• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৯ রবিউস সানি ১৪৪১

বুয়েট ছাত্রদের পেজটি বন্ধ করল বিটিআরসি

নির্যাতনের কথা জানাতে খোলা হয়েছে নতুন পেজ

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, ঢাবি

| ঢাকা , শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০১৯

শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের চালু করা ওয়েবপেজটি বুধবার বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সংস্থার চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে, পেজটি বন্ধ করে দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নির্যাতনের কথা জানাতে নতুন একটি পেজ খুলেছেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। এই ঠিকানায় বুয়েট শিক্ষার্থীরা নাম না প্রকাশ করে অভিযোগ জানাতে পারবেন।

বুয়েটের সিএসই বিভাগের তৈরি করা ওয়েবপেজে গত আড়াই বছরে শিক্ষার্থীরা ১০৩টি অভিযোগ করেছেন। শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনকে জানানো হলেও তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

২০১৬ সালের শেষ দিকে বুয়েটের সিএসই বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে ওয়ানস্টপ অনলাইন রিপোর্টিং সিস্টেম (ইউরিপোর্টার) নামে একটি সার্ভার গড়ে তোলেন। এতে বুয়েটের যে কোন শিক্ষার্থী নিজের পরিচয় প্রকাশ না করে অভিযোগ জানাতে পারেন। বুধবার পর্যন্ত ১০৩টি অভিযোগ সার্ভারে জমা হয়েছে। এর মধ্যে গত রোববার রাতে বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যার পর বেশ কিছু নতুন অভিযোগ জমা পড়েছে।

বিটিআরসি বুধবার এক চিঠিতে ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) এবং ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের (আইএসপি) এই ওয়েবপেজটি বন্ধের নির্দেশ দেয়। বিষয়টি জানাজানি হয় রাতের দিকে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপ সচিব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান সংবাদকে বলেন, বুয়েটের পেইজটি বন্ধ করা হয়েছে এই বিষয়ে আমি কিছুই যানি না। এই বিষয়ে আপনার কাছে আমি প্রথম শুনলাম।

বিটিআরসির চেয়াম্যান মো. জহুরুল হক সংবাদকে বলেন, বুধবার রাতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি অফিস থেকে নির্দেশনা আসায় আমরা পেইজটি বন্ধ করেছি। এই পেইজের তথ্য বিকৃতভাবে ব্যবহার করে কুচক্রী মহল দেশে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে সেজন্যই পেইজটি বন্ধ করা হয়েছে। এটা স্থায়ী কোন পদক্ষেপ নয় কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিলেই পেইজটি পূনরায় চালু করা হবে। তবে কবে চালু হবে সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোন সময় বলা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশের অপেক্ষা করতে হবে।

ওয়েবপেজটি দেখভাল করছিলেন সিএসই বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা আকবর। তিনি গতকাল বলেন, এটা রিসার্চের একটা অংশ। শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার জন্য এটা ব্যবহার করা হতো। সিএসই বিভাগের অধ্যাপক আলিম আল ইসলাম রাজী ও তার বিভাগের শিক্ষার্থীরা মিলে এটা শুরু করেন। এখানে বুয়েটের যে কোন বিভাগের শিক্ষার্থীরা পরিচয় প্রকাশ না করে অভিযোগ দিতে পারতেন। তিনি বলেন, আমাদের কাজ অভিযোগগুলো জমা দেয়া। রিসার্চ টিম থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত আমার কাছে আসত। জমা পড়া অভিযোগগুলো দুই মাস আগে প্রিন্ট করে ছাত্রকল্যাণ পরিচালক ও রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বা হল প্রশাসন দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে গতকাল উপাচার্য সাইফুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান সংবাদকে বলেন, প্রায় দুই-তিন বছরের অভিযোগগুলো জমা দেয়া হয়েছে, যখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না। আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র তিন মাস আগে। এ সময়ে আমার কাছে দুই-তিনটি র‌্যাগিংয়ের অভিযোগ এসেছে। সে অভিযোগগুলো আমি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি এবং অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের শাস্তিও দিয়েছি। শিক্ষার্থীরা হয়তো ভয়-ভীতির কারণে অভিযোগগুলো জানায়নি। এজন্য পুরনো অনেক অভিযোগ সেখানে ওঠে এসছে।

পেজে জমা হওয়া অভিযোগগুলো ঘেঁটে দেখা যায়, র?্যাগিং, ছাত্রলীগের মারধর, আবাসন ও ক্যান্টিন সমস্যা, শিক্ষকদের ক্লাসের উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। আবরার হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ও বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান ওরফে রাসেলের বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীদের নানাভাবে নিপীড়ন করার অভিযোগ রয়েছে।

পেজে জমা হওয়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, আবরার হত্যায় জড়িত ব্যক্তিরা সাধারণ ছাত্রদের নানাভাবে নির্যাতন করতেন। একটি অভিযোগ করা হয়েছে আবরার হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া বুয়েট ছাত্রলীগের সহসম্পাদক আশিকুল ইসলাম ওরফে বিটু, উপদফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, উপসমাজকল্যাণ সম্পাদক ইফতি মোশারেফ ওরফে সকালের বিরুদ্ধে। তাতে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের একজন শিক্ষার্থীকে মারধর করে হল থেকে বের করে দেন এবং ওই শিক্ষার্থীর এক লাখ টাকা দামের একটি ল্যাপটপ রেখে দেন।

শেরেবাংলা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী অমিত সাহার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের মারধরের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। যে কক্ষে আবরারকে নির্যাতন করে মারা হয়, অমিত সাহা ওই কক্ষেরই একজন বাসিন্দা। তিনি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক। একটি অভিযোগে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সমাবেশে ১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ডাকা হয়। যারা সমাবেশে যাননি, তাদের রাতে শেরেবাংলা হলের ছাদে ডেকে পাঠানো হয়। সমাবেশে না যাওয়ার অভিযোগে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বেদম মারধর করা হয়। অমিত সাহার মারধরে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক বিভাগের এক শিক্ষার্থী আহত হন।

বুয়েটের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতিটি হলেই দু-তিনটি কক্ষ আছে, যেগুলো ‘রাজনৈতিক কক্ষ’ হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন ইস্যুতে, কারণে-অকারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এসব কক্ষে ডেকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। হলের ‘রাজনৈতিক কক্ষ’ হিসেবে পরিচিত কক্ষগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আতঙ্কের।

পেজে জমা হওয়া অভিযোগে দেখা যায়, ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে এম এ রশিদ হলের ৪০৫ নম্বর কক্ষে একজন ছাত্রকে মারধর করেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। মারধরের কারণে ওই ছাত্রের পায়ের রগ ছিঁড়ে যায়। ওই ঘটনার অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের কমিটিতে পদধারী।

২০১৮ সালের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়েও বুয়েটের বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা ঘটেছিল। একাধিক শিক্ষার্থী সংবাদকে এ তথ্য নিশিশ্চত করেছেন।

ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার সভাপতি খন্দকার জামী উস সানীর বিরুদ্ধেও হলের কক্ষে মারধরের অভিযোগ জমা পড়েছে। এছাড়া, ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার সাবেক সভাপতি শুভ্র জ্যোতি টিকাদারের বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীদের মারধরের কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে। গত জুনে একটি বাসা থেকে শুভ্র জ্যোতির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ৯ মে একজন অভিযোগে লিখেছিলেন, সিসি ক্যামেরা সচল থাকলে হলগুলোতে মধ্যরাতে র?্যাগিংয়ের আলামত পাওয়া যাবে।