• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭, ৫ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

করোনা ঝুঁকি নিয়ে

গ্রামমুখী মানুষ

সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হাটে-ঘাটে স্বাস্থ্যবিধি চরমভাবে উপেক্ষিত

সংবাদ :
  • রাকিব উদ্দিন

| ঢাকা , শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২০

মানুষ সংক্রমণের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই ঈদের ছুটির আগে থেকেই দলবেঁধে গ্রামমুখী হয়েছে। সরকার মাস্ক আবশ্যক করা, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গ্রামের বাড়িতে না যাওয়া এবং সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের পরামর্শ দিলেও ঈদযাত্রায় কোথাও এর প্রতিফলন দেখা যায়নি। ঢাকার বিভিন্ন বাস টার্মিনাল ও পশুর হাটগুলোতে নাগরিকদের চরমভাবে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করতে দেখা গেছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কঠোর তৎপরতা না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করছেন অনেকেই।

করোনা পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহার তিন দিনের ছুটি শুরু হচ্ছে আজ। করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় থাকার কারণে ঈদ ও বন্যাকে ঘিরে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনা প্রাদুর্ভাবের মধ্যে গত ঈদুল ফিতরে ছয় দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এই ঈদে ছুটি বাড়ছে না; তিন দিনই থাকছে। তবে ছুটি বাড়ুক বা তিন দিনই থাকুক- তাতে নগরবাসীকে গ্রামমুখী না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, সংক্রমণ পরিস্থিতির ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় গত ঈদে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই গ্রামের বাড়িতে ছুটে যায়; পরবর্র্তীত একইভাবে শহরমুখী হয়। এতে দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়। গতকালও দেশে করোনা শনাক্তের হার ছিল প্রায় ২১ শতাংশ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এসএম আলমগীর সংবাদকে বলেছেন, ‘জনগণের একটি বড় অংশই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। গত ঈদের মতো এবার ঈদের ছুটিতেও যদি মানুষ স্বাস্থ্যবিধি অগ্রাহ্য করে গ্রামের বাড়িতে ছুটে তাহলে ছুটির পর সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যায়। এজন্য সবার প্রতি অনুরোধ থাকবে- সম্ভব হলে যানবাহনের ভিড় এড়িয়ে চলুন; কোথাও বের হলে মাস্ক ব্যবহার করুন; হ্যান্ড স্যানিটাইজার সঙ্গে রাখুন; সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করুন; পশুর হাটে ভির এড়িয়ে চলুন।’

গত দু’তিন দিন ধরে বিপুল সংখ্যাক মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে রাস্তায় চলাফেরা করতে দেখা গেছে উল্লেখ করে ডা. এসএম আলমগীর বলেন, ‘এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ঈদের ছুটির পর সংক্রমণ বাড়তে পারে। তবে বর্তমানে সংক্রমণ নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে।’

গতকাল দুপুরে রাজধানীর শাহজাহানপুর পশুর হাট ঘুরে দেখা যায়, পশু ক্রেতা ও বিক্রেতারা ন্যূনতম সামাজিক দূরত্ব অনুসরণ করছেন না। মানুষের ভিরে বাজারে প্রবেশ করতে বেগ পেতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

গরু কিনতে আসা খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা রাসেল শাহরিয়ার ও রুবেল হোসেন বলেন, ‘এভাবে পশুর হাট বসার অনুমোদন দেয়াই ঠিক হয়নি। হাটের ইজারাদাররা সামান্যতম স্বাস্থ্যবিধি মানার পরিবেশও তৈরি করছেন না। মানুষের ধাক্কাধাক্কিতে বাজারে ঢুকতেই পারছি না। অথচ নামকাওয়াস্তে মাইকে বার বার ঘোষণা করা হচ্ছে, সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২৫ মে ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হয়। ওই ঈদের সময় থেকে গতকাল পর্যন্ত প্রায় দুই মাসে দেশে নমুনা পরীক্ষায় বিবেচনায় করোনা শনাক্তের হার প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। গত ঈদের সময় নাগরিকদের চলাফেরায় কিছুটা বিধি-নিষেধ থাকলেও এবার সবকিছুই উন্মুক্ত। এ কারণে ঈদের আগে ও পরে নাগরিকরা স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সংক্রমণ বৃদ্ধির উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।

