• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ জিলকদ ১৪৪১

বরিশাল বিভাগে

চিকিৎসক সংকট বেহাল স্বাস্থ্যসেবা

১১৩১টি পদের মধ্যে ৫৩৮টিই শূন্য

সংবাদ :
  • মানবেন্দ্র বটব্যাল, বরিশাল

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০

চিকিৎসক সংকটে চরম বেহাল দশায় আছে বরিশাল বিভাগের এক কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা। দেশের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা যে কতটা ভঙ্গুর এবং যেকোন বিপর্যয় মোকাবিলায় যে কতটা অক্ষম তা এখন নাগরিকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে নিয়মিত প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের নিয়োগ না দেয়ায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অভিমত। দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা সদরের জেনারেল হাসপাতাল, ৩৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রয়েছে চরম চিকিৎসক, টেকনোলজিস্টসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট। এমনকি মহামারী আকারে করোনাভাইরাস আক্রমণের পর সরকার একসঙ্গে দু’হাজার চিকিৎসক, পাঁচ হাজার নার্স নিয়োগ দেবার পরও এখনও সর্বত্র নাই আর নাই। এরমধ্যে আবার ইতোমধ্যে দক্ষিণাঞ্চলে ৩১২ জন চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসাকর্মী করেনা সংক্রমণের শিকার হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালের একজন ও বেসরকারি ক্লিনিকের এজন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

বরিশাল বিভাগে হাসপাতালগুলোতে মোট ১ হাজার ৮৭টি চিকিৎসকের পদের মধ্যে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৪শ’ পদই শূন্য। তবে পুরনো এই জনবল কাঠামোর প্রায় ৪০ শতাংশ শূন্য থাকার মধ্যেই পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠীর জেলা সদরের হাসপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের ৩১ শয্যার বেশিরভাগ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করা হলেও জনবল মঞ্জুরি মেলেনি এখনও। পটুয়াখালী ও ভোলা হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ১শ’ থেকে আড়াইশ’ করা হলেও চিকিৎসকসহ অন্য সব জনবল মঞ্জুরি আগের অবস্থানেই রয়েছে। ঝালকাঠী, পিরোজপুর ও বরগুনা জেলা সদর হাসপাতালগুলোও ৫০ শয্যা থেকে ১শ’ শয্যায় উন্নীত করা হলেও চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টিকরা হয়নি। টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) মঞ্জুরিকৃত ১০২টির মধ্যে ৫৮টি পদ শূন্য রয়েছে।

১৯৬৮ সনে বরিশাল মেডিকেল কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেড সংখ্যা ছিল ৩৬০টি। আর সেই অনুযায়ী জনবল কাঠামো নির্ণয় করা হয়। পরবর্তীতে একই হাসপাতাললের বেডের সংখ্যা প্রথমে পাঁচ শতে উন্নীত করা হয়। কিন্তু এখানে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দু’হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতেন। অবশ্য করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে এখন অন্যান্য রোগে আক্রান্ত কেউ সহস্যা হাসপাতালে ভর্তি হতে চান না। আবার চিকিৎসকেরাও রোগী করোনায় আক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত না হয়ে ভর্তি করতে চান না।

পরবর্তীতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় পাঁচতলা নতুন একটি ভবন নির্মাণ করে হাসপতালটি এক হাজার বেডে উন্নীত করা হলেও নতুন ভবনে এখন শুধুমাত্র করোনার রোগী চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তার আগে এখানে কোন রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হতো না। হাসপাতালটি এক হাজার বেডে উন্নীত করা হলেও ৩৬০ বেডের আামলে যে জনবল নির্ধারণ করা হয়েছিল আনুপাতিকহারে তার থেকে জনবল কাঠামো বাড়ানো হয়নি।

শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ বাকির হোসেন জানান, হাসপাতালে চিকিৎসকের ২২৪টি পদ থাকলেও ১২৭টি পদ এখনও শূন্য রয়েছে। টেকনোলজিস্টের পদ রয়েছে মাত্র ছয়টি। নার্স ব্যতীত অন্যান্য পদের জনবল অর্ধেক না থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থা চলছে জোড়াতালি দিয়ে। স্থায়ী চিকিৎসক ও জনবল না থাকায় বিভাগের মধ্যে একমাত্র আইসিইউ থাকা শেবাচিমে মুমূর্ষু রোগীদের সেবাও চলছে জোড়াতালি দিয়ে। হাসপাতালে মোট ২৮টি আইসিইউ বেড থাকলেও কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এসব বেডের রোগীদের সিলিন্ডার থেকে অক্সিজেন দেয়া হয়। যে কারণে প্রয়োজনে ভেন্টিলেটর ব্যবহার করা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ২৮টি আইসিইউ বেডের মধ্যে করোনায় আক্রান্তদের জন্য রয়েছে ১৮টি নির্ধারণ করা হয়েছে।

