• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, ২১ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

ক্যাসিনোকাণ্ড ও অর্থ পাচার

তথ্যের খোঁজে সিঙ্গাপুর যাচ্ছে দুদক

আরও ৫ দেশে অনুসন্ধান চালাবে টিম

সংবাদ :
  • সাইফ বাবলু

| ঢাকা , শনিবার, ০৯ নভেম্বর ২০১৯

চিঠি চালাচালির পর ক্যাসিনো খেলা এবং অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে অনুসন্ধানে সরাসরি সিঙ্গাপুর যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের টিম। দুদকের পরিচালক (মানিলন্ডারিং) গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী এ টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুরসহ অন্য দেশে অর্থ পাচারকারী বাংলাদেশিদের শনাক্ত করতে ৫ সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর ছাড়াও টিমের সদস্যরা দুবাই, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ ৫টি দেশে যাবেন অনুসন্ধানে। এরমধ্যে ওই ৫ দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ পাচারকারীদের তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি ক্যাসিনো খেলায় অংশ নেয়াসহ বিভিন্নভাবে অর্থ বিনিয়োগকারীদেরও তালিকা চাওয়া হবে। এক্ষেত্রে আন্তজার্তিক তদন্ত সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিশ( এফবিআই)সহ সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতা নিবে দুদক। এফবিআইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তদন্ত, এবং তদন্ত কাজে দুদক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে সমঝোতা স্বাক্ষরের প্রস্তাব দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক।

গত ৫ নভেম্বর দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, মানিলন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, অপরাধীদের গতিবিধি, দুর্নীতির ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিরোধ করার জন্য প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চায় কমিশন। এক্ষেত্রে যুক্তরাস্টের জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট ও সেস্ট ডিপার্টমেন্টের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই-এর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জন্য অভিপ্রায় ব্যক্ত করে পত্র দিয়েছে। আমরা আশা করি এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হবে।

গত ১৮ সেপেম্বর অবৈধ ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে আওয়ামী লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ নেতা, ঠিকাদার, কাউন্সিলরসহ ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী বেশকিছু নেতা গ্রেফতার হন। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক অবৈধ ক্যাসিনোসহ দুর্নীতি, অনীয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ সম্পদ অর্জন করা, বিদেশ গিয়ে ক্যাসিনো খেলার নামে অর্থপাচার, এবং সম্পদ গড়ার অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি দলের ৩ সংসদ সদস্য, প্রভাবশালী নেতা, কাউন্সিলর, প্রকৌশলীসহ শতাধিক ব্যক্তির তালিকা আসে দুদকের কাছে। এর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে সংসদ সদস্য গণপূর্তের ১১ প্রকৌশলীসহ ৩৩ জনের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখায় চিঠি পাঠায়। অনুসন্ধানের মধ্যে এ পর্যায়ে বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা করেছে দুদক। ওইসব মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দেশে অবৈধ সম্পদ অর্জন ছাড়াও বিদেশে কয়েক শ’ কোটি টাকা পাচার এবং অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে প্রতিদিনই নতুন নতুন নাম যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতা, সরকারি উন্নয়ন কাজ তদারকিকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তির নাম বেশি যুক্ত হচ্ছে।

