• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ৮ রবিউস সানি ১৪৪১

টানা আড়াই ঘণ্টার বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা

চরম দুর্ভোগে রাজধানীবাসী

ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিবন্দী মানুষ যানবাহন, খানাখন্দে পড়ে আহত

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , বুধবার, ০২ অক্টোবর ২০১৯

image

বঙ্গবভনের পাশে ডুবন্ত সড়ক-সোহরাব আলম

গতকাল টানা আড়াই ঘণ্টার বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে যায় রাজধানী ঢাকা। জলজট ও যানজটে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় রাজধানীবাসীকে। পানিতে সড়ক ডুবে যাওয়ায় অফিস শেষে অনেকে বের হতে পারেনি। রাত পর্যন্ত অফিসে আটকে থাকতে হয় কর্মজীবীদের। জলাবদ্ধতায় স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অনেককেই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে বাসা-বাড়িতে ফিরতে দেখা গেছে। বৃষ্টির পর জলাবদ্ধতায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিবন্দী অবস্থায় সড়কে আটকে থাকতে দেখা গেছে যাত্রীদের। পরিবহন সংকটে পানি মধ্যে হাঁটতে গিয়ে গর্তে পড়ে আহত হয়েছেন অনেক পথচারী। সড়কে বেশি পানি থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের। টানা বৃষ্টিতে সচিবালয় এলাকায় তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। এতে সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। অনেককেই পানির মধ্যে হেঁটে অফিস শেষে বের হতে দেখা গেছে। গতকাল দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত ভারি বর্ষণে রাজধানীর বেশিরভাগ সড়ক হাঁটু থেকে কোমর পানিতে ডুবে যায়। বিশেষ করে নিচু এলাকায় বাসা-বাড়ির নিচ তলায় ও দোকানপাটে পানি প্রবেশ করে। অনেক এলাকায় ময়লা পানি বাসা-বাড়িতে ঢোকায় ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়রা জানান। সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, টানা ঘণ্টা দুয়েকের ভারি বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ঢাকার অনেক সড়ক, যাতে যান চলাচল ব্যাহত হয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে। বৃষ্টির পর রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা মতিঝিল, কাকরাইল, বঙ্গভবনের আশপাশ এলাকা, জিরো পয়েন্ট, পল্টন, বিজয়নগর, ফকিরাপুল, কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার প্রধান সড়ক তলিয়ে যায়। জলমগ্ন সড়কে ব্যাহত হয় যান চলাচল, সৃষ্টি হয় ব্যাপক যানজটের। বৃষ্টির পানিতে বিভিন্ন সড়ক ডুবে যাওয়ায় থেমে থেমে গাড়ি চলতে দেখা গেছে বিভিন্ন সড়কে। এতে করে নগরীর জিরো পয়েন্ট, পল্টন, বিজয়নগর এবং অন্যদিকে হাইকোর্ট এলাকা হয়ে শাহবাগ, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা, আরামবাগ, ফকিরাপুল, ইত্তেফাক মোড়, টিকাটলি, ফার্মগেট, যাত্রাবাড়ী ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। কারওয়ান বাজার, পশ্চিম তেজতুরী বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বেশি পানি জমেছে পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়কে। নবাবপুর, চকবাজার, বংশাল, দয়াগঞ্জ, জুরাইন, পোস্তগোলা, শ্যামপুর, শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী বিবিরবাগিচার বিভিন্ন বাসা-বাড়ির নিচ তলায় পানি প্রবেশ করেছে বলে স্থানীয়রা জানায়।

এছাড়া মগবাজারের পেয়ারাবাগ এলাকার গলিতেও পানি জমে বাসা-বাড়িতে ঢুকেছে। জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে নিউমার্কেট ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকাতেও। মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজের সামনের সড়কেও পানি জমে যায়। এতে আমতলী থেকে গুলশান ১ নম্বর যাওয়ার পথে তীব্র যানজট দেখা দেয়। জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়ও। ওই এলাকা থেকে বের হওয়ার মূল সড়কে পানিতে আটকে গেছে যানবাহন। মূল রাস্তার পাশের রাস্তাতেও পানি জমে গেছে। বনানী এলাকাতেও বৃষ্টির পর পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। পানিতে রাস্তা ডুবে যাওয়ায় বিভিন্ন সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

