• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, ১৯ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

দেশে খাদ্য সংকট নেই

দু’হাজার সাত শতাধিক গুদাম খাদ্যশস্যে পূর্ণ

সংবাদ :
  • রাকিব উদ্দিন

| ঢাকা , শুক্রবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৯

খাদ্য মজুদের রেকর্ড গড়ছে সরকার। দেশের দুই হাজার সাত শতাধিক খাদ্য গুদাম খাদ্যশস্যে পরিপূর্ণ। মজুদ বৃদ্ধির পাশাপাশি খোলা বাজারে ‘ওপেন মার্কেট সেল’ (ওএসমএস) চাল, গম বা আটা বিক্রিও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এতে বাজারও স্থিতিশীল রয়েছে। মানুষ স্বল্প ও ন্যায্য মূল্যে নিত্যপণ্য সামগ্রী কিনতে পারছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল দেশকে খাদ্যে স্বয়সম্পূর্ণ করা; সে লক্ষ্য ইতোমধ্যেই অর্জন হয়েছে।

গত মাসেও দেশে খাদ্য মজুদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯ লাখ মেট্রিক টন। রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যপণ্য মজুদ থাকায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে ঢাকা মহানগর, বিভাগীয় শহর ও জেলা পর্যায়ে ওএমএসএ খাদ্যপণ্য বিতরণ হচ্ছে। সারাদেশের মোট ৬৭৯টি কেন্দ্রে প্রতিদিন ২ মেট্রিক টন করে আটা বিক্রি হচ্ছে। ওএমএসে নিয়মিত চাল ও আটা বিক্রি হওয়ায় খোলা বাজারেও এসব পণ্যে দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাধারণ মানুষ সুলভ মূল্যে খাদ্যশস্য কিনতে পারছে। আগামীতে দেশে খাদ্য সংকটেরও কোন ঝুঁকি নেই।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গত ২৫ সেপ্টেম্বর তথ্য অনুযায়ী, ‘খাদ্যশস্যের সরকারি গুদামজাতকৃত মোট মজুদ ছিল ১৮ লাখ ৮৪ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ১৫ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন এবং গম ছিল তিন লাখ ৭৪ হাজার মেট্রিক টন। এর আগে ২০১৫ সালে দেশে সর্বোচ্চ খাদ্যের মজুদ ছিল ১৬ লাখ নয় হাজার ৩৬৮ মেট্রিক টন।

সর্বশেষ গত নভেম্বর খাদ্যশস্যের সরকারি গুদামজাতকৃত মোট মজুদ ছিল ১৫ লাখ ৯৭ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে চাল ১২ লাখ ৩৯ লাখ মেট্রিক টন এবং গম তিন লাখ ৫৮ লাখ মেট্রিক টন। খাদ্যশস্যের মজুদ সন্তোষজনক, মাসিক চাহিদা ও বিতরণ পরিকল্পনার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এ মুহূর্তে খাদ্যশস্যের কোন ঘাটতি নেই বা ঘাটতির কোন সম্ভাবনা নেই।’

দেশে খাদ্য মজুদের ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সংবাদকে বলেছেন, ‘আমাদের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা। সরকার দেশের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। এ লক্ষ্য অর্জনেই খাদ্য মজুদের পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। আমরা বর্তমানে খাদ্য মজুদের রেকর্ড গড়েছি। এই ধারা অব্যাহত থাকবে।’

অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ

চলতি বোরো সংগ্রহ মৌসুমে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গত ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন লাখ ৯৯ হাজার ৮৬১ মেট্রিক টন ধান, নয় লাখ ৯৯ হাজার ৯৮৬ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল ও এক লাখ ৪৯ হাজার ৯৮৮ মেট্রিক টন আতপ চালসহ সর্বমোট ১৪ লাখ ৯ হাজার ৮৮৪ মেট্রিক টন চাল এবং ৪৪ হাজার ১৫৮ মেট্রিক টন গম সংগ্রহ করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানা গেছে, বর্তমানে দেশে মোট খাদ্য গুদামের সংখ্যা দুই হাজার ৭২২টি এবং গম সংরক্ষণের জন্য সাইলো রয়েছে ৭টি। এ সব খাদ্য গুদামের ধারণ ক্ষমতা ২১ লাখ ১৮ হাজার ৮২২ মেট্রিক টন। প্রায় সব কটি গুদামই খাদ্যশস্যে পরিপূর্ণ।

এ ছাড়াও একটি প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে এক লাখ পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন নতুন ১৫৮টি নতুন খাদ্য গুদাম নির্মাণ করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এসব গুদামের মধ্যে এক হাজার মেট্রিক টনের ৫২টি এবং ৫০০ মেট্রিক টনের ১০৬টি গুদাম। পাশাপাশি সারাদেশে পুরাতন খাদ্য গুদাম ও আনুষঙ্গিক সুবিধাদির মেরামত এবং গুদামের ধারণক্ষমতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।

এদিকে গত ১৫ সেপ্টেম্বর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক সভায় উপস্থাপন করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা মহানগরে ১২০টি কেন্দ্রে, প্রতিকেন্দ্রে ২ মেট্রিক টন করে এবং তেজগাঁও সার্কেল (কেরানীগঞ্জসহ) শ্রমঘন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুর জেলায় প্রতি কেন্দ্রে ২ মেট্রিক টন করে মোট ২৬১টি কেন্দ্রে প্রতিদিন আটা বিক্রয় করা হচ্ছে।

