• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬, ৩০ রজব সানি ১৪৪১

বিতর্কমুক্ত ও গতিশীল করার লক্ষ্যে

ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব আসছে

সংবাদ :
  • আবদুল্লাহ আল জোবায়ের

| ঢাকা , শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

image

  • শোভন ও রাব্বানীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে
  • চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী

সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী নানা অনিয়ম ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। তাদের সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার আভাস দিয়েছেন দলের একাধিক নেতা। বর্তমান কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি দেয়ার ঘোষণাও আসতে পারে। ছাত্রলীগকে বিতর্কমুক্ত ও গতিশীল করতেই এমন চিন্তা করা হচ্ছে বলে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যেই তিনি ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্বের খোঁজ করছেন। এ নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন বলে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার বিষয়ে আজ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। আজ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় ছাত্রলীগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথা বলবেন বলে দলের সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় জানতে চাইলে ছাত্রলীগের বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তবে তিনি সংবাদকে বলেন, এটা আসলে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত বিষয়। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন তাই হবে।

ইতিমধ্যেই নানা অনিয়ম ও বির্তকের কারণে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতৃত্বের ওপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের ফলশ্রুতিতেই শোভন-রাব্বানীর গণভবনে প্রবেশের পাস বাতিল করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশের পর থেকেই বারবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা চলিয়ে যাচ্ছেন শোভন-রাব্বানী। গত মঙ্গলবারও গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাননি তারা। সাক্ষাৎ না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ব্যাখ্যা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। গত বুধবার পাঠানো ওই চিঠিতে নিজেরা আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। একই সঙ্গে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমাও চান বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, শীর্ষ দুই নেতার ওপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশের পর থেকে তারা অনেকটা একা হয়ে গেছেন। ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেয়ার খবর শুনে শোভন-রাব্বানীর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতাদের বড় একটি অংশ। সংগঠনের সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্পাদক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাও শোভন-রাব্বানীকে পাশকাটিয়ে চলছেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও আগের মতো সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পক্ষে সে ধরনের প্রচারণা নেই। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের নেতারাও তাদের সরাসরি সমর্থন দিচ্ছেন না। ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অতীতে কোন দিন এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। এর আগে নানা সময়ে বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়ে পার পেলেও এবার আর শেষ রক্ষা হচ্ছে না বলে মনে করছেন অনেক নেতা।

সিন্ডিকেটের বলয় থেকে ছাত্রলীগকে রক্ষা করতে যাচাই-বাছাই করে কমিটি গঠন করা হয়। এ লক্ষে ২৯তম জাতীয় সম্মেলনের আড়াই মাস পর গত বছরের ৩১ জুলাই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গোলাম রাব্বানীকে মনোনীত করেন তিনি। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই শোভন-রাব্বানীর কর্মকান্ডে নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেলে তিনি অনেকবার তাদের শোধরানোর সুযোগ দেন। সে সুযোগ গ্রহণ না করে তারা নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ড এবং অযোগ্যতার কারণে প্রধানমন্ত্রী গত শনিবার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেয়ার নির্দেশ দেন। এর একদিন পরেই ছাত্রলীগের কমিটির জন্য নতুন নেতৃত্ব খোঁজা শুরু করেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বলে জানা যায়।

ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, এবার ছাত্রলীগ হবে ‘নতুন মডেল’ এর। কমিটি গঠনের পর সংশ্লিষ্টরা আশা করেছিলেন, শোভন-রাব্বানী ছাত্রলীগকে শেখ হাসিনার প্রত্যাশা অনুযায়ী ‘নতুন ধারায়’ ফিরিয়ে আনবেন। অথচ সে আশায় গুড়েবালি। একের পর এক বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়েছেন তারা। সংগঠনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। দলে নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দলের পাশাপাশি ছাত্রলীগের নানা কর্মসূচি নিয়ে সংগঠনের মধ্যেই দেখা দিয়েছে বিভেদ। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী হলেও সম্প্রতি ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগাতে নানা কর্মসূচির দিকে ঝোঁকার প্রবণতাকে ঘিরে সংগঠনে বিরোধ স্পষ্ট হয়েছে। আর ক্ষুব্ধরা কেউ ‘সর্বদলীয় ছাত্রলীগ’, কেউ ‘শিবির লীগ’, কেউ বা ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রলীগ’ বলে নিজের সংগঠনকে কটাক্ষ করছেন।