মতিঝিলের জনতা ভবন এলাকায় আবুল কাসেম নামের মোহাম্মপুরের এক যাত্রী সংবাদকে বলেন, ‘বৃষ্টি শেষে অফিস থেকে বের হয়ে ১ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম গাড়ির জন্য। পরে একটি গাড়িতে উঠি। কিন্তু অল্প কিছুদূর আসার পর তা আর চলে না। তাই বাধ্য হয়ে পানির মধ্যে হাঁটতে হচ্ছে। কখন গাড়ি পাব কে জানে।’ রাশেদ আলী নামে একজন রিকশাচালক বলেন, ‘প্রবল বৃষ্টিতে বিজয়নগর এলাকায় রাস্তার পাশে রিকশা রেখে পাশে একটি ভবনের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলাম, পরে বৃষ্টি একটু থামলে রিকশা নিতে গিয়ে দেখি রাস্তায় ডুবে গেছে।’ মতিঝিল থেকে রিকশা করে সেগুনবাগিচায় আসা কামাল হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, ‘এত অল্প সময়ের বৃষ্টিতে মনে হয় পুরো নগরীই ডুবে গেছে। সড়কের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।’ গুলিস্তান এলাকায় সারোয়ার নামের এক যাত্রী বলেন, দেড় ঘণ্টা যাবত পানি দিয়ে হাঁটতেছি। মিরপুরের গাড়িতে উঠছিলাম। কিন্তু গাড়িতে বেশি দূর আসতে পারিনি। মতিঝিল থেকে গুলিস্তান আসতে এক ঘণ্টা লাগছে। গুলিস্তান এসেছে এখন আর গাড়ি চলে না। তাই পানি দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে।

এদিকে গতকাল বৃষ্টির পর শাহবাগ এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, যা কারওয়ান বাজার হয়ে ফার্মগেটের রাস্তা পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। খোকন নামে একজন অটো রিকশাচালক শাহবাগ এলাকায় যানজটের কারণে বিমানবন্দর যেতে রাস্তা পাল্টে মগবাজার-মহাখালীর সড়কে চলে আসেন। বেলা সোয়া ৩টার দিকে সাত রাস্তায় তিনি বলেন, শাহবাগ থেইকা শেরাটনের সামনে আইতে আধ ঘণ্টা লাগছে। পরে গাড়ি ঘুড়িয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে দিয়া আইছি।‘ বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটের ভেতরও পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। অল্প সময়ের বৃষ্টিতে এ ধরনের জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে পানি সরার ড্রেনগুলো ঠিকমতো কাজ না করার কথা বলেন মাইনুল হোসেন নামের এক যাত্রী। শহর থেকে পানি যে নামবে সেই নালাগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরে আছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ড্রেন পরিষ্কার করা হয় না। এতে কম সময়ের বৃষ্টিতেই অধিকাংশ সড়ক তলিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

গতকাল কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবে গেছে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন রাস্তা ও ফুটপাত। ফলে মানুষ অফিস থেকে বের হতে রাত হয়ে যায়। অনেক স্থানে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ যানজট। চরম দুর্ভোগে পড়েছে নগরবাসী। বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারী, ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও যানবাহনের আরোহীরা। রাস্তায় পানি জমায় মানুষ গাড়িতে উঠ?তে পারছে না। ফুটপাতে পানি জমে যাওয়ায় জুতা খুলে কাপড় গুছিয়ে হাঁটতে দেখা গেছে পথচারীদের। আবার অনেকে রিকশায় চড়ে রাস্তা পার হচ্ছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় এমন চরম বিড়ম্বনায় পড়েছেন নগরবাসী।

জলাবদ্ধতার কারণে অফিসে আটকে থাকা মনির নামে এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, বৃষ্টি অফিসের ভেতরে ছিলাম। বের হয়ে দেখি বৃষ্টিতে সব রাস্তা ডুবে গেছে। একটা রিকশা নিয়ে যে বের হব তারও কোন উপায় নেই। কারণ ফুটপাতও ডুবে গেছে। মিরপুরে মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন কাজের কারণে সারা বছর খোঁড়াখুঁড়ি চলে। পাইপ বসানো হয়। কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না। প্রয়োজনের তুলনায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত নামছে না পানি। একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নিউমার্কেট এলাকায় জলাবদ্ধতায় আটকা পড়া এক রিকশাচালক বলেন, বৃষ্টিতে রাস্তা ডুবলে গাড়ি চালানো যায় না। কারণ জায়গায় জায়গায় রাস্তা গর্ত, রিকশা টান দিতে ভয় লাগে। কোন সময় পড়ে যায় ঠিক নাই। বৃষ্টি হলেই রাস্তায় কোমর পানি হয়ে যায়, নেতারা বড় বড় কথা কয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করে না।

টানা বৃষ্টিতে ঢুকে গেছে যাত্রাবাড়ী ও দয়াগঞ্জসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়ক। যাত্রাবাড়ীর চৌরাস্তায় এলাকায় নয়ন নামের এক যাত্রী বলেন, বৃষ্টির কারণে যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন অলি-গলি পানিতে ডুবে গেছে। অনেক এলাকায় ময়লা-পচা পানি বাসা-বাড়ির নিচতলায় প্রবেশ করেছে। এই এলাকায় অল্প বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী বিবিরবাগিচার এলাকায় অলি-গলি অল্প বৃষ্টিতে পানিতে ডুবে যায়। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৮ ও ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের অবস্থা খুবই খারাপ। ড্রেনের ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে এমনিতেই সড়ক ডুবে থাকে। তারপর বৃষ্টি হলে তো কথা নেই। এই ময়লা পানি ওয়াসার পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাজে অবস্থার তৈরি হয়েছে। অনেক বাসার নিচতলায় পানি প্রবেশ করায় মোটর নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।