযুক্ত লবণের মধ্যে এসিআই ও মোল্লা সল্ট; ধনিয়া গুড়ার মধ্যে এসিআই পিওর, নুডলসের মধ্যে নিউ জিল্যান্ড ডেইরির নুডলস এবং চিপসের মধ্যে কাশেম ফুডের সান ব্র্যান্ড রয়েছে। মনোন্নয়ন করে আবার লাইসেন্স গ্রহণের আগে এসব পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ এমনকি খুচরা বিক্রি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এসব পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি এর সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিক প্রচার বন্ধ করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জানা যায়, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষায় নিম্নমানের প্রমাণিত হওয়ায় গত রোববার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বিভিন্ন কোম্পানির ৫২টি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের আদেশ দেন। একই সঙ্গে নামিদামি এসব ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য নিম্নমানের হওয়ায় আশ্চর্য হন আদালত। আদালত ভেজালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানান সরকারের প্রতি।

সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, কিছু কোম্পানির দাবি, নিজস্ব ল্যাবরেটরিসহ নির্ভরযোগ্য অন্য ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে তাদের পণ্যের সঠিক মানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশিত পণ্যগুলো পুনরায় পরীক্ষা করে দেখার জন্য বিএসটিআইকে চিঠি দিয়েছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তারা জানায়, বিএসটিআই এখনও তাদের ওই চিঠির জবাব দেয়নি। সংবাদ মাধ্যমের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রাণ কোম্পানির দাবি, বাজারে থাকা তাদের পণ্যের মান সঠিক আছে। আর এসিআই কোম্পানি বলছে তাদের একটি মাত্র পণ্যের একটি ব্যাচে সমস্যা ছিল, এরইমধ্যে সেটি বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে তাদের যে পণ্য রয়েছে, সেগুলোর মান সঠিক রয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, তীর সরিষার তেল, প্রাণের লাচ্ছা সেমাই, প্রাণ হলুদ গুঁড়া, প্রাণ কারি পাউডার, মোল্লা সল্ট আয়োডিনযুক্ত লবণ, এসিআই আয়োডিনযুক্ত লবণ বিভিন্ন দোকানে এখনও বিক্রি হচ্ছে। ড্যানিশ হলুদের গুঁড়া, ড্যানিশ কারি পাউডার, রূপচাঁদা সরিষা তেল, পুষ্টি সরিষা তেল বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

তারা বলছেন, ৫২টি পণ্যের মধ্যে অনেক পণ্যই এখনও বাজারে আছে। তবে কিছু কোম্পানি এই তালিকায় থাকা তাদের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার করা শুরু করেছে। শুধু এসিআই কোম্পানির পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের লিখিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়- বিএসটিআই’র পরীক্ষায় এসিআই লবণের একটি ব্যাচে পিএই (ঢ়ঐ)-এর মান বেশি পাওয়া গেছে, যে কারণে সেটি প্রত্যাহারের জন্য বলা হয়। এছাড়া, তাদের লবণের অন্য ব্যাচগুলোর মান সঠিক রয়েছে। তারা বলছে, বিএসটিআই’র সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তারা ওই পণ্যটি বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। অন্যদিকে, প্রাণ কোম্পানি তাদের কোন পণ্য বাজার থেকে এখনও তুলে নেয়নি।

প্রাণের মিডিয়া ম্যানেজার কেএম জিয়াউল হক জানান, হাইকোর্টের আদেশ শোনার পর আমরা বিএসটিআইকে একটি চিঠি দিয়ে আমাদের পণ্যগুলো পুনরায় পরীক্ষা করার জন্য অনুরোধ করেছি। কারণ, আমাদের এই পণ্যগুলো প্রাণের নিজস্ব ল্যাবসহ বিভিন্ন ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখেছি। সেই তথ্য অনুযায়ী আমাদের পণ্যের মান ঠিক আছে। তবে বিএসটিআই এ বিষয়ে এখনও কিছুই জানায়নি।

গত মঙ্গলবার (১৪ মে) রাজধানীর কাওরানবাজারের কিচেন মার্কেটে সরেজমিন দেখা গেছে, বিভিন্ন দোকানে এসিআই’র আয়োডিনযুক্ত লবণ ও মোল্লা সল্টের আয়োডিনযুক্ত লবণ পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই বাজার থেকে তীর সরিষা তেল ও পুষ্টি সরিষা তেল এদিনেই তুলে নিয়ে গেছেন কোম্পানির প্রতিনিধিরা। দৈনন্দিন মূল্য তালিকা থেকেও এ দুটি পণ্যের নাম কেটে দেয়া হয়েছে।

কাওরান বাজারের হাজী মিজান এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার মো. জাকির হোসেন জানান, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পর থেকে আমরা এসব পণ্য আর রাখছি না। তীর সরিষা তেল, পুষ্টি সরিষা তেল, ড্যানিশের হলুদের গুঁড়াবাজার থেকে তুলে নিচ্ছে কোম্পানিগুলো।

মহাখালী কাঁচাবাজার ও বনানী কাঁচাবাজারের মুদি দোকানগুলোতে এখনও তীর সরিষা তেল পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া দোকানে রয়েছে প্রাণের হলুদের গুঁড়া, প্রাণ কারি পাউডার, মোল্লা সল্ট আয়োডিনযুক্ত লবণ, এসিআই আয়োডিনযুক্ত লবণ, ড্যানিশ হলুদের গুঁড়া। দোকানিরা জানিয়েছেন, এসব কোম্পানির সেলসম্যানরা এখনও এই পণ্যগুলো নিতে আসেননি।

মহাখালী কাঁচাবাজারের দোকানি মো. আজিজ বলেন, ‘এই বাজারে তীর সরিষা তেল বেশি চলে, তাই রেখেছিলাম। কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর পণ্যটি ফেরত নিতে কেউ এখনও আসেননি। প্রাণ কোম্পানি থেকেও পণ্য ফেরত নিতে কেউ আসেনি। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পরও বাজারে তীর সরিষা তেল পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে সিটি গ্রুপের (তীর) ব্র্যান্ড ম্যানেজার মো. রুবায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি।

রাজধানীর উত্তরায় সমবায় বাজারের বিভিন্ন মুদি দোকানে সরেজমিন এসিআই আয়োডিনযুক্ত লবণ, মোল্লা সল্ট আয়োডিনযুক্ত লবণ ও প্রাণের হলুদ গুঁড়া দেখা গেছে। দোকানিরা জানিয়েছেন, ড্যানিশের হলুদের গুঁড়া ও কারি পাউডার কোম্পানির লোকেরা বাজার থেকে তুলে নিয়ে গেছে। এই বাজারে নিষিদ্ধ ৫২টি পণ্যের তালিকা কোনও দোকানেই ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে মুদি দোকানি মো. রহমান জানান, আমাদের এই বাজারে এসিআই আয়োডিনযুক্ত লবণ ও মোল্লা আয়োডিনযুক্ত লবণ বেশি চলে। তবে হাইকোর্টের নিষেধের পর সেগুলো বিক্রি করা বন্ধ রেখেছি। প্রাণের হলুদের গুঁড়াও এখন আর রাখছি না।

প্রসঙ্গত, গত ৯ মে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) পরীক্ষায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২টি ভেজাল ও নিম্নমাণের পণ্য জব্দ এবং এসব পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার ও উৎপাদন বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়। কনশাস কনজ্যুমার সোসাইটির (সিসিএস) পক্ষে ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান জনস্বার্থে রিটটি করেন। ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত বিএসটিআই ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য অধিদফতরের ডেপুটি ডিরেক্টরের নিচে নন এমন দু’জন কর্মকর্তাকে তলব করেন, যার ধারাবাহিকতায় রোববার (১২ মে) আদালতে হাজির হন বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক মো. রিয়াজুল হক এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালক ড. সহদেব চন্দ্র সাহা। এর আগে গত ৩ ও ৪ মে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ করা হয়, বিএসটিআই সম্প্রতি ২৭ ধরনের ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২টি পণ্য নিম্নমানের ও ভেজাল রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ রিপোর্ট প্রকাশ করে বিএসটিআই।