• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০৭ জুন ২০২০, ২৪ জৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

পেশার আড়ালে ভয়ঙ্কর অপরাধী

দিনে ফেরিওয়ালা কার চালক হোটেল কর্মচারী, রাতে ডাকাত

    সংবাদ :
  • বাকিবিল্লাহ
  • | ঢাকা , বুধবার, ১১ মার্চ ২০২০

নানা পেশার আড়ালে একটি ভয়ঙ্কর অপরাধী চক্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজধানী শহর ঢাকা। এই অপরাধীদের সবাই দিনে ফেরিওয়ালা, প্রাইভেটকার চালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফুটপাতের হকার ও হোটেল কর্মচারীসহ বিভিন্ন পেশায় জড়িত থাকে। এ সময় নানায় পেশায় জড়িত থাকার ভান করে শিকার খোঁজে। রাতে শুরু হয় তাদের কর্মকা-। ডাকাতি, ছিনতাই, টার্গেট কিলিং, টাকার বিনিময়ে খুন ইত্যাদি অপরাধ তাদের কাছে ডাল-ভাতের মতো। দিনে তাদের হাতে ফেরি করে বিক্রির মালামাল, হোটেলের বয়-বেয়ারা হিসেবে প্লেট, চামচ, প্রাইভেট গাড়ির স্টিয়ারিং ইত্যাদি। আর রাত হলেই তাদের হাতে উঠে আসে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জ্যাকেট, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ, আসলেও মতো দেখতে খেলনা অস্ত্র। এ নিয়ে তারা রাস্তায় নামে। সঙ্গে অভিজাত প্রাইভেটকার কিংবা মাইক্রোবাস। তারা সড়ক ও মহাসড়কে ডাকাত দলের একাধিক গ্রুপকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিটি গ্রুপে আছে ১০ থেকে ১২ সদস্য। এভাবে রাজধানী এবং আশপাশের জেলাগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একাধিক ভয়ঙ্কর অপরাধী গ্রুপ।

সম্প্রতি র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এ অপরাধী গ্রুপের নানা অপরাধের খবর। র‌্যাব-১ এর চৌকস দল রাজধানীর তুরাগ এলাকায় অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে এ চক্রের ৬ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র, ডিবির জ্যাকেট, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। তাদের দেয়া তথ্যমতে, পলাতক অপরাধীদের ধরতে চলছে অভিযান।

র‌্যাব জানায়, অপরাধী চক্রের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের নকল পোশাক পরে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা ধরনের অপরাধ করছে। এই অপরাধীদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেশ কয়েকজন সম্প্রতি র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করেছে। এরই ভিত্তিতে র‌্যাব-১ ছায়া তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে র‌্যাব-১ এর একটি টহল দল রাজধানীর তুরাগ এলাকায় নিয়মিত টহল ডিউটিতে থাকার সময় দেখতে পায়, তুরাগ বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি মাইক্রোবাস থেকে ডিবি পুলিশের জ্যাকেট পরিহিত অবস্থায় ৮/১০ জনের একটি দল রাস্তায় গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছে। র‌্যাব-১ এর টহল দলটি তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে ডিবি পুলিশের জ্যাকেট পরিহিত দলটিকে চ্যালেঞ্জ করলে তাদের কয়েকজন দ্রুত মাইক্রোবাসটি নিয়ে পালিয়ে যায়। তারা আসলে ডিবি পুলিশের পোশাক পড়ে সড়কে গাড়ি থামিয়ে ডাকাতি করছিল। র‌্যাব তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে সেই ভুয়া ডিবি পুলিশ দলের সদস্য মো. মোস্তফা কামাল ওরফে লিটন, মো. শাহাব উদ্দিন (৪২), মো. শফিকুল ইসলাম (২৯), মো. আলমগীর শেখ (৩৫) ও মো. শফিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ৫ রাউন্ড গুলি, ৪টি চাপাতি, ৪টি ওয়াকিটকি, ডিবি পুলিশের ২টি জ্যাকেট, ১টি হ্যান্ডকাফ, ডিবি পুলিশের ২টি ভুয়া আইডি কার্ড, ১২টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য। এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলটির স্থায়ী সদস্য ১০/১২ জন। এছাড়াও আরও একাধিক অস্থায়ী সদস্য রয়েছে। মোস্তফা কামাল ওরফে লিটন ও শাহাব উদ্দিন এই ডাকাত দলের মূল হোতা। এই দু’জন মিলে ডাকাত দলটিকে নিয়ন্ত্রণ করত। এই অপরাধী চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। তারা ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ডাকাতি, ছিনতাই, চুরিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে আসছিল।

র‌্যাব জানায়, এই চক্রটি সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাংকের গ্রাহকদের অপহরণ ও অর্থ ছিনিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে নানা কৌশল অবলম্বন করত। প্রথমত, তাদের দলের ১/২ জন ছদ্মবেশে ব্যাংকের বাইরের অবস্থানে থাকে। আর ২/৩ জন গ্রাহকের ছদ্মবেশে ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করে। মূল দলটি মাইক্রোবাসসহ সুবিধাজনক স্থানে অপেক্ষা করতে থাকে। অতঃপর ভেতরের একজন ব্যাংক থেকে বের হয়ে এসে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দেয়। কিংবা সরাসরি তারা মোবাইলের মাধ্যমে বাইরে অবস্থানকারী দলকে অবহিত করে। অতঃপর মাইক্রোবাসটি পেছন থেকে অথবা কখনও সামনে থেকে এসে সুবিধাজনক স্থানে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে গতিরোধ করে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। এরপর গাড়ির ভিতরে নিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে নির্যাতন করে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে সুযোগ বুঝে রাস্তায় ফেলে দিয়ে দ্রুত চলে যায়। কারও কাছে টাকা না থাকলে বিকাশের মাধ্যমে আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে। এরপর গাড়ির ভেতরে চোখ-মুখ বেঁধে নির্যাতন করে রাস্তায় ফেলে চলে যায়।