শেবাচিম কর্তৃপক্ষ জানান, হাসপাতালের শুরুতে আইসিইউ না থাকায় পরবর্তীতে আইসিইউর জন্য বিশেষজ্ঞ কোন চিকিৎসক, নার্স বা টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেয়া হয়নি। অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের চিকিৎসক এবং ১০ জন নার্সকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে করোনা ওয়ার্ডের আইসিইউ সেবা চালু রাখা হয়েছে। হাসপাতালের ২২টি বিভাগীয় প্রধান পদে একজন করে অধ্যাপক থাকার কথা থাকলেও এই হাসপাতালের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। আবার ওয়ার্ড খোলা হয়েছে কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় রোগীরা চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের একাধিক চিকিৎসকের পদ শূন্য থাকায় রোগীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বর্তমানে অন্য ওয়ার্ডের রোগী কমলেও করোনা ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসায় ফুটে উঠেছে অসহায়ত্ব। শেবাচিম হাসপাতালের পুরাতন ভবনের পার্শ্ববর্তী পাঁচতলার নতুন ভবনের চতুর্থ তলা পর্যন্ত ১৫০টি করোনা বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন প্রায় ১২০ জন রোগী। কিন্তু সেখানকার রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, এখানে চিকিৎসাসেবা পেতে ভর্তি হওয়া রোগীদের সেবা পাওয়া খুবই দুষ্কর। চিকিৎসক, নার্স কারোর দেখা পাওয়া যায়না। রোগীদের ভরসা হলো নিজেদের সঙ্গে থাকা স্বজন ও সাময়িকভাবে নিয়োগ দেয়া ওয়ার্ডবয়রা। ডাক্তাররা তাদের কাছে রোগীর সমস্যা শোনে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন এবং রোগীর স্বজন ও ওয়ার্ডবয়রা সেই অনুযায়ী রোগীদের ওষুধ দিচ্ছেন। এমনকি এখানে যে খাবার সরবরাহ করা হয় তা খাবার অযোগ্য হওয়ায় যেসব রোগীদের সামর্থ্য আছে তারা হোটেল থেকে খাবার এনে খাচ্ছেন। করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বক্তব্য হলো এখানে চিকিৎসার চেয়ে তারা বাসা-বাড়িতেই ভালো ছিলেন। তাই অনেকেই স্বেচ্ছায় করোনা ওয়ার্ড ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কঠিন সমস্যা না হলে বা আইসিইউ বেডে চিকিৎসার প্রয়োজন না হলে কারোরই এই হাসপাতালে আসা উচিৎ নয় বলে তারা মতামত দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ ম-ল জানান, বিভাগের ছয় জেলা ও উপজেলায় যেসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতাল রয়েছে সেখানে চিকিৎসকের পদের প্রায় অর্ধেক পদ এখনও শূন্য রয়েছে। একই সঙ্গে শূন্য রয়েছে নার্স, টেকনোলজিস্টসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদ। সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়াদের মধ্যে বরিশালের ৬৫ জন চিকিৎসককে শেবাচিমসহ বিভিন্ন হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতেও দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের জন্য বিভাগে পাঁচ শতাধিক আইসোলেশন বেডের ব্যবস্থা থাকলেও আইসিইউ রয়েছে শেবাচিমের ১৮টি। এছাড়া বিভাগের কোথাও আইসিইউ ব্যবস্থাপনা নেই। চিকিৎসকসহ জনবল সংকটের বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য বরিশাল বিভাগে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটি ব্যতীত বেসরকারি কোন মানসম্মত হাসপাতাল নেই। ‘হাসপাতাল’ নাম দিয়ে বরিশাল নগরীসহ বিভাগের বিভিন্ন স্থানে যেসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রয়েছে প্রকৃতপক্ষে এগুলো সবই ‘ক্লিনিক’। বরিশাল নগরীতে একটি ক্লিনিকে স্বল্প সংখ্যক আইসিইউ ও এনআইসিইউ থাকলেও করোনার সংক্রমণ শুরুতেই এই ক্লিনিকটি ঘোষণা দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে।