• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭, ১৮ জিলকদ ১৪৪১

হাসপাতাল ৬৫৪টি হ বেড ৫১,৩১৮ করোনা রোগী ১ লাখ ৪৫ হাজার নন-করোনা অজ্ঞাত

দ্রুত হাসপাতালের বেড না বাড়ালে সংকট আরও প্রকট হবে

| ঢাকা , বুধবার, ০১ জুলাই ২০২০

দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটির বেশি। দেশবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সারাদেশে মাত্র ৬৫৪টি হাসপাতাল রয়েছে। এসব হাসপাতালের বেডসংখ্যা ৫১ হাজার ৩১৬টি। আইসিইউ ৫১৭টি এবং সিসিইউ ৪৮১টি। সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে মেডিকেল কলেজ, স্পেশালাইজড হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট রয়েছে ১৪০টি। সব হাপসপাতালের বেডসংখ্যা ৩১,২৬০টি। এর বাইরে উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে ৫১৪টি। এসব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বেডসংখ্যা ২০ হাজার ৫৬টি। হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র রয়েছে পুরনো ৪৩৮টি, করোনাকালে নতুন তৈরি আরও ৭৯টি, সবমিলিয়ে এ সংখ্যা ৫১৭টি, সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) ৪৮১টি। সব নিয়ে সর্বশেষ বেড সংখ্যা দাঁড়ালো ৫১ হাজার ৩১৬টি। মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। তার জন্য হাসপাতালের বেড, আইসিইউ দ্রুত বেড বাড়াতে হবে। এখনই প্রস্তুতির দরকার।

নিবিড় পরিচর্যা (ইনটেনসিভ কেয়ার) মেডিসিন বিশেষজ্ঞ জানান, দেশে করোনার আরও বেশি টেস্ট করতে হবে। মানুষকে বাসাবাড়িতে থাকা নিশ্চিত না করলে শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে। এখন যে হারে বাড়ছে এবং করোনা সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা এখন শতকরা ২০ ভাগের বেশি। এ হিসাবে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে এক সময় আড়াই কোটি পর্যন্ত টেস্ট করলে অনেক করোনা রোগী শনাক্ত হয়ে যাবে। এভাবে দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়বে এবং পরিস্থিতির আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৫১ হাজার বেডে করোনা রোগী ও অন্যান্য (নন-কোভিড) রোগী ভর্তি করতে হয়। এখনই হাসপাতালে সিট ও আইসিইউ পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ছে। রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। করোনা রোগী ও করোনার উপসর্গ বুঝে সন্দেহভাজন যারা আছে তাদের দ্রুত টেস্ট করে আইসোলেশনে নিয়ে যাওয়া দরকার। এখনই সরকারি হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি আরও বাড়াতে হবে। প্রতিদিন যদি গড়ে সাড়ে ৩ হাজার নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয় এবং এরমধ্যে কমপক্ষে ৭শ’ রোগী যদি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যায়। তাতে সিট পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে।

এদিকে করোনা রোগীদের চিকিৎসা ও আইসিইউ মনিটরিং কমিটির বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. দেবব্রত বনিক বলেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের যাতে আইসিইউতে যেতে না হয় তার জন্য সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন। বাসার কেউ করোনার উপসর্গ থাকলে তাকে আলাদাভাবে থাকতে হবে। আর করোনাভাইরাস সন্দেহ হলে তাকে করোনা টেস্ট করতে হবে। বাসাবাড়ি থেকে বের হওয়ার ওপর আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। প্রয়োজনে এক একটি পরিবারকে ১৫ দিন পর্যন্ত টানা বাসায় থাকতে হবে। একভাবে পরিবার প্রতি ভাগ করে বাসাবাড়ি থেকে বের হলে তাকে অন্তত একটি পরিবার ১৫ দিনের জন্য হলেও করোনামুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে শপিংমল ও দোকানপাট ভাগ করে খুললে হয়ত আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমবে বলে এ বিশেষজ্ঞ আশাবাদী।

মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক হোসেন বলেন, করোনা রোগী আরও বেশি শনাক্ত করা দরকার। এজন্য বেশি বেশি টেস্ট করতে হবে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে করোনা রোগীদের বেড ও আইসিইউ সমস্যা হচ্ছে। রোগীরা চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে থাকলে ভালো হয়। এজন্য দরকার হলে ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করতে হবে। সেখানে চিকিৎসক রোগীদের তদারকি করলে রোগীরা ভালো থাকবে। আর শনাক্তকারীদের আইসোলেশন এবং সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টিনে রেখে তদারকি করলে রোগীর সুস্থতার হার বাড়বে। এছাড়াও সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মানতে হবে। অন্যথায় জুলাই মাসে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ সম্পর্কে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি প্রফেসর ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এখন যারা বাঁচতে চায় তাদের নিজেদের মতো নিজেদের ব্যবস্থা নিতে হবে। সামনে কোরবানির ঈদের সময় মানুষের চলাচল বাড়বে। তখন সমস্যা হতে পারে। এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের দিতে হবে। আর আক্রান্তদের মধ্যে অনেকের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না। ফলে হাসপাতালে রোগীর তুলনায় বেড কম থাকলে সমস্যা হবে না বলে এ বিশেষজ্ঞ জানান।

একজন সিনিয়র বিশেষজ্ঞ বলেন, করোনাভাইরাস জুলাই মাসে ব্যাপক আকারে বাড়বে। এজন্য আরও নতুন হাসপাতাল তৈরি ও পুরনো হাসপাতালের বেড বাড়াতে হবে। আগামী কোরবানির ঈদের সময় গবাদী পশুর হাট বসলে জনসমাগম বাড়বে। এতে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কোরবানির ঈদে যাতে জনসমাগম কম হয় তার জন্য এখনই পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, কেবিন ব্লক ভবনে করোনা রোগী ভর্তি করা হবে। বেডসংখ্যা হবে ২শ’। আগামী সপ্তাহে তা শুরু করা হবে। এ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯০৬টি বেড ও ২১টি আইসিইউ বেড রয়েছে। এখনও প্রতিদিন নন-কোভিড রোগীর সংখ্যা প্রায় এক হাজারেরও বেশি হয়। এছাড়াও অপারেশন করতে হয়। চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আর ভার্সিটির বেতার ভবনে ফিভার ক্লিনিক ও করোনা রোগীর টেস্ট করা হয়। সেখানে প্রতিদিন বহু রোগী টেস্ট ও ডাক্তার দেখাতে যান।

মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, দেশের করোনা

ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ৮৫ জন বাসাবাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আর শতকরা ১৫ ভাগ হাসপাতালে যান। এরমধ্যে ২ থেকে ৩ ভাগ আইসিইউ সাপোর্ট লাগে। এখন হাসপাতালগুলোতে করোনা চিকিৎসা ব্যবস্থা আগের চেয়ে আরও উন্নত হয়েছে। পর্যাপ্ত অক্সিজেন, আইসিইউর ব্যবস্থা আছে। এরপরও স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে সর্বক্ষণ রোগীদের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাস্থ্য বুলেটিনে বলেন, করোনাভাইরাস থেকে রক্ষায় আপনার সুরক্ষা আপনার হাতে। নিজেকে এবং পরিবারের সব সদস্যকে সুরক্ষিত রাখুন। সঠিকভাবে মাস্ক পরুন। বার বার সাবান পানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোন। জনসমাবেশ এড়িয়ে চলুন। কমপক্ষে ৩ ফুট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। আর আক্রান্তদের মনোবল না হারিয়ে চাঙ্গা রাখার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগের বেশি ব্যক্তির মৃদু উপসর্গ থাকে। আর ৫ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে উপসর্গগুলো অতিমাত্রায় হয়ে থাকে। আর ৩ ভাগ বা কিছু বেশি রোগীর উপসর্গ জটিল হয়ে থাকে। কাজেই যারা আক্রান্ত হয়েছেন তারা মনোবল দৃঢ় রাখবেন। কারণ মনোবল দৃঢ় রাখলে নিজেকে সুস্থ রাখতে পারবেন এবং উপসর্গগুলো প্রতিরোধ করতে পারবেন। আর নিয়মিত শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করবেন যেন ফুসফুস ভালো থাকবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী রাখার জন্য ব্যায়ামসহ সব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।