• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২০, ১৪ সফর ১৪৪২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৭

দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ৬৫ লাখ বাংলাদেশি

লকডাউন শিথিল হলেই ৩০ লাখ ফিরে আসবে ফেরত এসেছে এক লাখ

সংবাদ :
  • সাইফুল শুভ

| ঢাকা , বুধবার, ২০ মে ২০২০

image

করোনাভাইরাসের প্রভাবে স্থবির হয়ে গেছে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা এর ফলে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ও উদ্বিগ্নতায় রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত ৬৫ লাখ অভিবাসী। শুধু সৌদি আরব থেকেই ১০ লাখ শ্রমিককে ফিরতে হবে। করোনার প্রভাব ও তেলের দাম কমে যাওয়া তারা বিদেশি শ্রমিকদের ফেরত পাঠাবে। পর্যায়ক্রমে আগামী কয়েক বছরে এসব শ্রমিক পাঠানো হবে। ইতোমধ্যেই লক্ষাধিক শ্রমিক দেশে ফেরত এসেছে। ভিসা হওয়ার পরও যেতে পারেনি আরও এক লাখ। লকডাউন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে অন্তত ৩০ লাখ শ্রমিককে দেশে ফিরে আসতে হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

করোনাভাইরাস মহামারীতে অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং তেলের দাম কমে যাওয়ার কারণে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সৌদি আরব থেকে ১০ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসীকে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস। সেখানকার দূতাবাস কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে নিজ দেশের নাগরিকদের মাধ্যমে ৭০ শতাংশ বিদেশি কর্মী প্রতিস্থাপনের নীতিও এর আরেকটি কারণ হতে পারে।

চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে প্রায় এক লাখ ২৯ হাজার বাংলাদেশি কাজের জন্য দেশের বাইরে গেছেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে অন্তত ৯৫ হাজার ৩৮৫ জন বা ৭৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে। দূতাবাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির পরিচ্ছন্নতা কাজে নিয়োজিত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কর্মী বাংলাদেশি এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তাদের বেশির ভাগকেই আর প্রয়োজন হবে না সৌদির। সৌদি আরব এছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার ও বাহরাইনে বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ করছে। এছাড়া লেবাননে অনেক শ্রমিকচ্যুত হয়ে গৃহবন্দী আছেন। আবার অনেকে চাকরি করলেও বেতন পাচ্ছে না। করোনার কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই ঝুঁকিতে বাংলাদেশি শ্রমিকরা। সৌদি দূতাবাস থেকে সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে সম্ভাব্য বিকল্প শ্রম বাজার হিসেবে আফ্রিকান দেশগুলোতে অনুসন্ধান করার পরামর্শ দিয়েছে সরকারকে। কর্মকর্তারা বলছেন, আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশিকে কৃষি, একুয়াকালচার, প্রাণিসম্পদ ও বিভিন্ন কারখানায় নিয়োগ দেয়া সম্ভব।

বিশ্বব্যাংক এক পূর্বাভাসে বলছে- করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্স ২০ শতাংশ হ্রাস পাবে। আর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়াতে এর মাত্রা হবে ২২ শতাংশের বেশি। এপ্রিল মাসে প্রবাসীরা দেশে ১০৪ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের ৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের দেশে ৯৪ কোটি ৭৫ লাখ রেমিট্যান্স আসে। ওই সময়ের পর এই এপ্রিলে দেশে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স এল।

তথ্য মতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটি ২০ লাখ প্রবাসী আছে। এরমধ্যে ২০ লাখের মতো রয়েছে অবৈধ। আর বাকি ৬৫ লাখ শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। অবৈধ অভিবাসীদের আগে দেশে চলে আসতে হবে। এর বাইরে মধ্য প্রাচ্যের বৈধ শ্রমিকদের একটি বিশাল অংশ ফেরত আসবে। ইতোমধ্যে লক্ষাধিক শ্রমিক ফেরত এসেছে, যদিও সরকার বলছে ২০ থেকে ২৫ হাজার ফেরত এসেছে।

অনেক প্রবাসী ইতোমধ্যে কাজ হারিয়েছেন। আরও অনেকেই কাজ হারাবেন। একই সঙ্গে নতুন করে শ্রমিক পাঠানোটাও এখন আগের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের হবে। বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশ থাকে মধ্যপ্রাচ্যে। করোনাভাইরাসের কারণে তেলের দাম কমেছে ব্যাপকহারে। ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দেশে চলে এসেছে। আগে যারা এসেছিলেন তাদের আর ফেরত নেয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ মারাত্মক হুমকিতে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জোর করে শ্রমিক পাঠাবে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও বাহরাইন শ্রমিকদের সেখানে স্থানীয়করণ করছে। বিদেশি শ্রমিক বাদ দিয়ে স্থানীয় শ্রমিক নিয়োগ দেবে তারা।