এই চক্রটি বিভিন্ন এলাকায় প্রাইভেটকারে ও মাইক্রোবাসে করে ঘোরাঘুরি করে। তারা ডাকাতির উদ্দেশ্যে প্রথমে টার্গেট নির্ধারণ করে, যেমন স্বর্ণের দোকান, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন ধরনের দোকান ইত্যাদি। টার্গেট ঠিক করার পর চক্রের ৪/ ৫ জন সদস্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে ডাকাতির পরিকল্পনা করে। চক্রের অন্য সদস্যরা রাতে ডিবি পরিচয় দিয়ে ঘোরাঘুরি করে এলাকায় ভীতি প্রদর্শন করে এবং সেখানকার নাইট গার্ডদের ডিবি পরিচয় দিয়ে তাদের এখানে কাজ আছে বলে তাদের অন্য দিকে চলে যেতে বলে। এরপরই ডাকাতি শুরু করে। অনেক সময় তারা বিমানবন্দর এলাকায় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি)সদস্য পরিচয়ে ছদ¥বেশে অবস্থান করে। এরপর বিদেশ ফেরত প্রবাসী যাত্রীদের টার্গেট করে তাদের অনুসরণ করে। এ দলের সদস্যরা অপরাধ করার সময় নিজ নিজ নির্দিষ্ট দায়িত্ব আগ থেকে বণ্টন করে দেয়। যেমন ডিবি অফিসারের মতো ভূমিকায় কে থাকবে, কে সিজার লিস্ট তৈরি করবে, কে হ্যান্ডকাফ পড়াবে, কে টার্গেট নির্ধারণ করবে, কে ড্রাইভারের সঙ্গে যোগাযোগ করবে ইত্যাদি। যদি কোন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাইক্রোবাসে তাদের সন্দেহ করে তাহলে তারা বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণে যাচ্ছে বলে উত্তর দেয়।

আসামি মোস্তফা কামাল ওরফে লিটনকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, সে ২০০৮ সাল থেকে এভাবে ডাকাতিসহ নানা অপরাধ করে আসছে। সে ইতিপূর্বে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করত। পরে আসামি শাহাব উদ্দিনকে নিয়ে এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলটি গঠন করে। ডাকাতি করে প্রাপ্ত টাকা তারা নির্দিষ্ট হারে অন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দিত বলে জানায়। সে এখন পর্যন্ত ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ১৫০টিরও বেশি ডাকাতি/চুরি করেছে বলে স্বীকার করে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় তার নামে ১২/১৪টি ডাকাতি মামলা রয়েছে। সে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে একাধিকবার কারাভোগ করেছে বলে জানা যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে আসামি শাহাব উদ্দিন র‌্যাবকে বলেছে, ইতিপূর্বে সে রাজধানীর মহাখালীতে একটি হোটেলে মেসিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিল। কর্মরত থাকাকালীন তার সঙ্গে মোস্তফা কামাল ওরফে লিটনের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তারা একত্রে এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলটি গঠন করে। তার নামে রাজধানীসহ বিভিন্ন থানায় ৫/৬টি ডাকাতির মামলা রয়েছে। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে একাধিকবার কারাগারে ছিল। সে এখন পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি ডাকাতি করেছে বলে স্বীকার করে।

আসামি শফিকুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, সে রাজধানীর আশপাশের এলাকায় ফেরিওয়ালা হিসেবে কাজ করত। ফেরিওয়ালা হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি সে দীর্ঘদিন ধরে এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সঙ্গে ডাকাতি করছিল। সে আসামি শাহাব উদ্দিনের মাধ্যমে উক্ত ডাকাত দলে জড়িত হয়। তার নামে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৪/৫টি ডাকাতির মামলা রয়েছে। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে একাধিককার কারাভোগ করেছে বলে জানা যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে আসামি নাছির উদ্দিন জানায়, সে পেশায় একজন প্রাইভেটকার চালক। সে রাজধানী ঢাকায় রেন্ট-এ-কার এ গাড়ি চালাত। গাড়ি চালানোর পাশাপাশি সে এই সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের একজন সক্রিয় সদস্য। সে ১০/১২টি ডাকাতি করেছে বলে স্বীকার করে। ডাকাতি করার পর ধৃত আসামি মোস্তফা কামাল ওরফে লিটন তাকে নির্দিষ্ট হারে টাকা দিত বলে জানায়।

আসামি আলমগীর শেখকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে রাজধানীতে একটি বাসের কাউন্টারে কাজ করত। কাউন্টারে কাজ করার পাশাপাশি সে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য হিসেবে ডাকাতি-ছিনতাই করে বেড়াচ্ছিল। রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় ৫০টিরও বেশি ডাকাতি করেছে বলে স্বীকার করে। তার নামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ৮/১০টি ডাকাতির মামলা রয়েছে এবং একাধিকবার কারাভোগ করেছে বলে জানা যায়।