• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জৈষ্ঠ্য ১৪২৫, ১৪ রমজান ১৪৪০

পদ্মা সেতু এগিয়ে চলছে রেলসংযোগ প্রকল্প

সংবাদ :
  • মাওয়া থেকে ফিরে মাহমুদ আকাশ

| ঢাকা , শুক্রবার, ১৫ মার্চ ২০১৯

image

পদ্মা সেতুর শুরু থেকেই গাড়ির সঙ্গেই চলবে ট্রেনও। তাই পুরোদমে চলছে পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্পের কর্মযজ্ঞ। রেল চলাচলের জন্য ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭৩ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। গত বছর ১৪ অক্টোবর প্রকল্পের নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ১৭ শতাংশ। ৩৯ হাজার ২৫৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে এই রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে চীনের এক্সিম ব্যাংক ঋণ সহায়তা দিবে ২১ হাজার ৩৬ কোটি ৬৯ লাখ। বাকি ১৮ হাজার ২২১ কোটি ৪৪ টাকা ব্যয় হবে সরকারি ফান্ড থেকে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পর্যন্ত একটি অংশ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করা হবে।

এ বিষয়ে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন সংবাদকে বলেন, বরিশালসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্যে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, পুরো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত হবে। পদ্মা সেতু দিয়ে যেদিন থেকে গাড়ি চলাচল শুরু হবে সেদিন থেকে রেল চলাচল যাতে শুরু করা যায় সেজন্য ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য।

এ বিষয়ে পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম ফখরুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সংবাদকে বলেন, পুরো প্রকল্পকে ৫টি অংশে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার কমলাপুর থেকে গেন্ডারিয়া স্টেশন পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার ডুয়েজ গেজ (ডিজি) ডাবল লাইন রেলপথ, গেন্ডারিয়া থেকে মাওয়া পর্যন্ত ৩৬ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ এবং ৪টি স্টেশন নির্মাণ, ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত ৮৬ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ ও ১০টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এই অংশের কাজ শেষ হবে ২০২২ সালে ডিসেম্বরে। তবে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা জংশন পর্যন্ত ৪২ দশমিক ১৯৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ এবং ৫টি স্টেশন নির্মাণ কাজ ২০২০ সালে ডিসেম্বরে শেষ করা হয়। এ সময় মধ্যে পদ্মা সেতু ট্রেন চলাচলের জন্য ১০০টি ব্রডগেজ কোচ সংগ্রহ বলে জানান তিনি।

সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, পুরোদমে চলছে পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের কাজ। প্রকল্পের সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে মাওয়া পর্যন্ত। এই অংশে পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়কের পাশ দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে রেলপথ। জাজিরার বিভিন্ন এলাকায় মাটি ভরাটসহ চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। এছাড়া কেরানীগঞ্জের পানগাঁও ও মাদারীপুরের শিবচরের আড়িয়াল খাঁ নদীর লঞ্চঘাটে রেলসেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গা নদীতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা লঞ্চ থেকে পানগাঁও বরাবর রেলসেতু নির্মাণ করা হবে। এ জন্য নদীর দুই তীরে মাটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। আড়িয়াল খাঁ নদীতে পানি কম থাকায় রেলসেতু নির্মাণ কাজের সরঞ্জাম পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। তাই বিকল্প একটি স্টিলের সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পেই বুড়িগঙ্গা ও ধলেরশ্বরী নদীসহ ছোট-বড় ১২৫টি সেতু নির্মাণ করা হবে। এছাড়া এই রেলপথে তিনটি ফ্লাইওভারসহ ৪০ পয়েন্টে নির্মাণ করা হবে লেভেল ক্রসিং ও আন্ডারপাস। এছাড়া পদ্মা সেতুর রেলসংযোগসহ উড়াল রেলপথ হবে পাথরবিহীন আধুনিক প্রযুক্তিতে। ঢাকা-ভাঙ্গা-যশোর রেলপথ প্রকল্পের আওতায় মোট ২৮ কিলোমিটার অংশে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে রেলওয়ে। কনক্রিটের ঢালাই করা ভিত্তির (বেইজ) ওপর রেলপাত বসানো হবে। এ ধরনের রেলপথের আয়ুষ্কালও অনেক বেশি। মূলত উচ্চগতির ট্রেন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন মেট্রো ও টানেলে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান।

প্রকল্প সূত্র জানায়, ১৭২ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে ২৩ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার হবে ভায়াডাক্ট (উড়াল রেলপথ), এক দশমিক ৯৮ কিলোমিটার র‌্যাম্প, ৬৬টি বড় সেতু, ২৪৪টি ছোট সেতু ও কালভার্ট, একটি হাইওয়ে ওভারপাস, ২৯টি লেভেল ক্রসিং, ৪০টি আন্ডারপাস, ১৪টি নতুন স্টেশন ভবন নির্মাণ, ছয়টি বিদ্যমান স্টেশনের উন্নয়ন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ, ২০টি স্টেশনে টেলিযোগাযোগসহ কম্পিউটার ভিত্তিক রেলওয়ে ইন্টারলক সিস্টেম সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। ঢাকা-ভাঙ্গা পর্যায়ে স্টেশন থাকবে ৭টি। এগুলো হলো-কেরানীগঞ্জ, নিমতলা, শ্রীনগর, মাওয়া, জাজিরা, শিবচর ও ভাঙ্গা। পাশাপাশি গেন্ডারিয়া স্টেশন ভবন রি-মডেলিং (আধুনিক) ও ঢাকা স্টেশন ইয়ার্ড রিমডেলিং করা হবে। ভাঙ্গা-যশোর অংশে দ্বিতীয় পর্যায়ে ছোট-বড় ৬৫ সেতু নির্মাণ করতে হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে নতুন আটটি রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এগুলো হলো- ভাঙ্গা জংশন, নগরকান্দা, মুকসুদপুর, মহেশপুর, লোহাগড়া, নড়াইল, জামদিয়া ও পদ্মাবিল। পুরো প্রকল্পের জন্য ৯ জেলায় ১৭০০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জের প্রকল্প এলাকায় জমি অধিগ্রহণ শেষে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে নড়াইল ও যশোরের কিছু এলাকায় জমি অধিগ্রহণের এখনও কাজ এখনও চলছে। চায়না ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭ শতাধিক লোক প্রকল্প এলাকায় কাজ করছে। ২০১৬ সালে পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্প অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু গত এপ্রিলে প্রকল্পের ব্যয় আরও ৪ হাজার ২৬৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে এবং ২০২৪ সালে জুনে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্পের নির্মাণ কাজ করছে চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিআরইসি।

জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০১৫ সালে ২৮ জানুয়ারি চায়না রেলওয়ে গ্রুপের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করা হয়। এরপর ২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কমার্শিয়াল চুক্তি সম্পন্ন হয়। এছাড়া প্রকল্পের সুপারভিশন পরামর্শ হিসেবে বাংলাদেশ আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর (বিআরটিসি) ও বুয়েটকে যৌথভাবে নিয়োগ দেয়া হয়। এ লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি কনসালটেন্সি সার্ভিসের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রথম পর্যায় রাজধানীর গেন্ডারিয়া থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া হয়ে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ফরিপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটার ও দ্বিতীয় পর্যায় ভাঙ্গা থেকে নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত ৮৫ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ার স্ম্যাক ইন্টারন্যাশনাল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকল্পের কন্সট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্টে (সিএসসি) কাজের সহায়তা ও তত্ত্বাবধান করছেন বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।