এ বিষয়ে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট ইউনিটের (রামরু) চেয়াম্যান ড. তাসনিম সিদ্দিকী সংবাদকে বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের (ইরেগুলার মাইগ্র্যান্ট) ইতোমধ্যেই ফেরত পাঠাতে শুরু করেছে। অন্তত এক লাখ দেশে চলে এসেছে। বর্তমান হয়তো ফ্লাইট বন্ধ থাকায় আসতে পারছে না। আবার ফ্লাইট চালু হয়ে গেলে অভিবাসীদের আসা শুরু হবে। এর মধ্যে বৈধ অভিবাসীদেরও চলে আসতে হবে। কারণ অনেক দেশই এখন নিজের দেশের লোকদের কাজে নিবে।

তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ৭শ’ কোটি টাকা দিয়েছে। এরমধ্যে ২শ’ কোটি টাকা ফেরত আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য, আর ৫শ’ কোটি টাকা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করতে ৪ শতাংশ হারে ঋণ হিসেবে দেয়া হবে। তবে ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশ অনেক বেশি। যদি তৈরি পোশাক মালিকরা ২ শতাংশ সুদে ঋণ পায়, তাহলে প্রবাসীরা কেন পাবে না। তারাও তো এতো দিন দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা এনেছে। শুধু ঋণ দিলেই হবে না, প্রবাসীদের দ্রুত ব্যবসায়ীক প্রয়োজনীয় লাইসেন্স দিতে হবে। পাশাপাশি বিজনেস এডভাইজারি সার্ভিস দিতে হবে।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রা’র সভাপতি বেনজির আহমেদ এমপি সংবাদকে বলেন, প্রবাসীরা যেমনি আসতে শুরু করেছে, তেমনি বাংলাদেশ থেকে নতুন করে কেউ যেতে পারছে না। ইতোমধ্যে এক লাখ ভিসা হয়ে আছে। কেউই যেতে পারেনি। তাই আগামী দিনে রেমিট্যান্সে এর বিরাট প্রভাব পড়বে।

অভিবাসী বিশেষজ্ঞ ও প্রবাস মেলা’র উপদেষ্টা মামুন ইমতিয়াজ সংবাদকে বলেন, প্রবাসীদের বিরাট একটি অংশ এই মুহূর্তে বেকার। তারা সেখানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। যে প্রবাসীরা দেশের বৈদেশিক আয়ের প্রায় অর্ধেক আনতো- তারা এখন বিদেশে বসে ত্রাণ নিচ্ছে। ভাবতেও অবাক লাগে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি দেশের জন্য ঝুঁকিরও বটে। এই মুহূর্তে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিয়ে প্রবাসীদের নিরাপদে দেশে নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। করোনা পরিস্থিতি যদি ভালো হয়, সেক্ষেত্রে আবারও যদি বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হয় সে ব্যবস্থাও করতে হবে।

চলতি বছরের রেমিট্যান্স পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের আভাস, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিক কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তেলনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর। যে কারণে ওই দেশ চাকরি থেকে কর্মী ছাঁটাই ও মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে। আমাদের অনেক প্রবাসী এসবের শিকার হচ্ছেন। এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে রেমিট্যান্সের ওপর। তারা রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন সরকারকে এদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। ফেরত আসা প্রবাসীদের বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে।

করোনায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্স ধসের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রবাসীদের মজুরি কমছে, চাকরিচ্যুত হচ্ছেন অনেকে। সেখানে আরও বলা হয়, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ৫৫ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাওয়া গেছে। কিন্তু ২০২০ সালে করনোর কারণে তা কমে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে আসবে।

অর্থাৎ করোনার মহামারীর কারণে রেমিট্যান্স হারাবে ১০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে রেমিট্যান্স কমবে ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ। আর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় কমবে ২২ দশমিক ১ শতাংশ। যেখানে ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া ইউরোপ ও মধ্য এশীয়ায় হ্রাস পাবে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ, আফ্রিকায় ২৩ দশমিক ১ শতাংশ, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ, লাতিন আমেরিকায় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিকে কমবে ১৩ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, রেমিট্যান্স নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনগ্রসর পরিবারগুলোতে উন্নত ব্যয়ের সক্ষমতা তৈরি করেছে। পাশাপাশি প্রবাসীদের পরিবারে সন্তানদের শিক্ষার পেছনে ব্যয়ে সক্ষমতা বেড়েছে এবং পরিবারের শিশুশ্রম নিরসনে ভূমিকা রাখছে। এখন নতুন করে এসব বিষয় ফিরে আসা নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, পৃথিবীর ১৬৯টি দেশে বাংলাদেশের এক কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ কাজ করেন। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশের কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্যে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা একদিকে বেতন পাচ্ছেন না, অন্যদিকে অনেকে ছাঁটাই এবং মজুরি হ্রাসের কবলে পড়েছেন। ফলে প্রবাসীদের অনেকেই এখন বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারছেন না। চাকরি নিয়েও আছে দুশ্চিন্তা।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে থাকা প্রবাসীদের পরিবারগুলোতে আর্থিক সংকট দেখা দিচ্ছে। কথা বলে বোঝা যাচ্ছে, অনেকেই সংকটে পড়ে গেছেন। বিদেশ যাওয়া বন্ধ, আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে এসে কর্মস্থলে ফেরা নিয়েও অনিশ্চয়তায় প্রায় দুই লাখ প্রবাসী।