• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৩ মে ২০২০, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ রমজান ১৪৪১

আদালতের পর্যবেক্ষণ

নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় নুসরাতের আত্মত্যাগ অমরত্ব দিয়েছে

ওসি মোয়াজ্জেমকে তিরস্কার

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, ফেনী

| ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৯

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় গাফিলতির অভিযোগে সাবেক সোনাগাজী থানা ওসি মোয়াজ্জেমকে তিরস্কার করেছেন আদালত। একই সঙ্গে সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ দিয়েছেন বিচারক। বৃহস্পতিবার নুসরাত হত্যা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এসব কথা বলেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, এ ঘটনায় তৎকালীন ওসি গাফিলতি করেছেন। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের কর্মকাণ্ড না ঘটে, এ ব্যাপারে সবাই সতর্ক হবেন। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি মানুষের সামনে আনার জন্য সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ জানান তিনি। বিচারক মামুনুর রশিদ বলেন, নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় নুসরাতের তেজদীপ্ত আত্মত্যাগ তাকে অমরত্ব দিয়েছে। তার অমরত্ব চিরকালের অনুপ্রেরণা। আসামিদের ঔদ্ধত্য মানবতাকে লজ্জিত করবে চিরকাল। রায়ে তিনি বলেন, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। নূর উদ্দিন হত্যার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা করে। শাহাদাত হোসেন শামীম পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে মুখ ও মাথা চেপে ধরে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদ আলম পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ১০ হাজার টাকা দেয় ও হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করে। এর পাশাপাশি সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের ও জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ নুসরাতের ওড়না দুই ভাগ করে হাত-পা পেঁচিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন দেয়। মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার পর আসামিদের ঘটনাস্থল ত্যাগে সহযোগিতা করে। প্রভাষক আবছার উদ্দিন মাদ্রাসার গেটের পাহারায় থেকে আসামিদের নিরাপদে পার করে দেয়। একই সঙ্গে সহপাঠী কামরুন নাহার মণি সাইক্লোন শেল্টারের ফ্লোরে নুসরাতকে শুইয়ে বুক চেপে ধরে ও শরীরে আগুন দিতে সহযোগিতা করেন। সহপাঠী উম্মে সুলতানা পপি হত্যার পরিকল্পনা অনুযায়ী নুসরাতকে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নেয় এবং ওড়না খুলে পা ধরে শরীরে আগুন দিতে সহযোগিতা করে। এছাড়া আবদুর রহিম শরীফ, ইমরান হোসেন মামুন ও ইফতেখার উদ্দিন রানা ঘটনায় সময় মাদ্রাসার গেটের বাইরে পাহারায় থেকে অন্যদের নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগে সহযোগিতা করে। মোহাম্মদ শামীম, মহিউদ্দিন শাকিল ঘটনার সময় সাইক্লোন শেল্টারের নিচে পাহারার দায়িত্ব পালন করে অন্যদের সহযোগিতা করে। উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমীন হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। এসব বিষয় প্রমাণিত হওয়ায় ১৬ আসামির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার আদেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হলো। জরিমানার অর্থ আদায় করে ভিকটিমের বাবাকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেয়া হলো।

রায়ে বিচারক মামুনুর রশিদ বলেন, এ মামলার আলামত হিসেবে উদ্ধার হওয়া বোরকা, ওড়না, আগুনে পোড়া নুসরাতের সালোয়ারের অংশ, ওড়নার পোড়া অংশ, ম্যাচের কাঠি, মোবাইল ফোনসেট, সিডি, জুতা, কেরোসিন মিশ্রিত পলিথিন, ড্রাম, চুঙ্গি, নুসরাতের লেখার খাতা, পরীক্ষার খাতা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হলো। একই সঙ্গে ফেনী জেলা কারাগারের দর্শনার্থীর রেজিস্টার বইটি জেলখানায় পাঠানোর আদেশ দেয়া হলো।

আদালতে নুসরাতের ভাইকে হুমকি : বহুল আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলার রায়ের দিন আদালতে প্রকাশ্যে বাদী মাহমুদুল হাসান নোমানকে হুমকি দিয়েছে আসামি ও তার স্বজনরা। বৃহস্পতিবার সকালে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদের আদালতে উপস্থিত হলে আসামিরা তার দিকে তেড়ে আসে। এ সময় তাকে গালমন্দ করে হুমকি দেয়। নোমান সাংবাদিকদের বলেন, নানাভাবে আসামিপক্ষের লোকজন আমাকে ও আমার পরিবারের লোকদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আজও আদালতে প্রকাশ্যে আমাকে হুমকি দেয়া হয়েছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি আমার পরিবারের নিরাপত্তা চাই। এর আগে রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নুসরাতের বাবা একেএম মুসা মানিকও তার পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নানাভাবে হুমকি-ধমকি পাচ্ছি। পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবী সব সময় খোঁজখবর নিচ্ছেন। তিনি আমাদের পরিবারের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনীর পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবী জানান, নুসরাতের পরিবারের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নুসরাতের ওপর নৃশংস ঘটনার পর থেকে তাদের বাড়িতে পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন। প্রয়োজনে এটি আরও বাড়ানো হবে।

হাসতে হাসতে আদালতে উঠলেও রায় শুনে কান্নায় ভেঙে পড়ে অধ্যক্ষ সিরাজ : নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা গতকাল আদালতে ওঠার সময় হাসিমুখ থাকলেও রায়ের পর কান্নায় ভেঙে পড়ে। এ সময় সেসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। তারা বারবার নিজেদের নির্দোষ দাবি করে। রায়ের পর পুলিশ ভ্যানে আসামিদের ওঠালে অপর আসামিরা অধ্যক্ষ সিরাজকে লক্ষ্য করে বলতে থাকে, ‘তোর জন্যই এই অবস্থা।’

আদালত সূত্রে জানা গেছে, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে অধ্যক্ষ সিরাজসহ এই মামলার ১৬ আসামিকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালত প্রাঙ্গণে আনা হয়। ১১টায় বিচারক মামুনুর রশিদ এজলাসে বসে মামলার রায় পড়া শুরু করেন। টানা ১৫ মিনিট ধরে ৩ পৃষ্ঠার রায়ের মূল অংশ পাঠ করেন তিনি। এ সময় রায় শুনে অধ্যক্ষ সিরাজসহ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা কান্নায় ভেঙে পড়ে।

আইনজীবী বিনা টাকায় নুসরাতের মামলা লড়ে জিতেছেন : নুসরাত হত্যা মামলার এ রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী শাজাহান সাজু। গতকাল নুসরাত হত্যার রায় ঘোষণার পর তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান। এই আইনজীবী বিনা টাকায় নুসরাতের মামলা লড়ে জিতেছেন। তিনি বলেন, আদালত বলেছেন, বাংলাদেশের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন মেয়ে আর এ ধরনের হত্যার শিকার হবে না। ভবিষ্যতে আর কোন নারী এ ধরনের ঘটনার শিকার হবেন না। সব আসামিকে আইনের ১ ও ৩০ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।