• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১০ রবিউস সানি ১৪৪১

আ’লীগ-যুবলীগ-কৃষক লীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগ

নতুন নেতৃত্বে সময়োপযোগী করার পরিকল্পনা

শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক রদবদলের আভাস, পদবঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় অস্থিরতা

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯

একদিকে শুদ্ধি অভিযানে গ্রেফতারের ভয়, অন্যদিকে জাতীয় সম্মেলনে (কাউন্সিল) পদ হারানোর আশঙ্কাÑ এ দুয়ে মিলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর একশ্রেণীর নেতাকর্মীর মধ্যে আতঙ্ক এবং অস্থিরতা বিরাজ করছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দল এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোকে জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বে ঢেলে সাজিয়ে সময়োপযোগী এবং আধুনিক করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান চলমান রেখে তিনি ‘দল-পরিবার’ নির্বিশেষে সবাইকে আইনের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন। সম্প্রতি দলের এক সভায় আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলের আগেই সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম চার সংগঠনকে সম্মেলন করার নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্দেশনা অনুযায়ী সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগ ২ নভেম্বর, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ৯ নভেম্বর, যুবলীগ ২৩ নভেম্বর ও ভ্রাতৃপ্রতিম শ্রমিক লীগ ১৬ নভেম্বর নিজ নিজ সংগঠনের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করে।

এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন যাবৎ চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, ক্যাসিনো ও জুয়া ব্যবসাসহ নানা অপকর্ম জড়িত থেকে বিশাল সম্পদ অর্জন করা ক্ষমতাসীনদের একটি শ্রেণী এখন গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সদ্য বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী স¤্রাট ও তার সহযোগীরা গ্রেফতার হওয়ায় একদিকে তাদের (একটি শ্রেণীর) আতঙ্ক বেড়েছে, অন্যদিকে বিতর্কিতদের মদদ দেয়ার অভিযোগে সমালোচিত হওয়ার কারণে আসন্ন জাতীয় সম্মেলনে পদবঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় তাদের অস্থিরতাও বেড়েছে।

এদিকে স¤্রাটের মতো এক প্রভাবশালী নগর নেতার গ্রেফতার, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের (স্ত্রীসহ) ব্যাংক হিসাব জব্দ, যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীসহ কয়েক শীর্ষ পর্যায়ের নেতার ব্যাংক হিসাব তলব, ক্ষমতাসীন দল ও এর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের কেন্দ্রীয় (সমালোচিত ও অভিযুক্ত) নেতাদের ওপর নজরদারি চলমান শুদ্ধি অভিযানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। এ অভিযান চলমান থাকলে ‘দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, অনুপ্রবেশকারী, অপকর্মকারী কেউ ছাড় পাবেন না’Ñ এমন ধারণা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে সব নেতাকর্মীর মধ্যে। ত্যাগী ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তিসম্পন্ন পদবঞ্চিত নেতারা আশাবাদী হয়ে উঠেছেন দলীয় আসন্ন কাউন্সিলে বিভিন্ন কমিটিতে পদপ্রাপ্তির আশায়। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েক নেতার সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, যারা দলের প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ পন্থায় বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘অ্যাকশন’ শুরু হয়ে গেছে। কেউ পার পাবে না। সম্মেলন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতারা আওয়ামী আগামী কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাবেন। বিতর্কিতদের নতুন কমিটিতে স্থান হবে না। আওয়ামী লীগের সমমনা নয়, আগাছা, পরগাছাÑ এমন কেউ যাতে দলের ভেতরে অনুপ্রবেশ করতে না পরে, এ জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে বলেছেন আমাদের দলের সভানেত্রী। যেসব জায়গায় (জেলা-উপজেলা) সম্মেলন হচ্ছে, সেখানে বিতর্কিতরা যেন কমিটিতে আসতে না পারে, এ বিষয়ে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সতর্ক করা হয়েছে।