দুদক সূত্র জানায়, ক্যাসিনো কাণ্ডসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী সরকারি দলের সাবেক ও বর্তমান এমপি, রাজনৈতিক নেতা এবং সরকারি আমলাদের মধ্যে গত ৫ বছরে কে কতবার ক্যাসিনো ক্লাবে গিয়েছে তা বের করতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়ে গত ৫ বছরে কি পরিমাণ অর্থ ক্যাসিনো বোর্ডে খরচ হয়েছে তা হিসাব বের করা হবে দুদকের এ সফরে। যেকোন দিন দুদক টিম সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবে। এর আগে দুদক থেকে সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো খেলতে যাওয়া বাংলাদেশিদের তালিকা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে সিঙ্গাপুরের করাপ্ট প্র্যাকটিসেস ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো(সিপিআইবির) কাছে। সূত্র জানায়, এ কার্যক্রমের পাশাপাশি আরও ৫ দেশে বাংলাদেশিদের মধ্যে কাদের কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, কী পরিমাণ অর্থ সংশ্লিষ্ট দেশে বিনিয়োগ করা হয়েছে এসব বিষয়ে তালিকা চেয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। গত ৫ বছরে ওইসব দেশে অর্থ পাচারকারীদের তালিকাও চাওয়া হবে চিঠিতে। দুদকের নির্ভারযোগ্য সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে কমিশন থেকে ৫ সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান দুদকের পরিচালক(মানিলন্ডারিং) গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী। তার নেতৃত্বে শীঘ্রই টিম সিঙ্গাপুর যাবেন। পাশাপাশি অন্য দেশেও অনুসন্ধান চালাবেন। সিঙ্গাপুরের করাপ্ট প্র্যাকটিসেস ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর( সিপিআইবির) সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন ক্যাসিনো অনুসন্ধানে যাবেন। তারা সেখান থেকে ক্যাসিনো খেলায় যারা যেতেন তাদের তালিকা সংগ্রহ করবেন। এছাড়া মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, দুবাই, যুক্তরাষ্ট্রসহ ৫টি দেশে সিঙ্গাপুরের মতো বাংলাদেশিদের মধ্যে কারা সেখানে বিভিন্ন সময়ে ক্যাসিনো খেলা, খেলায় বিনিয়োগ করা এবং বিভিন্নভাবে অর্থ পাচার করেছে তার তালিকা চেয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। টিম ওইসব দেশেও তদন্তে যাবে অর্থপাচারকারীদের শনাক্ত করতে।

সূত্র জানায়, প্রতিনিধি দল সিঙ্গাপুরের করাপ্ট প্র্যাকটিসেস ইনভেস্টিশেন ব্যুরোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে গিয়ে প্রথমে বৈঠক করবেন। সেখানে তারা দুদকের কাছে থাকা বিভিন্ন ব্যক্তিদের তালিকা নিয়ে পর্যালোচনা করবেন। এসব ব্যক্তিদের মধ্যে কারা কবে সিঙ্গাপুরে এসেছেন, কতবার এসেছেন, কোন কোন ক্যাসিনোতে তারা গিয়েছেন, কতবার গিয়েছেন এসব নিয়ে পর্যালোচনা করবেন। পাশাপাশি এসব ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ সিঙ্গাপুরে অর্থপাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কি না সে বিষয়ে তথ্য পেতে সহযোগিতা চাইবেন। ক্যাসিনো ছাড়া সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশিদের নামে বা তাদের কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না সে বিষয়ে খোঁজ নিবেন প্রতিনিধি দল। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট(বিএফআইইউর) এর সহযোগিতা নেয়া হবে।

দুদক সূত্র জানায়, সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতা, সরকারের অনেক সংসদ সদস্য, প্রভাবশালী আমলাসহ অনেকের বিরুদ্ধে অর্থ খরচের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় ক্যাসিনো ক্লাব ম্যারিনা-বে তে গিয়ে ক্যাসিনো খেলত। প্রতিদিনই এসব খেলায় যেসব বাংলাদেশিরা অংশ নিয়েছে তারা কোটি কোটি টাকা নিয়ে অংশ নিয়েছে। কখন কেউ হেরেছে কেউ জিতেছে। মূলত বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে পাচার হওয়া অর্থের একটি বড় অংশ ক্যাসিনো খেলায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। সরকারি দলের কয়েকজন এমপি, আওয়ামী লীগ তার তার অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষ অনেক নেতাই নিয়মিত সিঙ্গাপুরে গিয়ে ক্যাসিনো খেলায় অংশ নিয়েছেন বলে তথ্য রয়েছে। গত ৫ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা ক্যাসিনোতে বিনিয়োগ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, সিঙ্গাপুরে যতগুলো ক্যাসিনো রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বিলাস সহুল এবং জমজমাট ক্যাসিনো ক্লাব হচ্ছে ম্যারিনা বে । এ ক্যাসিনো ক্লাবে বাংলাদেশি টাকার ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা দিয়ে এন্ট্রি করে খেলায় অংশ নিতে হয়। এ ক্লাবে ক্ষমতাসীন দলের যুবলীগ ঢাকা মহানগরের সাবেক সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট নিয়মিত ক্যাসিনো খেলতেন। তিনি যখন সিঙ্গাপুরে যেতেন তখন রীতিমতো বহর নিয়ে যেতেন। তার সঙ্গে অনেক প্রভাবশালী নেতা এমনকি সংসদ সদস্যরাও থাকতেন।

গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী ক্ষমতাসীন দলের অধিকাংশ নেতাই সিঙ্গাপুরে গিয়ে ক্যাসিনো খেলায় অংশ নিতেন। শুধু ক্যাসিনো খেলার জন্যই অনেক রাজনৈতিক নেতা সিঙ্গপুরে যেতেন। একঘণ্টার ক্যাসিনো খেলায় অংশ নিয়ে যুবলীগের সাবেক সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ৫০ কোটি টাকা হেরেছেন। শুধু সম্রাটই নয়, ক্যাসিনো খেলার জন্য বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার করে নিয়ে গেছেন সংসদ সদস্য, সরকারিী আমলা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরাও। গত ১০ বছরে যে পরিমাণ অর্থ সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো খেলার জন্য পাচার হয়েছে তা দিয়ে বাংলাদেশে ১০টি পদ্ম সেতু নির্মাণ করা যেতো। দুদক সূত্র জানায়, ক্যাসিনোতে গত ৫ বছরে কয়েকশ’ রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের লোক অংশ নিয়েছেন। এ তালিকায় সরকারি আমলাদের মধ্যে কেউ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে। শুধু ম্যারিনা বে-ই নয় সিঙ্গাপুরে আরও একাধিক ক্যাসিনো ক্লাব রয়েছে। এসব ক্লাবে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশ রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, আমলাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি। ইতোমধ্যে দুদক এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। ক্যাসিনো খেলার নামে সিঙ্গাপুরে কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। পাচার করা অর্থের একটি বড় অংশ ক্যাসিনো খেলায় বিনিয়োগ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, ক্যাসিনোকাণ্ডে যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণ থেকে বহিষ্কৃত সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করার পরই মূলত ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। এরপর গ্রেফতার হন, যুবলীগের পরিচয়ে ঠিকাদারী করা জিকে শামীম, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ, বিসিবি পরিচালক লোকমান ভূঁইয়া, যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, অনলাইন ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রক সেলিম প্রধান, কাউন্সিলর রাজীব, পাগলা মিজানসহ অনেকেই। আত্মগোপনে চলে যান ঢাকা নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর যুবলীগ নেতা মমিনুল হক সাঈদ, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির দফতর সম্পাদক কাজী আনিছুর রহমান, ফরাসগঞ্জ ক্লাবের সভাপতি ও চাঁদপুরের সদর থানার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সেলিম খান, গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী সলীগের সহসভাপতি এনামুল হক অণু তার ভাই রূপণ ভূইয়াসহ অনেক আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতারাও। এ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযোগে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে ক্যাসিনো খেলা পরিচালনা করা, অর্থের ভাগাভাগি, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারসহ ক্যাসিনো খেলার নামে অর্থ বিনিয়োগের নেপথ্যে একাধিক ব্যক্তির নাম বেরিয়ে আসে। অপরাধের বিষয়গুলো নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করলেও দুর্নীতি এবং অর্থ পাচার সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন কাজ করছে। সমন্বিতভাবে তদন্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে এবং কী পরিমাণ অর্থ ক্যাসিনোতে বিনিয়োগ করা হয়েছে এসব বেরিয়ে আসবে কেসিনো খেলায় অংশগ্রহণকারীদের নাম পাওয়ার পর পরই।