• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৫, ২০ জিলহজ ১৪৪০

পবিত্র হজ পালন

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , রোববার, ১১ আগস্ট ২০১৯

image

মুসলিম উম্মাহর শান্তি-সমৃদ্ধি ও নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য কান্নাকাটির মাধ্যমে পালিত হলো মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম সমাবেশ ও ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ পবিত্র হজ। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়াননি’ মাতা লাকা ওয়ালমুলক; লা শারিকা লাক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিল আরাফার প্রান্তর। লাখো হাজির কণ্ঠে পুনঃপুনঃ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছে, ‘আমি হাজির, আমি হাজির দয়াময়’। এ সময় সবার চোখ থেকে পানি ঝরছিল।

গতকাল ঐতিহাসিক আরাফাত ময়দানে সারা দিন অবস্থান, খুতবা শ্রবণ, জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায়, আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় হজের মূল পর্ব। দুপুরে আরাফাতের ময়দানসংলগ্ন মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা শুরু হয়। এ বছর হজে খুতবা দেন সৌদি আরবের বিশিষ্ট আলেম, শায়খ মুহাম্মদ বিন হাসান আলে আশ-শায়খ। তিনি সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ এবং গবেষণা-মুফতি বোর্ডের সদস্য। পাশাপাশি খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন হাদিস কমপ্লেক্সের পরিচালক। খুতবার শুরুতে দরুদ পাঠ করেন তিনি। উপস্থিত হাজিদের সুস্থতা কামনা করেন। তাদের জন্য দোয়া করেন।

খুতবায় রাসূলের (সা.) একটি হাদিস পড়েন, যার মূলকথা- কোন মুসলমানের যদি সক্ষমতা অর্জন হয়, তাহলে জীবনে একবার হলেও তাকে অবশ্যই হজ করতে হবে। শায়খ মুহাম্মদ বিন হাসান বলেন, তাওহিদ ও খতমে নবুওয়্যতের সাক্ষী ইসলামের মৌলিক রোকন। এছাড়া নামাজ ও জাকাত ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। জাকাতের মাধ্যমে গরিব অসহায়দের ব্যাপক কল্যাণ সাধিত হয়। হজের খুতবায় আরও বলা হয়, আল্লাহ তায়ালার হুকুম কখনো পরিবর্তন হয় না। আল্লাহ তায়ালা মানুষ এবং জিন জাতিকে তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এজন্য তাওহিদ ও আল্লাহর একত্ববাদের বিষয়টি আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। মুসলিম উম্মাহর মুক্তির উপায় উল্লেখ করে শায়খ মুহাম্মদ বিন হাসান এ বছরের হজের খুতবায় বলেন, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালার রহমতের কথা বারবার বলা হয়েছে। আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরাই মুক্তির একমাত্র উপায়। এছাড়া অন্য কোন পথ নেই।

খুতবা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বিশ্বের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করেছে। অনেক হজ এজেন্সি নিজ উদ্যোগে আরাফার ময়দানে উপস্থিত হাজিদের খুতবার অনুবাদ শোনানোর ব্যবস্থা নিয়েছেন। আরাফার ময়দানে উপস্থিত সফেদ-শুভ্র কাপড়ের ইহরাম পরিহিত হাজিদের সামনে দেয়া হজের খুতবা বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এ খুতবা যেমন সমবেত হাজিরা শোনেন, তেমনি শোনেন বিশ্ববাসী।