এ ছাড়া অন্য বিভাগীয় ও জেলা শহরের ৩৯১টি কেন্দ্রে প্রতিদিন এক মেট্রিক টন করে আটা বিক্রি করা হচ্ছে এবং ৩টি পার্বত্য জেলায় (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) ২৭টি কেন্দ্রে প্রতিদিন ২ মেট্রিক টন করে সর্বমোট ৬৭৯টি কেন্দ্রে আটা বিক্রি করা হচ্ছে। বাজারে চালের মূল্য ওএমএস মূল্যের সমান/কম হওয়ায় ডিলাররা ওএমএসের চাল উত্তোলন করছেন না।

ঢাকা মহানগরে খাদ্য অধিদফতরের পরিচালকরা ও প্রধান নিয়ন্ত্রক, ঢাকা রেশনিং; বিভাগীয় শহরে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং জেলা পর্যায়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকগণের নজরদারি ও তদারকিতে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ওএমএসসহ পিএফডিএস খাতে গত ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন লাখ তিন হাজার ৪৫৫ মেট্রিক টন চাল ও ৭২ হাজার ৩৭৭ মেট্রিক টন গম বিতরণ করা হয়েছে।

মজুদ বেশি থাকায় কমছে দাম

দেশে খাদ্য শস্যের সংকট না থাকায় গত এক মাসে চালের মূল্য ১ থেকে ২ টাকা কমেছে।

কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাজারে মোটা চালের পাইকারি মূল্য ছিল প্রতি কেজি ২৬ থেকে ২৮ টাকা এবং এ চালের খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ছিল ৩০ থেকে ৩৪ টাকা। আর আটার (খোলা) খুচরা মূল্য প্রতি কেজি ছিল ২৮ থেকে ৩০ টাকা।

কৃষি বিপণন অধিদফতরের সর্বশেষ গত ৩ নভেম্বরের ঢাকার বাজারে মোটা চালের পাইকারী মূল্য ছিল প্রতি কেজি ২৫ থেকে ২৬ টাকা এবং মোটা চালের খুচরা মূল্য ছিল প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৩২ টাকা। আর ওইদিন ঢাকার বাজারে আটার ( খোলা) খুচরা মূল্য ছিল প্রতি কেজি ২৭ থেকে ৩০ টাকা।

সারাদেশের বাজারেই বর্তমানে চালের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। ঢাকা মহানগরে খাদ্য অধিদফতরের পরিচালকরা ও প্রধান নিয়ন্ত্রক, ঢাকা রেশনিং; বিভাগীয় শহরে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং জেলা পর্যায়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকগণের নজরদারি ও তদারকিতে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অতীতে চাল ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে প্রায় খোলাবাজারে চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেতো। বাজারে খাদ্যশস্যের কৃত্তিম সংকটও তৈরি করা হতো। খোলাবাজারে খাদ্যশস্য বিতরণেও ছিল অনিয়মের অভিযোগ। চড়া মূল্যে চাল ও আটা বিক্রি হতো। বর্তমানে চাল ব্যবসায়ীদের কোন সিন্ডিকেট নেই। খাদ্যমন্ত্রী খাদ্যশস্য বিতরণ ও এর মূল্য স্থিতিশীল রাখতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় ভেঙ্গে গেছে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। এ বছর চাল ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট খাদশস্যের সরবরাহের কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি ও মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ পাইনি; কারসাজিও করতে পারেনি। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের কঠোর অবস্থানের কারণে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভেঙ্গে গেছে।

এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘খাদ্যশস্য নিয়ে দেশে আর কোন কারসাজি হবে না; কাউকে এটি করার সুযোগও দেয়া হবে না। খাদ্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে মজুদ বাড়ানো হয়েছে। আমরা সব সময় পর্যাপ্ত মজুদ রাখতে চাই।’

এদিকে ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আসন্ন আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার ৬ লাখ মেট্রিক টন ধান ও ৪ লাখ মেট্রিক টন চাল কিনবে সরকার। চালের মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল কেনা হবে। এর ২৬ টাকা দরে ধান, ৩৬ টাকা দরে সিদ্ধ চাল এবং ৩৫ টাকা দরে আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে। আগামী ১ ডিসেম্বর শুরু হয়ে চাল সংগ্রহ অভিযান চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর ধান সংগ্রহ কার্যক্রম ২০ নভেম্বর শুরু হয়ে চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

ওইদিন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘গতবছর ৩৬ টাকা দরে ৬ লাখ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করে সরকার। পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে আরও ২ লাখ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করা হয়।

সভায় জানানো হয়, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ১০ টাকা কেজি দরে বছরে ৫ মাস (মার্চ, এপ্রিল এবং সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর) চাল দেয়া হয়। ‘মুজিব বর্ষ’ উপলক্ষে ২০২০ সাল থেকে মে এবং ডিসেম্বর এ দুই মাস যোগ করা হবে। এখন থেকে বছরে ৭ মাস খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় এ চাল দেয়া হবে।