• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

নিয়ন্ত্রণহীন পিয়াজ বাজার

দাম কমেনি খুচরা বাজারে

ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়েছে : বাণিজ্যমন্ত্রী, দাম বেঁধে দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৩ অক্টোবর ২০১৯

ভারত পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার একদিন পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। রাতারাতি প্রতি কেজি পিয়াজের দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। লাগামছাড়া পিয়াজের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার অন্য সব দেশ থেকে পিয়াজ আমদানিতে জোর দেয়। এর ফলে মায়ানমার, মিসর ও তুরস্ক থেকে আমদানিকৃত পিয়াজ দেশে আসছে। এ খবরে পাইকারি বাজারে পিয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। তবে খুচরা বাজারে তার প্রভাব এখনও পড়েনি।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গতকাল পাইকারি বাজারে কেজিতে ১০ টাকা কমিয়ে পাইকাররা দেশি পিয়াজ ৮৫ থেকে ৯০ টাকা এবং আমদানি করা পিয়াজ ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি করছেন। যা গত কয়েকদিন ধরে পাইকারি বাজারে ছিল দেশি পিয়াজ ১০০ টাকা আর আমদানি করা ভারতীয় পিয়াজ ৯০ টাকা কেজি ছিল। তবে খুচরা বাজারে দেশি পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। বাজারভেদে কোন কোন দোকানে আগের দামে অর্থাৎ ১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে এবং ভারতীয় পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকায়।

এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দিলেও তার প্রভাব পড়তে যে সময় লাগার কথা, তার আগেই দাম বেড়েছে। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। লাগামহীন হয়ে ওঠায় খুচরা বাজারে পিয়াজের দাম বেঁধে দেয়ার চিন্তা করছে সরকার। আমদানি কিংবা উৎপাদন মূল্যের সঙ্গে এই নিত্যপণ্যের বাজার দরের মিল না থাকায় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বুধবার সাংবাদিকদের একথা জানিয়েছেন।

এদিকে ভারত পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার পর বাংলাদেশে পিয়াজের দর বাড়তে থাকায় অন্য দেশ থেকে পিয়াজ আমদানি করা হলেও প্রতি কেজি পিয়াজ ১০০ টাকার নিচে নামছে না। এই পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় আড়তে অভিযান চালানোর পর পাইকারি বাজারে পিয়াজের দাম কমলেও খুচরায় তার প্রভাব এখনও কমেনি।

এদিকে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পিয়াজ আমদানিতে অর্থায়নের সুদ হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমদানি শুরু হওয়ায় আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পিয়াজের দাম সর্বোচ্চ ৬০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। ইতোমধ্যেই টেকনাফ বন্দরে (মায়ানমার থেকে) ৪৮৩ টন পিয়াজ ঢুকেছে। আরও চার থেকে ৫০০ টন ঢুকবে। পিয়াজ আমদানি শুরু হয়েছে এবং বেশি লাভ করলেও ৬০ টাকার বেশি দাম হওয়া উচিত নয়।

এই অবস্থায় পিয়াজের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হবে কি না- প্রশ্ন করা হলে টিপু মুনশি বলেন, এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। আমরা একটা ক্রয়মূল্য পেয়েছি, তার সঙ্গে লাভ ধরে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। দেশি ও আমদানি করা পিয়াজের মূল্য আলাদা হবে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই রকম নির্ধারণ করা তো যাবে না, এক রকমই করতে হবে। হিসাব করে আলোচনা করা হবে, কী পরিমাণ দাম নির্ধারণ করে দিলে ভালো হবে। সেটাই করা হবে।

টিপু মুনশি বলেন, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। বেশ কিছু বাজারে জরিমানা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামে লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আমরা নিজেরাও ৪৫ টাকা করে টিসিবির মাধ্যমে বিক্রি করছি। এর প্রভাব বাজারে পড়বে। দাম বৃদ্ধির কারসাজিতে যারা যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণাও দেন তিনি। কার কাছে কী পরিমাণ স্টোরেজ আছে তা দেখছি। পিয়াজ বেশি দিন রাখতে পারবে, তাও না। মায়ানমার থেকে আনলে আমদানি খরচ কম পড়ার বিষয়টি তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। ভারতে এখন দাম ৯০ রুপির মতো, ভাগ্য ভালো যে মায়ানমার থেকে কম দামে পাচ্ছি।