আরাফাতের ময়দানে কার্যক্রমকেই হজের মূল অনুষ্ঠান হিসেবে ধরা হয়। ইসলামী রীতি অনুযায়ী, জিলহজ মাসের নবম দিনটি আরাফাত ময়দানে অবস্থান করে ইবাদতে কাটানোই হল হজ। মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, আদি পিতা আদম ও আদি মাতা হাওয়া পৃথিবীতে পুনর্মিলনের পর এই আরাফাতের ময়দানে এসে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। ১৪ শ’ বছরেরও বেশি সময় আগে এখানেই ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) দিয়েছিলেন তাঁর বিদায় হজের ভাষণ। এ ময়দানেই ইসলামের পরিপূর্ণতার ঘোষণা দিয়ে পবিত্র কোরআনের আয়াত নাজিল হয়েছিল। এই আরাফাতে উপস্থিত না হলে হজের আনুষ্ঠানিকতা পূর্ণাঙ্গ হয় না। তাই হজে এসে যারা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাদেরও অ্যাম্বুলেন্সে করে আরাফাতের ময়দানে নিয়ে আসা হয় স্বল্প সময়ের জন্য।

এরআগে সৌদি আরবের মিনায় মুসল্লিদের জড়ো হওয়ার মধ্য দিয়ে গত শুক্রবার পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শনিবার ফজরসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পর মিনা থেকে দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত আরাফাতের ময়দানের দিকে যান হাজিরা। প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে আরাফাতের ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করেন। আরাফাতে যাওয়ার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে মুসল্লিরা হেঁটে বা বাসে; যে যেভাবে পারেন পৌঁছান। এ সময় ‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ ধ্বনিতে মুখরিত হয় আরাফাতের ময়দান।

হজের অংশ হিসেবে আরাফাতের ময়দান থেকে সুর্যাস্তের পর মুসল্লিরা মাগরিবের নামাজ আদায় না করেই রওনা দেন প্রায় আট কিলোমিটার দূরে মুজদালিফার দিকে। সেখানে পৌঁছে মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন। এখানে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করেন হাজিরা। পাশাপাশি মিনার জামারায় (প্রতীকি) শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য পাথর সংগ্রহ করেন। আজ (১০ জিলহজ) ফজরের নামাজ আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় ফিরে আসবেন হাজিরা। মিনায় এসে বড় জামারাকে কঙ্কর নিক্ষেপ, কোরবানি ও মাথা মুণ্ডন বা চুল ছেঁটে স্বাভাবিক পোশাকে মক্কায় কাবা শরিফ তাওয়াফ করবেন। তাওয়াফ, সাই শেষে মিনায় ফিরে গিয়ে ১১ (সোমবার) ও ১২ জিলহজ (মঙ্গলবার) অবস্থান ও প্রতিদিন তিনটি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন।

মিনায় (জামারাত) শয়তানকে পাথর নিক্ষেপের সময় যাতে কোন দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সৌদি হজ কর্তৃপক্ষ (মোয়াচ্ছাসা) হাজিদের ভাগ ভাগ করে জামারাতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। জামারাতে পাথর নিক্ষেপ ও পশু কোরবানির পর পুরুষরা মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম ত্যাগ করবেন। এরপর পবিত্র কাবা শরিফে বিদায়ী তাওয়াফ করে হজের পূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করবেন হাজিরা। হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে যারা আগে মদিনায় যাননি তারা মদিনায় যাবেন। সেখানে হাজিরা সাধারণত ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। পরে শুরু হবে হাজিদের দেশে ফেরার পালা।

এবারের হজে অংশ নিচ্ছেন প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। হজ উপলক্ষে সার্বিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করেছে সৌদি সরকার। এবার বাংলাদেশ থেকে হজ করতে গেছেন প্রায় এক লাখ ২৭ হাজার মুসল্লি। বাংলাদেশ থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়া হাজিরা জামারাতের কাছে মোয়াল্লেম নম্বর ৭ ও ৮-এর অধীনে থাকবেন। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া হাজিরা থাকবেন ৩, ৪, ৬, ১১, ২০, ৫৭, ৫৯, ৬০, ৭৫-৭৭, ৯৯, ১০১, ১০৩ থেকে ১৩৭ মোয়াল্লেম নম্বরের অধীনে। মিনায় হাজিদের সহায়তার জন্য ২৪/৬২ নম্বর তাঁবুতে পাঁচ দিন বাংলাদেশ হজ কার্যালয়ের কার্যক্রম চালানো হবে বলে জানা গেছে।