• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১১ বৈশাখ ১৪২৫, ১৭ শাবান ১৪৪০

আইনি জটিলতায়

জমি ও ভবন নিয়ে রাজউকের তিন হাজার মামলা ঝুলে আছে

নোটিশ দিলেই মালিকদের চ্যালেঞ্জ

সংবাদ :
  • মোস্তাফিজুর রহমান

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৯

অবৈধভাবে দখল হওয়া গুলশান এভিনিউর ১৫৯ নম্বর বাড়ি দখলে নিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তিন দশকের অধিক সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময় বাড়িটির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আইনি লড়াই চালায় সংস্থাটি। শুধু গুলশান এভিনিউর এই বাড়িই নয়, এমন অনেক জমি বা ভবন নিয়ে ঝুলে থাকা আইনি জটিলতায় ব্যবস্থা নিতে পারছে না রাজউক। এমনকি বিভিন্ন সময় মালিকদের মামলার মুখে অভিযানও থেমে যাচ্ছে। গত কয়েক বছর আগে আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদে রাজউকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগটি সে সময় মামলার কারণে এগুতে পারেনি।

রাজউক জানায়, বর্তমানে রাজউকের বিরুদ্ধে ৩ হাজারের বেশি মামলা চলমান রয়েছে। এরমধ্যে ভবন সংক্রান্ত মামলাই বেশি। কিছু সংখ্যক মামলা রয়েছে জমি সংক্রান্ত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজউক ভবন বা জমি নিয়ে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম বা অভিযোগের ভিত্তিতে নোটিশ প্রদান করে থাকে। কিন্তু নোটিশ প্রদান করা হলেই সেই নোটিশ চ্যালেঞ্জ করে সংস্থাটির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন মালিকরা। বিশেষ করে যখন অধিক হারে নোটিশ ইস্যু হয় তখনই রাজউকের বিরুদ্ধে মামলা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ত্রুটির কথা উল্লেখ না করে ভবনের বিরুদ্ধে নোটিশ দেয়ায় ভবন মালিকদের মামলা করতে সুবিধা হচ্ছে। এরপর সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রম শেষ হয়ে মামলাগুলো নিষ্পত্তি হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এছাড়াও মামলা কার্যক্রম পরিচালনা করতে আইনজীবী সংকট রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান।

মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণ হিসেবে রাজউকের আইনজীবীরা জানান, আদালতে হাজার হাজার মামলার মধ্যে রাজউকের মামলা গুরুত্ব পায় না। সেখানে জনগুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো বেশি গুরুত্ব পায়। যে কারণে রাজউকের মামলাগুলো কার্যতালিকায় আসতে এবং শুনানি হতে বেশ সময় লেগে যায়। তবে আইনজ্ঞদের মতে, কেবল আইনজীবীরা উদ্যোগী হলেই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, মামলার নিষ্পত্তির পাশাপাশি নতুন ভবন নির্মাণের শুরুতেই তদারকির বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। যাতে নতুন করে মামলার জটিলতা তৈরি না হয়।

এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সংবাদকে বলেন, রাজউকের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইনজীবী যারা আছেন তাদের উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। মামলা একবার হয়ে গেলেই তা বিলম্ব হতে থাকে। তাই আদালতে মেনশন করতে হয় যে, মামলাটা গুরুত্বপূর্ণ। আইনজীবীদের বলতে হয়, মামলাটি একটু শুনানির জন্য লিস্টে দিয়ে দেন। তাহলে আদালত বিষয়টি বিবেচনা করেন। এখন আইনজীবীরা যদি তৎপর না হন তাহলে আদালত তো স্ব-উদ্যোগ নেবে কেন? এছাড়া দ্রুত সমস্যা সমাধানে দুই পক্ষের (মালিক ও রাজউক) মীমাংসাতে যেতে পারে বলেও এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জানান। তবে রাজউকের মামলাগুলোর জন্য পৃথক কোন ট্রাইব্যুনালের প্রয়োজন নেই বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে একই রকম কথা বলেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী মনজিল মোরসেদও। তিনি সংবাদকে বলেন, রাজউকের মামলার আলাদা কোর্টই আছে। শুনানির জন্য চিফ জাস্টিস (প্রধান বিচারপতি) আলাদা কোর্টই করে দিয়েছেন। রাজউকের অনেক প্যানেল আইনজীবীও রয়েছে। অনেক মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে। কোর্টে গেলে সঙ্গে সঙ্গে খারিজ হয়ে গেছে এমনও আছে। অর্থাৎ, আইনজীবীদের ইচ্ছার ওপর ডিপেন্ট (নির্ভর) করে। রাজউকের আইনজীবীরা যদি তৎপর হন তাহলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব। এছাড়া যদি প্রয়োজন হয় তাহলে আরও আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারে রাজউক।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সম্প্রতি সচিবালয়ে (৩ এপ্রিল) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে ঝুলে থাকা মালিকদের মামলাগুলোর বিষয়ে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। মামলার কারণে উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না, সেসব ক্ষেত্রে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই সহায়তা করা হবে। আইনমন্ত্রী আরও বলেন, আমার সঙ্গে গণপূর্তমন্ত্রী মহোদয়ের কথা হয়েছে। তাকে আমি বলেছি, যখনই আমার প্রসিকিউশন টিম, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সাহায্য লাগবে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য আমরা সব সহায়তা তাদের দেব।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন। দায়িত্ব নেয়ার পরপরই রাজউকের ঝুলে থাকা মামলাগুলো কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার কথা গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শম রেজাউল করিম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। অবৈধভাবে ভবন নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। ‘গণনোটিশ’ মামলা হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি গণপূর্তমন্ত্রী রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেন, কোন একটি ভবনের নির্দিষ্ট ত্রুটির কথা উল্লেখ না করে পুরো ভবনের বিরুদ্ধে একটি গণনোটিশ দেয়া হতো। ফলে ভবন মালিক আদালতে গিয়ে নোটিশ স্থগিতের ব্যবস্থা করে নেন। তাই সুনির্দিষ্ট ইস্যু উল্লেখ না করে নোটিশ দেয়া যাবে না। যদি এরপরও রাজউকের কোন কর্মকর্তা এমন কাজ করেন, তাহলে ধরে নেব তিনি ভবন মালিককে পার পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এর দায়ভার ওই কর্মকর্তাকে নিতে হবে। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেননা বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। যেখানে যা যা করা দরকার তা করা হবে।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর নিয়মবহির্ভূত ভবনগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে রাজউকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো। এছাড়া যেসব ভবন বা জমি নিয়ে অনিয়ম বা অভিযোগ এসেছে সেগুলো নিয়েও তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। একটি পরিকল্পিত নগরী গড়তে সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে আইনগত জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছে তারা। এজন্য যাতে মামলা এড়ানো যায় সুনির্দিষ্ট ইস্যু উল্লেখ করে নোটিশ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি যেসব মামলা ঝুলে রয়েছে সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের আইন বিভাগের পরিচালক আনন্দ কুমার বিশ্বাস সংবাদকে বলেন, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে তাদের আইনজীবীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। রাজউকের আইন কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল করীম সংবাদকে বলেন, রাজউকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নোটিশ প্রদান করা হয়। নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে মালিকরা মামলা দায়ের করেন। এরপর তারা মামলার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

বেশ দীর্ঘ সময় ধরে রাজউকের আইনজীবী হিসেবে কাজ করছেন আমিনুল ইসলাম। জানতে চাইলে রাজউকের এই আইনজীবী সংবাদকে বলেন, হাইকোর্টের একেকটা বেঞ্চে সবসময় দেড়-দুই হাজার মামলা থাকে। এসব মামলার মধ্যে রাজউকের মামলা অতটা গুরুত্ব পায় না। এই আইনজীবীর মতে, মামলা শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসতেই সময় লেগে যায়। এরপর শুনানি, আপিলসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করতে দীর্ঘদিন পড়ে থাকে। এই সময় আদালতের স্থগিতাদেশে রাজউকের কোন ধরনের প্রদক্ষেণ গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।

মামলার ঝামেলা এড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান সংবাদকে বলেন, মামলা জটিলতা রোধে ভবন নির্মাণের শুরুতেই রাজউকের মনিটরিং থাকা উচিত। কিন্তু সেটি রাজউক ঠিকঠাক করছে না। যে কারণে ভবন নির্মাণ হয়ে গেলে আইনি সমস্যা তৈরি হয়। রাজউক নোটিশ দিলেই মালিকরা মামলা করে বসে। তাই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন ভবন নির্মাণের শুরুতেই তদারকির বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।