পিয়াজের দাম বৃদ্ধিতে সরকারের ব্যর্থতা রয়েছে কি না- প্রশ্নে টিপু মুনশি বলেন, ভারত থেকে রপ্তানি বন্ধ হবে, চিন্তাও করিনি, এটার ওপর তো কারও হাত নেই। আমাদের স্বাবলম্বী হলে ৭ থেকে ৮ লাখ টন বেশি উৎপাদন করতে হবে। ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সব ভোক্তারা যদি ৭ দিন পিয়াজ না কিনি তাহলে তাদের পিয়াজ কিন্তু পচে যাবে। এ সুযোগটা তারা নিচ্ছে কারণ আমরা পিয়াজের জন্য হাহাকার করছি। সচেতনও তো হতে হবে, সুযোগটা তারা নিচ্ছে। স্থায়ী সমাধান হচ্ছে পিয়াজের উৎপাদন বাড়ানো।

এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন সংবাদকে বলেন, পিয়াজের দাম বেধে দেয়ার বিষয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। এটা এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী মহোদয় এই ভাবনার কথা জানিয়েছেন।

এদিকে দেশে যে পরিমাণ পিয়াজ মজুত রয়েছে তা দিয়ে আরও ১৫-২০ দিন চলবে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবদুস সামাদ আল আজাদ। দেশে এখনও পর্যাপ্ত পিয়াজ মজুত রয়েছে। কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির কোনও সুযোগ নেই। সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর পরিদর্শন শেষে গতকাল তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। আর এরইমধ্যে সরকার বিকল্প পন্থায় পিয়াজ আমদানির সব ব্যবস্থা করছে।

এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং টিমের সদস্যরা বন্দরের বিভিন্ন পিয়াজের আড়ৎ পরিদর্শন করেন এবং আড়ৎদারদের অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি না করে স্বল্প লাভে তা বাজারজাত করার নির্দেশনা দেন। পরে মনিটরিং টিমের সদস্যরা সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড় বাজারের পিয়াজের আড়ৎ পরিদর্শন ও আড়ৎদারদের সঙ্গে কথা বলেন।

কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লায় বেড়েছে পিয়াজের দাম। পিয়াজের মূল্যের উর্ধ্বগতি ঠেকাতে মাঠে নেমেছে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন। নগরীর রাজগঞ্জ ও চকবাজারে অভিযান পরিচালনা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় ৩টি দোকান থেকে আর্থিক জরিমানা আদায় করা হয়।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারি কমিশনার ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মারুফ হাসান জানান, ‘অতিরিক্ত দামে পিয়াজ বিক্রি করায় নগরীর রাজগঞ্জ বাজারে ৩ দোকানদারের কাছ থেকে ভোক্তা অধিকার আইনে সাড়ে ৮ হাজার টাকা আর্থিক জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া অপর দোকানদের সতর্ক করা হয়েছে। পিয়াজের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুর পৌর শহরে সিন্ডিকেট করে বেশি দামে পিয়াজ বিক্রির অভিযোগে দুই আড়ৎসহ চার প্রতিষ্ঠানকে ৪৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুর রিদোয়ান আরমান শাকিল ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এ আদেশ দেন। তিনি শহরের মাছ বাজার, ভক্তের গলি ও ধান হাটাসহ শহরের বিভিন্ন মুদি দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এ সময় লক্ষ্মীপুর বণিক সমিতির সহ সভাপতি আবদুল আজিজ এবং ফল সমিতির সভাপতি এমরান হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন পিয়াজের বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছেন।

শহরের ছোট বাজারের পিয়াজের আড়ৎ ও খুচরা বাজার এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম প্রিন্স ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

অভিযান পরিচালনার সময় পিয়াজ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ওই সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বেগমগঞ্জ(নোয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালীতে প্রতি কেজি পিয়াজ ১০০ টাকায় বিক্রি করার অপরাধে দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। নোয়াখালীর বৃহত্তর বাণিজ্য কেন্দ্র বেগমগঞ্জের চৌমুহনী ও মাইজদী পৌর বাজারের ওই দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রোকনুজ্জামান খান জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গত সোমবার রাতে চৌমুহনী ও মাইজদীতে অভিযান পরিচালনা করা হয়।