দ্বিধাবিভক্ত ছাত্রলীগ, ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী

কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, দায়িত্বে অবহেলা, স্বেচ্ছাচারিতা ও তৃণমূল-কেন্দ্রে সমন্বয়হীনতার অভাবসহ অন্তত অর্ধশতাধিক কারণে কার্যত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে ছাত্রলীগের কার্যক্রম। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পরে অন্তত ১৫ দফায় আশ্বাস প্রদানের পর কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়। তবে কমিটি পূর্ণাঙ্গ হলেও এখন পর্যন্ত দায়িত্ব বুঝে পাননি কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা। ফলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বেড়েছে দূরত্ব। আর তৃণমূলের অসহযোগিতার কারণে ১১১টি সাংগঠনিক জেলা ইউনিটের মধ্যে কমিটি হয়েছে মাত্র ২টির। এজন্য ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ‘ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে’ দুষছেন সংগঠনটির তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় নেতারা। এছাড়া মাত্র চারটি ইউনিটে সম্মেলন হলেও সেখানে শোভন-রাব্বানী কমিটি দিতে পারেননি। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, লম্বা সময় ধরে ক্ষমতায় থাকাকালে বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের অনেক কর্মকান্ড সরকার এবং দলকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে যাচাই করার পর ছাত্রলীগের বর্তমান শীর্ষ দুজন নেতাকে মনোনীত করেছিলেন। সেজন্য সেই দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসায় তিনি বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য

কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিতর্কিতদের স্থান দেয়া হয়েছে অভিযোগ করে কমিটি ঘোষণার দিন সন্ধ্যায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা। এ সময় শোভন-রাব্বানীর অনুসারীরা পদবঞ্চিতদের ওপর হামলা করে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনে নামেন পদবঞ্চিতরা। পরে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আশ্বাসে তারা আন্দোলন থেকে সরে আসেন। গত ১৫ মে গণভবনে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ডেকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া বিতর্কিত নেতাদের বাদ দিয়ে ত্যাগী ও যোগ্যদের পদ দেয়ার নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। পরদিন দুপুরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটির ৩০১ সদস্যের মধ্যে ৯৯ জনকে ‘বিতর্কিত’ উল্লেখ করে তাদের নামের তালিকা প্রকাশ করে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা। সে রাতেই সংবাদ সম্মেলন করে ১৭ জনের নামে অভিযোগ পাওয়া গেছে উল্লেখ করে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেছিলেন, যাছাই-বাছাই করে ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাদের পদ শূন্য ঘোষণা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত বিতর্কিতদের কমিটি থেকে বাদ দেয়া হয়নি।

নেতাদের তোয়াক্কা না করা

কমিটি গঠনের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে ছাত্রলীগ আয়োজিত শোক দিবসের আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক উপস্থিত হওয়ার কমপক্ষে আধাঘন্টা পরে সভাস্থলে প্রবেশ করেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রলীগের সম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়ে শোভন-রাব্বানীর জন্য টানা তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে। ছাত্রলীগের এই দুই নেতা নিজেদের দেরি হওয়ার বিষয়টি আগে থেকে অবহিত করেননি। অনুষ্ঠানস্থলে এসে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রী। এছাড়া সেদিনই দীর্ঘক্ষণ রোদের মধ্যে অবস্থান করায় হিট স্ট্রোকে মারা যান শাখা ছাত্রলীগের কর্মী সুলতান মোহাম্মদ ওয়াসি। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে পৌঁছানোর পর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা অনুষ্ঠানস্থলে যায়। সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদকে প্রধান অতিথি করে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে তারা বসিয়ে রাখেন। গত মাসে ঢাবির বঙ্গবন্ধু হলে শোক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমানকে বসিয়ে রেখেই সভাস্থল ত্যাগ করেন রাব্বানী। সম্প্রতি সিলেট সফরে যান ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন। সেখানে তার গাড়ির বাইরে দাঁড়ানো সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমানের সঙ্গে গাড়ির ভেতরে বসেই হাত মেলান শোভন। এ নিয়েও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

