• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ১৭ জিলহজ ১৪৪১, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

পাপিয়া হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল অর্থ পাচার করে

তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটন

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , রোববার, ১৫ মার্চ ২০২০

image

নরসিংদীর যুব মহিলা লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামীমা নুর পাপিয়া-সুমন চৌধুরী দম্পতি হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেফতার হওয়ার এ দম্পতির বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগে করা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে। এদিকে পাপিয়ার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সিআইডির উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ইমতিয়াজ আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাপিয়া দম্পতির অর্থপাচার মামলার বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। নিবিড়ভাবে তদন্ত কাজ চলছে। বেশকিছু আলামত হাতে এসেছে। তাতে এখন পর্যন্ত বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি আমরা। সেগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। তদন্তে এখন পর্যন্ত পাপিয়ার সঙ্গে যাদের নাম এসেছে তাতে তার স্বামী সুমনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। আরও কারা রয়েছে সে বিষয়ে তদন্ত শেষে বলা যাবে।

সিআইডি সূত্র জানায়, পাপিয়ার বিষয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য চাওয়া হয়েছে। অ্যাকাউন্টগুলো জব্দ করতেও বলা হয়েছে । প্রাথমিক তথ্যমতে, ব্যাংক জানিয়েছে, অ্যাকাউন্টে নগদ টাকা খুব বেশি নেই। বেশিরভাগ টাকাই হাতে হাতে লেনদেন হয়েছে। তার মানে হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে। পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী বিদেশে টাকা পাচারের জন্য অন্য কোন মাধ্যমের কাছে সরাসরি টাকা পরিশোধ করেছেন। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়েছে এর আইনগত ভিত্তি কিভাবে প্রমাণ করবেন, জানতে চাইলে সিআইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, এরই মধ্যে যাদের কাছে টাকা পরিশোধ করেছেন তাদের বেশ কয়েকজনের নাম এসেছে। ওইসব তথ্য প্রমাণ তদন্তের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

এদিকে মাফিয়া সমাজ্ঞী খ্যাত শামীমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাপিয়া দম্পতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুদক বেশ কিছু তথ্য পেয়েছে। নামে বেনামে অবৈধ সম্পদ থাকার পাশাপাশি হোটেল ওয়েস্টিনে ব্যয়বহুল ভাড়া থাকা এবং বিপুল পরিমাণ বিল পরিশোধে যে অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে তার বৈধ আয়ের কোন উৎস পায়নি দুদক। খুব শীঘ্রই ওই দম্পতির বিররুদ্ধে মামলা করা হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, গত মাসের শেষ সপ্তাহে পাপিয়া দম্পতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে ১ মার্চ কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক শাহীন আরা মমতাজকে নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর ২ মার্চ এই কর্মকর্তা শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ সম্পর্কে তথ্য জানতে ওয়েস্টিন হোটেলকে চিঠি দেয়। ৮ মার্চ শামিমা নূর পাপিয়া এবং তার স্বামীর অর্থের তথ্য জানতে দেশি-বিদেশি ৫৯টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছেও চিঠি দেয় এই কর্মকর্তা। একইদিন থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় এই দম্পতির বাড়ি ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য জানতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে আলাদা চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এদিকে ওয়েস্টিন হোটেলকে চিঠি দেয়ার পর সম্প্রতি হোটেল ওয়েস্টিন কর্তৃপক্ষ পাপিয়ার পরিশোধ করা বিল ভাউচারসহ প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। সেখানে দেখা যায়, পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনে বিলাসবহুল ছয়টি কক্ষ ভাড়া নেন পাপিয়া। তিনি থাকতেন ২২০১ নম্বর প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে। কিন্তু পাঁচ তারকা হোটেলটির চারটি কক্ষ টানা ৪ মাস ৯ দিন নিজের দখলে রাখেন পাপিয়া। গ্রেফতারের দিন পর্যন্ত মোট ১২৯ দিনে পাপিয়া ও তার সঙ্গীদের থাকা, খাওয়া, মদের বিল বাবদ পরিশোধ করেছেন ৩ কোটি ২৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। বিল ভাউচার জমা দেয়ার পাশাপাশি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) ফুটেজও জমা দিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। হোটেল ওয়েস্টিনে বিলাসী সময় কাটাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরের আয়কর বিবরণীতে পাপিয়া বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৩ লাখ টাকা। আর সম্পদ দেখিয়েছেন মাত্র ১৮ লাখ টাকা। যেখানে বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকিও দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর বিপুল পরিমাণ এই অর্থের বৈধ কোনো উৎস পায়নি দুদক।

