• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯, ৭ চৈত্র ১৪২৫, ১৩ রজব ১৪৪০

নিউজিল্যান্ডে মসজিদে গুলি : নিহত ৪৯

শিশুসহ আহত ৪৮

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯

image

নিউজিল্যান্ডে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় আহতদের উদ্ধার তৎপরতা

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ৩ বাংলাদেশিসহ নিহত ৪৯ জন এবং শিশুসহ আহত ৪৮ জন। আহতদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি রয়েছে যাদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানায় নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের অনারারি কনসাল ইঞ্জি. শফিকুর রহমান। হামলার পরপর অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত ‘ব্রেন্টন ট্যারেন্ট’ নামের সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানায় স্থানীয় পুলিশ। এই হামলার ঘটনা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান নিউজিল্যান্ড সফররত বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা। তারা জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার ৫ মিনিট আগে এই হামলা হয়। হামলার পর নিউজিল্যান্ড ও বাংলাদেশের মধ্যকার তৃতীয় ও শেষ টেস্ট ম্যাচ বাতিল করা হয়।

সন্ত্রাসী একটি পুরুষ ও একটি নারীদের মসজিদে দুইটি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হামলাকারী তার হেলমেটে বসানো ক্যামেরায় গুলি চালানোর প্রায় ১৭ মিনিটের দৃশ্য ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করে। তবে হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে না দেয়ার অনুরোধ জানায় নিউজিল্যান্ড পুলিশ। এরপরই ফেসবুকের পক্ষ থেকে বন্দুকধারীর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম একাউন্ট সরিয়ে দেয়ার কথা জানানো হয়। তবে হামলার ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সেটা ফেসবুক থেকে সরানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।

ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে গোলাগুলির ঘটনায় ৪১ জন নিহত হয়েছেন আল নূর মসজিদে এবং ৭ জন মারা গেছেন লিনউড মসজিদে। আরেকজন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সময় মারা যান। নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের স্থায়ী দূতাবাস নেই, অনারারি কনসাল ইঞ্জি. শফিকুর রহমান থাকেন অকল্যান্ডে। বাংলাদেশি দুজন নিহত ও আটজন গুলিবিদ্ধের তথ্য নিশ্চিত করেন তিনি। তিনি জানান, নিহত বাংলাদেশিরা হলেনÑ স্থানীয় লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আবদুস সামাদ, তার স্ত্রী সানজিদা আকতার ও গৃহবধূ হোসনে আরা ফরিদ। নিহত ড. সামাদ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। শফিকুর রহমান ভূঁইয়া আরও জানান, মসজিদে হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। এছাড়া গোলাগুলির ঘটনার পর থেকে এক বাংলাদেশি নিখোঁজ রয়েছেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডেন এই হামলাকে তার দেশের ইতিহাসের ‘অন্ধকারতম অধ্যায়গুলোর একটি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। হামলায় জড়িত সন্দেহে আটক এক ব্যক্তি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। তিনি বলেন, সন্দেহভাজন হামলাকারী ‘একজন চরম ডানপন্থি নৃশংস সন্ত্রাসী’।

নিউজিল্যান্ডের পুলিশ এই ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদী ঘটনা বলে উল্লেখ করে বলেন, ২০ এর কোটায় বয়স - এমন এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাকে শনিবার আদালতে হাজির করা হবে। পুলিশের জিম্মায় আরও দুইজন রয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আল নূর মসজিদে গুলি শুরু হলে তারা প্রাণ বাঁচাতে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যান। মসজিদের বাইরে রক্তাক্ত অবস্থায় লোকজনকে পড়ে থাকতে দেখার কথাও জানান তারা। আল নূর মসজিদ এলাকায় মহান ইব্রাহিম নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডকে বলেন, শুরুতে আমি ভেবেছিলাম বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে এমনটা হচ্ছে। পরে দেখি সবাই দৌড়াতে শুরু করেছে। অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, হামলাকারী সামরিক বাহিনীর মতো পোশাক পরে ছিল। হাতে থাকা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে সে ক্রমাগত গুলি ছুড়তে থাকে।