চলমান শুদ্ধি অভিযানের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গত মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি এবং দলের নেতাদের বিরুদ্ধেও অপরাধের দায়ে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার নজির রয়েছে। এর আগে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনারা যাদের সন্দেহ করেছেন, তারা গ্রেফতার হয়ে?ছে। সামনে আরও গ্রেফতার হবে। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের চক্র ভেঙে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। ‘টার্গেট অ্যাচিভ’ না হওয়া পর্যন্ত শুদ্ধি অভিযান চলবে। কেউই পার পাবে না। আসন্ন জাতীয় সম্মেলন ঘিরে ‘শোডাউন’ করে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, নেত্রী শেখ হাসিনা তার কর্মীদের ভাষা বুঝতে পারেন। আওয়ামী লীগে অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন, কাকে দলের কোন দায়িত্ব দিতে হয়Ñ তা তিনি জানেন।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিয়মিত আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলেও যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের কমিটি প্রায় সাত বছরের পুরনো। সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৪ জুলাই যুবলীগের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়। ওই কাউন্সিলে ওমর ফারুক চৌধুরী সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও হারুন-অর-রশিদ সাধারণ সম্পাদক হন। ২০১২ সালের ১১ জুলাই মোল্লা মো. আবু কাওসার সভাপতি ও পঙ্কজ দেবনাথকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সর্বশেষ কমিটি হয়। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই কৃষক লীগের সর্বশেষ কমিটি হয় মোতাহার হোসেন মোল্লা সভাপতি ও খন্দকার শামসুল হক রেজাকে সাধারণ সম্পাদক করে। ২০১২ সালের ১৭ জুলাই শুক্কুর মাহমুদ সভাপতি ও সিরাজুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে শ্রমিক লীগের কমিটি হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতাদের পদ আঁকড়ে ?রাখার প্রবণতায় বছরের পর বছর সম্মেলন হয় না এসব সহযোগী সংগঠনগুলোর। গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সহযোগী সংগঠনগুলো। ফলে এসব সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম।

নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, এবার আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর শীর্ষ (সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক) নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে।

সম্প্রতি এসব সংগঠনের সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ হওয়ায় সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে। এ পাশপাশি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে চলছে শীর্ষ নেতাদের পদচারণা। শুরু হয়েছে পদপ্রত্যাশীদের ‘শোডাউন’। চলছে নিজ নিজবলয়ে ‘তদবির-লবিং’।

আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, এবার সহযোগী সব সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব আসবে।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর একাধিক সদস্য সংবাদকে বলেন, দলের সবাই সর্বসম্মতভাবে নেত্রী শেখ হাসিনাকে আজীবন সভাপতি রাখতে চান। আর তাদের নেত্রী ওবায়দুল কাদেরের কর্মকা-ে সন্তুষ্ট। তাই এবার (২১তম কাউন্সিলে) সাধারণ সম্পাদক পদটি অপরিবর্তিত থাকবে। তবে অন্যান্য সব পদেই ব্যাপক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। বিগত সময়ের তুলনায় এবার সভাপতিম-লীর সদস্য ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদে নারীদের বেশি প্রধান্য দেয়া হবে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একটি সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন যাবৎ টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মে জড়িত থেকে বিশাল সম্পদ অর্জন করা নেতাদের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি অবহিত। তাদের কমিটিতে স্থান দেয়া হবে না। এছাড়া কেন্দ্রীয় যেসব নেতা নিজের এলাকায় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেননি, স্থানীয় পর্যায়ে (জেলা ও সংসদীয় আসনে) কোন্দল মীমাংসা না করে ‘গ্রুপিং’ করেছেন, তারাও এবার পদ হারাতে পারেন। এবারের সম্মেলনে দল ও সরকারকে যতটুকু সম্ভব পৃথক করার পরিকল্পনাও রয়েছে শেখ হাসিনার। তাই মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যকে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হবে না।