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘পাপিয়া কে সেটি আমাদের দেখার বিষয় না। তিনি ৩ কোটি টাকা কোথায় পেলেন, আমরা তা খতিয়ে দেখব। তিনি তার টাকার উৎস দেখাতে না পারলে মামলা হবেই। অনুসন্ধান চলছে। সে অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

র‌্যাবের দেয়া তথ্য মতে পাপিয়া ও তার স্বামীর মালিকানায় ইন্দিরা রোডে দুটি ফ্ল্যাট, নরসিংদীতে দুটি ফ্ল্যাট ও ২ কোটি টাকা দামের দুটি প্লট, তেজগাঁওয়ে এফডিসি ফটকের কাছে গাড়ির শোরুমে ১ কোটি টাকার বিনিয়োগ ও নরসিংদী জেলায় একটি প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ টাকার বিনিয়োগ আছে। অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড, জাল নোট সরবরাহ, রাজস্ব ফাঁকি, অর্থ পাচারসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের গ্রেফতার করা হয়। র‌্যাবের তথ্য মতে, গত ১২ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে এই দম্পতি পাঁচ তারকা হোটেলের কয়েকটি বিলাসবহুল কক্ষে অবস্থান করেন। ভাড়া বাবদ পরিশোধ করেন ৮১ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

এদিকে পাপিয়ার বিরুদ্ধে করা দুটি মামলা তদন্ত শুরু করেছে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো ডিবি থেকে তদন্তের জন্য র‌্যাবের কাছে পাঠানো হয়। মূলত র‌্যাবের আবদনের প্রেক্ষিতে মামলাগুলো ডিবি থেকে র‌্যাবের কাছে পাঠানো হয়। এর আগে ৩ মামলায় বনানী থানা পুলিশের কাছে রিমান্ড হেফাজতে ছিল পাপিয়া দম্পতিসহ ৪ জন। পরে তা ডিবিতে হস্তান্তরের পর ডিবি কার্যালয়ে রেখে পাপিয়া দম্পতি ৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদের অনেক তথ্য বেরিয়ে আসে। এসব তথ্যে রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, সরকারি কর্তাদেরও নাম জড়ায় পাপিয়া কেলেঙ্কারিতে। পরে এসব বিষয়ে সংবাদ পরিবেশনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সতর্ক করা হয়। পাশাপাশি কিছু তথ্যের বিষয়ে ডিএমপি থেকেও প্রতিবাদ করা হয়। এমন বিতর্কের মধ্যে অস্ত্র ও মাদকের মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। আর অর্থ পাচারের অভিযোগে করা মামলাটি তদন্তে জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জাল মুদ্রা, ইয়াবা ও নগদ দুই লাখ টাকাসহ পাপিয়া, তার স্বামী সুমন চৌধুরী, সহযোগী সাব্বির ও শেখ তায়্যিবাকে গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এরপর তাদের নিয়ে অভিযান চালিয়ে রাজধানীর ফার্মগেটের দুই ফ্ল্যাট থেকে নগদ ৫৮ লাখ টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা, ৭ রাউন্ড গুলিসহ বিদেশি পিস্তল ও মদ উদ্ধার করে। পাপিয়াদের নামে বিমানবন্দর থানায় একটি ও শেরেবাংলা নগর থানায় দুইটি মামলা করে। তিন মামলায় ১৫ দিনের রিমান্ডে পাপিয়াসহ চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পায় র‌্যাব। এ কারণে তারা এখন র‌্যাব-১ এর হেফাজতে রয়েছে। এর আগে, ১৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।