বন্দুকধারী ক্রাইস্টচার্চের ডিন্স এভিনিউতে আল নূর মসজিদের হামলা সরাসরি সম্প্রচার করে। গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় থেকে এই ‘লাইভ’ শুরু হয়। একটি ড্রাইভওয়ের কাছে তিনি গাড়ি পার্ক করেন। গাড়িতে চালকের পাশের আসনে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রচুর গুলি দেখা যায়। সেখানে পেট্রল ভর্তি কয়েকটি ক্যানও ছিল। ওই ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে দুইটি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরু করে বলে জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার্স। মসজিদে ঢোকার পথেই সে একজনকে গুলি করে। ভেতরে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি করতে শুরু করে। সে বেশ কয়েকবার তার সেমি-অটোমেটিক রাইফেলটিতে গুলি ভরে এবং এলোপাতাড়ি গুলি করে। এভাবে প্রায় তিন মিনিট ধরে গুলি করার পর সে মসজিদের সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। রাস্তার দিকে যাওয়ার সময় সে আশপাশের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হামলার ভিডিও সরিয়ে নিতে কাজ করছে ক্যান্টারবুরি পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোরভাবে ওই ভিডিও শেয়ার না করার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়, ‘ক্রাইস্টচার্চে হামলার ঘটনার চরম বিপর্যয়কর ভিডিওগুলো অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে পুলিশ সচেতন এবং সেগুলো সরিয়ে নিতে কাজ করছে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বন্দুকধারীর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম একাউন্ট সরিয়ে ফেলার কথা জানিয়েছে। তবে ঘটনার দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ফেসবুক থেকে সরিয়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান ফেসবুকের মুখপাত্র এন্টনিও সান্ডা। একই সঙ্গে টুইটার থেকেও ওই ব্যক্তির একাউন্ট মুছে দেয়া হয়।

স্টেডিয়াম থেকে ওই মসজিদে যেতে ৪ থেকে ৫ মিনিট দেরি হওয়ায় নিরাপদে থেকে যান বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা। তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পর নাজমুল হাসান পাপন ফোনে কথা বলেন দলের সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে। কতটা বিপদের মুখে ক্রিকেটাররা ছিলেন গুলশানে নিজ বাসায় সেটি সংবাদমাধ্যমকে জানান বিসিবি সভাপতি।

‘আমাদের ক্রিকেটারদের ওই গ্রুপটা যখন মসজিদের কাছে যাচ্ছিল, ঠিক মসজিদের সামনে ছিল বাস, তখন সামনে একটা গাড়ি ছিল। গাড়ি থেকে বের হয়ে একজন মহিলা বলছিল ওদিকে যেও না। এর মাঝেই তারা গুলির আওয়াজ পায়। তারপর দেখে যে দুইজন মসজিদ থেকে বের হয়ে আসছে। এমন যদি হত ওরা আগে পৌঁছাত, তাহলে আমাদের খেলোয়াড়দের মসজিদের ভেতরে থাকার সম্ভাবনা ছিল। আল্লাহর অশেষ রহমত সেই জিনিসটা হয়নি।’

‘দ্বিতীয়ত, বাসটাও ওখানে ছিল না। ভিডিওতে দেখেছেন, পরে কিন্তু সে (বন্দুকধারী) বের হয়েও মেরেছে। আমাদের ক্রিকেটাররা সামনে থাকলে তখনও আক্রমণ হতে পারত। সেদিক থেকে আল্লাহর অশেষ রহমত আমাদের ওরা বেঁচে গেছে। সেখান থেকে ওরা পার্ক হয়ে সোজা চলে যায় স্টেডিয়ামে। কিছু বাংলাদেশি সাংবাদিক আটকা পড়েছিল স্টেডিয়ামে। আমরা সাথে সাথে নিউজিল্যান্ড বোর্ডের সঙ্গে আলাপ করি, ২০ মিনিটের মধ্যে পুলিশ দিয়ে তাদেরকে নিয়ে আসা হয়েছে।’ -বলেন বিসিবি সভাপতি।