বিতর্কিত কর্মকান্ড, সাংগঠনিক অদক্ষতা, বিশৃঙ্খলা

বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের তৃতীয় তলা প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগকে ব্যবহার করতে দেন। সেখানে বসেই সম্প্রতি মাদক সেবন করা হয়, যার প্রমাণ আওয়ামী লীগের নেতাদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে যায়। এজন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে খোদ ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে। এর ফলে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের প্রবেশ নিষেধ করে দেন বলে জানা গেছে।

গত ৩১ আগস্ট গণভবনের ভেতরে ঢোকা নিয়ে বিবাদে জড়ায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। লোকসমাগম দেখানোর জন্য অতিরিক্ত নেতাকর্মী নিয়ে যাওয়ায় গণভবনের প্রবেশমুখে হয় ধাক্কাধাক্কি, শেষ পর্যন্ত পুলিশ লাঠিচার্জের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে আহত হয় ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাসহ বিশ^বিদ্যালয় ও হলের অনেক নেতা গণভবনের ভেতরে ঢুকতে না পেরে ফেরত আসেন। তারা এ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ায় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করেন।

প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেয়ার নির্দেশ দেয়ার একদিন পরেই গোলাম রাব্বানীকে ‘প্রটোকল’ দিতে মধুর ক্যানটিনে না যাওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সূর্যসেন হলের চারটি কক্ষে তালা দিয়ে দেয় হল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর কিছুদিন আগে প্রকাশ্যে ঢাবির হল ছাত্রলীগের এক নেতাকে চড়-থাপ্পড় দেয়ার অভিযোগও আছে ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে। এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন কলেজের সম্মেলনের দুই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও কমিটি দিতে না পারা, কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি করার বিষয়ে অনৈতিক অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠা, কেন্দ্রীয় কমিটিতে অনেক বিতর্কিত, বিবাহিত ও জামায়াত-বিএনপি সংশ্লিষ্টদের পদায়ন করার বিষয় নিয়েও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ক্ষোভ রয়েছে।

নিয়মিত ছাত্রলীগের বর্ধিত সভা না হওয়া

গত ৩১ জুলাই বর্তমান কমিটির প্রথম এবং একমাত্র বর্ধিত সভা বিকেল চারটায় সভা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক রাব্বানী সঠিক সময়ে উপস্থিত হতে না পারায় নির্ধারিত সময়ের অন্তত তিন ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৭টা থেকে বর্ধিত সভা শুরু হয়। সভায় শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন পদের নেতা ও জেলাসমূহের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ফোন রিসিভ না করা এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা না করার অভিযোগ আনা হয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি মাসে বর্ধিত সভার আয়োজন করা হবে মর্মে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক প্রতিশ্রুতি দিলেও নিয়মিত সভা আয়োজন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন শোভন-রাব্বানী। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ রয়েছে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে।

জাবি উপাচার্যের কাছে চাঁদা দাবি

গত ৮ আগস্ট রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সঙ্গে তার বাসভবনে দেখা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের ৪-৬ শতাংশ চাঁদা দাবি করেন শোভন-রাব্বানী। উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার পেয়েছে- এমন কোম্পানির কাছ থেকে উপাচার্যকে টাকার ব্যবস্থা করে দিতে বলেন শোভন-রাব্বানী। কিন্তু উপাচার্য তাতে রাজি না হওয়ায় তার সঙ্গে দুই নেতা রূঢ় আচরণ করেন। জাবি উপাচার্য নিজেই এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অবহিত আছেন বলেও জানান তিনি।

