• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১৪ আগস্ট ২০১৮, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৫, ২ জিলহজ ১৪৩৯

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আগে

নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টির চাপ প্রয়োগ করতে হবে

নিরাপত্তা পরিষদ

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

image

মায়ানমার সেনাবাহিনীকে অভিযুক্ত করা, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আগে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে অং সান সুচি’র ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ, রয়টার্সের সাংবাদিকদের মুক্তি এবং জাতিসঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সাহায্য সংস্থাকে মুক্তভাবে কাজ করতে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে উন্মুক্ত আলোচনায় তারা বলেন, এসব কিছুর ব্যবস্থা করতে হবে মায়ানমারকেই। তবে চীন এবং রাশিয়ার রাইনের ঘটনার নিন্দা করলেও তাদের দাবি, রাখাইনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সাড়ে তিন ঘণ্টার এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, বলিভিয়াসহ ১২টি দেশের স্থায়ী প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। সভাপতিত্ব করেন কুয়েতের রাষ্ট্রদূত শেখ সাবাহ খালিদ আল হামাদ। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্দি সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে যোগ দেন। আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রশ্নে নিরাপত্তা পরিষদে সদস্য দেশগুলোর সবাই মায়ানমারের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। রাশিয়ার সের্গেই ল্যাভরব, পোল্যান্ডের এন্ড্রেজেজ ডুডা, কাজাখস্তানের নূরসুলতান নজরবায়েভ সহ অন্যরাও মায়ানমারের ভূমিকার সমালোচনা করে রাখাইনে শান্তি ফেরাতে কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করেন। বৈঠকে উত্তর রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে গণকবর উদ্ধার, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরির খবরে নিরাপত্তা পরিষদের কিছু সদস্য গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।

ফিলিপ্পো গ্রান্দি বলেন, মায়ানমার থেকে সৃষ্ট এ সংকটের সমাধান মায়ানমারকেই করতে হবে। ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একই কথা বলে আসছেন। গত ৬ মাসে ৬ লাখ ৮৮ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গার বাংলাদেশ আশ্রয় পাওয়ার তথ্য জানিয়ে গ্রান্দি বলেন, শরণার্থীদের নিরাপদে নিজ আবাস ভূমিতে প্রত্যাবর্তনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আন্তরিক অর্থে সোচ্চার হওয়া দরকার। রাখাইন প্রদেশে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে, সেখানে জাতিসংঘ কর্মকর্তাসহ অন্যদের প্রবেশাধিকার দিতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে মায়ানমার সরকারকে। মিরোস্ল্যাভ বলেন, ইতোমধ্যেই ঘটে যাওয়া নৃশংসতার অনেক ঘটনাই ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। এখনও যারা পৈতৃক ভিটেমাটি আঁকড়ে রাখার চেষ্টায় রয়েছেন, সেই রোহিঙ্গারা কী ধরনের হুমকি-ধমকি সহ্য করছেন, সেটিও খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে।

মায়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও তিন বলেন, মায়ানমার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বৈঠকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, মায়ানমার সরকার দুটি অভ্যর্থনা কেন্দ্র খুলেছে এবং শিবিরও স্থাপন করেছে। কিন্তু তাতে রোহিঙ্গারা আস্থা পাচ্ছে না। রোহিঙ্গারা নাগরিক অধিকারসহ নিরাপদে নিজ পৈতৃক আবাসে ফিরে চাষাবাদ করতে চায়। অবাধে চলাফেরা ও সভা-সমিতি করার অধিকার চায়। এগুলো মৌলিক অধিকার বিধায় বিশ্বসভাকে তা বিবেচনা করতে হবে। মাসুদ বিন মোমেন মানবাধিকার কাউন্সিলের তদন্ত দলকে এখনও রাখাইন রাজ্যে প্রবেশেরর অনুমতি না দেয়ায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ ও মায়ানমার সফর করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাস্তব অবস্থা মূল্যায়নের জন্য পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে জাতিসংঘে মায়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি হাও দো সুয়ান বিতাড়িত মানুষের প্রত্যাবাসনের জন্য মায়ানমার ও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি করেছে বলে দাবি করেছেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মাসুদ বিন মোমেন জানান, নিরাপত্তা পরিষদ বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেই এ আলোচনার পর শুধু সদস্যদের জন্য আরেকটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে। সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করি। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মায়ানমারের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক রেখেই রোহিঙ্গা সংকটের অবসান ঘটানোর পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানের কথা জানিয়ে মাসুদ বলেন, এই সংকটের শেকড় মায়ানমারে এবং এর সমাধানও মায়ানমারে নিহিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জাতিসংঘ মহাসচিব শিগগিরই মায়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত নিয়োগ দেবেন এবং তার মাধ্যমে মায়ানমার সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত হবে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূত নিকি হ্যালি তার বক্তব্যে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মায়ানমারের সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞের ঘটনাকে অস্বীকার করাকে অযৌক্তিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ঘটনায় মায়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করা এবং রাখাইনে যে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে তা স্বীকার করতে অং সান সুচি’র ওপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানায়। নিকি হ্যালি বলেন, বার্মা (মায়ানমার) সরকারের প্রভাবশালী বাহিনী রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধনযজ্ঞের কথা অস্বীকার করে আসছে। তাদের এই অযৌক্তিক অস্বীকৃতির বিপরীতে মানুষ যাতে সঠিক তথ্য জানতে না পারে সেজন্য রাখাইনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনকে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না দেশটি।

যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি মায়ানমারে গ্রেফতার দুই সাংবাদিকের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। নিকি হ্যালি বলেন, বিশ্ববাসী মায়ানমারের উদ্যোগ দেখার জন্য তাকিয়ে থেকে অপেক্ষা করছে। দেশটি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি বিষোদগার করছে কিন্তু সংবাদকর্মীরা তথ্যের অপরিহার্য উৎস। রয়টার্সের দাবি, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞের খবর সংগ্রহের কারণেই মায়ানমার কর্তৃপক্ষ এই দুই সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত ফরাসি দূত ফ্রাসোয়াঁ দেলাত্রি নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, রয়টার্স রোহিঙ্গাদের হত্যাযজ্ঞের যে বিবরণ প্রকাশ করেছে তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে পারে।

বৈঠকে ইউএনএইচসিআরের হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বাংলাদেশের বর্ষাকালের বিষয়টি তুলে ধরে সবাইকে সতর্ক করে দেন। মার্চ মাসে বাংলাদেশে বৃষ্টি শুরু হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বন্যা ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় অবস্থান করছে প্রায় এক লাখ ৭ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী। বৃষ্টি হলে যে কোনও সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, নতুন করে কোনও জরুরি সংকট থেকে বাঁচার জন্য আমাদের সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে।

আলোচনায় রাখাইন অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও দুর্গত রোহিঙ্গাদের কাছে নির্বিঘেœ মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর জন্য তারা মায়ানমার কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানানো হয়।