অন্যান্য অভিযোগ

শোভন ও রাব্বানীর বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। দুপুরের আগে ঘুম থেকে না ওঠা, কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়াদের সংখ্যা উল্লেখ করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পরও তারা কারা সেটা স্পষ্ট না করা ও পরে বাদ দেয়ার ঘোষণা কার্যকর না করা, ছাত্রলীগের সভাপতির বিরুদ্ধে বিবাহিত হওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া, শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় কমিটিতে নাম বিভ্রান্তি দূর না করা, টাকার ভাগাভাগি নিয়ে পহেলা বৈশাখের আগের রাতে কনসার্টস্থলে আগুন, মধুর ক্যান্টিন ও দলীয় কার্যালয় বাদ দিয়ে বাসাভিত্তিক রাজনীতি, সেলফি ও ফেসবুক ট্যাগকেন্দ্রিক রাজনীতি, মধুর ক্যান্টিন ও দলীয় কার্যালয়ে মাঝে-মধ্যেই অনুপস্থিত থাকা, কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পদ দেয়া, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শেষ করার আগেই উধাও হওয়াসহ নানা অভিযাগ রয়েছে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সাবেক কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসেন বলেন, তাদের (শোভন-রাব্বানী) দীর্ঘদিনের অদক্ষতার ফলেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছেন। তারা যেখানে সেখানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নাম বিক্রি করে চাঁদা নেয়, দলীয় কার্যালয়ে বসে ফেনসিডিল খায়, যার প্রমাণ আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার তাদের বলেছিল, কেন্দ্রীয় কমিটিকে বিতর্কমুক্ত করতে। আপার কোন আদেশই তারা পালন করেনি। তিনি বলেন, কমিটি গঠনের পর আপা তাদের খোঁজ নেয় না, বিষয়টি এমন নয়। তিনি এসব বিষয়ে সবসময় কনসার্ন থাকেন। সব খবর তিনি রাখেন। পার্টিকে রক্ষা করেন। এই রক্ষা করতে গিয়ে যারা তার নাম ভাঙিয়ে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চায়, তিনি তাদের থেকে দায়িত্ব ছিনিয়ে নেন। কমিটি গঠনের পর থেকেই তাদের ওপর নজরদারি ছিল। তারা সংগঠনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে দেখে আপা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আরিফ হোসাইন বলেন, তাদের দায়িত্বের অবহেলা আছে বলে আমি মনে করি। পত্র-পত্রিকা পড়ে যা জানলাম তা হচ্ছে, তারা শুধু আদর্শিক কেলেঙ্কারি নয়, আর্থিক কেলেঙ্কারিতেও জড়িয়েছে। তবে, জননেত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে আমাদের চেয়ে ভালো জানেন। তিনি আমাদের একমাত্র অভিভাবক হিসেবে যদি মনে করেন, বর্তমান নেতৃত্বকে শোধরানোর সুযোগ দেবেন, তবে তার সিদ্ধান্তের প্রতি যেমন শ্রদ্ধাশীল থাকব তেমনি যদি শোধরানোর সুযোগ না দেন, তবুও তার প্রতি আস্থাশীল থাকব।

নানা অভিযোগের বিষয়ে বৃহস্পতিবার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের যেভাবে চলা উচিত ছিল, তাতে কিছুটা হলেও ব্যত্যয় ঘটেছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমরা কোন ধরনের গুরুতর অপরাধ করিনি। তারপরও সতর্ক থাকার চেষ্টা করব। আমরা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আপাকে (প্রধানমন্ত্রী) কষ্ট দিয়েছি, তার জন্য আমরা অবশ্যই অনুতপ্ত। এটা আমাদের সবচেয়ে বড় নৈতিক পরাজয়। নেত্রীকে কষ্ট দিয়ে আমরা ছাত্রলীগ করতে চাই না। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, নৈতিক স্থলনের মতো কোন কাজ আমরা করিনি। যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলোর কোন দালিলিক প্রমাণ নেই। নেত্রী নিজে পছন্দ করে দিয়েছেন বলেই অনেকে চায়, এ কমিটি ব্যর্থ হোক। তারপরও ছাত্রলীগের ভালোর জন্য আপা যে সিদ্ধান্ত নিবেন তাই শিরোধার্য।

তবে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে ওঠা ‘বিতর্কের’ বিষয়ে আর কোন মন্তব্য করতে রাজি হোননি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এ নিয়ে (ছাত্রলীগ) আর কোন কথা বলব না। কারণ আমাদের সভাপতি দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি দেখছেন। এ নিয়ে আমার কোন মন্তব্য নেই।