ঈদুল আজহা ও চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে দেশে করোনা সংক্রমণের হার আরও বাড়তে পারে-এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল নিজ মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে কোরবানির পশুর হাটে ও ঈদযাত্রায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ব্যাহত হতে পারে। অনেকেই পশুরহাটে মাস্ক ছাড়া ঘোরাফেরা করছেন।’

আগামীকাল ঈদুল আজহা। ঈদের আগের দিন থেকে ঈদের পরদিন পর্যন্ত সরকারি ছুটি থাকছে। গত ঈদে বিপুলসংখ্যক মানুষ শহর থেকে গ্রামমুখী হলেও এবার নাগরিকদের গ্রামমুখী হওয়ার প্রবণতা কিছুটা কম। গতকাল রাজধানীর কয়েকটি বাস টার্মিনাল ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন টার্মিনালের টিকিট কাউন্টারে যাত্রীদের ভিড় তেমন দেখা না গেলেও গতকাল কিছুটা বেশি ভিড় দেখা গেছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে নাগরিকদের মধ্যে আগ্রহের ঘাটতি দেখা গেছে।

করোনা পরিস্থিতিতে নাগরিকদের গ্রামমুখী হওয়ার প্রবণতার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. এবিএম আবদুল্লাহ সংবাদকে বলেছেন, ‘জনগণের প্রতি এবং বিশেষ করে ঈদ করতে যারা গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে; জরুরি প্রয়োজন না হলে ঈদ করতে কেউ যাতে গ্রামের বাড়িতে না যায়। এরপরও যারা গ্রামে যাবেন, তারা অবশ্যই মসজিদে ঈদের নামায আদায় করবেন, ঈদগা মাঠে যাবেন না, ভিড় এড়িয়ে চলবেন। পশুর হাটে যারা যাবেন তারা অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করবেন, মাস্ক পড়বেন, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করবেন।’

দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। সরকারিভাবে করোনায় প্রথম মৃত্যুর খবর বলা হয় গত ১৮ মার্চ। এর পর থেকে করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলছে। এরপর সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। সংক্রমণ বাড়তে থাকায় পরবর্তীতে কয়েক দফা ছুটি বাড়ানো হয়।

সাধারণ ছুটির মধ্যেই গত ২৬ এপ্রিল থেকে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা খোলা হয়। পরবর্তীতে ১০ মে থেকে হাটবাজার, ব্যবসা কেন্দ্র, দোকানপাট ও শপিং মলগুলো শর্তসাপেক্ষে সীমিত পরিসরে খোলা হয়। এরপর গত ২৫ মে অনুষ্ঠিত ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়।

কিন্তু সংক্রমণ পরিস্থিতির এখনও তেমন উন্নতি হয়নি বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। গতকাল পর্যন্ত দেশে দুই লাখ ৩৪ হাজার ৮৮৯ জনের করোনা শনাক্ত এবং করোনায় তিন হাজার ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল ১২ হাজার ৯৩৭টি নমুনা পরীক্ষা করে দুই হাজার ৬৯৫ জনের সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আর গতকাল করোনায় মৃত্যু হয় ৪৮ জনের।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা সংক্রান্ত নিয়মিত বুলেটিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ঈদুল ফিতরের কিছুদিন আগ থেকেই সাধারণ ছুটির কিছু শর্ত শিথিল করা হয়। ঈদের দু’দিন আগে গত ২৩ মে একদিনে ১০ হাজার ৮৩৪টি নমুনা পরীক্ষা করে এক হাজার ৮৭৩ জনের করোনা শনাক্ত হয় এবং ২০ জনের মৃত্যু হয়। ওইদিন শনাক্তের হার ছিল ১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। এর প্রায় দুইমাস পর বর্তমানে নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় দেশে সংক্রমণ শনাক্তের হার গড়ে ২০ শতাংশেরও বেশি। সর্বশেষ গতকাল নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় দেশে শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ৩০ শতাংশ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার কারণে সরকারের পক্ষে দীর্ঘ সময় সবকিছু বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। একটা পর্যায়ে নাগরিকদেরও দায়িত্ব পালন করতে হয়। কাজেই জনগণ যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানে, সচেতন না হয়, তাহলে এই ঈদেও সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে। গত ঈদে সরকারের বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ পরিবহনে করে গ্রামের বাড়িতে যায়। অনেকেই ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করেনি। তাদের কেউ ঈদে বাড়ি গিয়ে গ্রাম-গঞ্জে গিয়ে বাবা-মা ও ভাইবোনদের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে দিয়েছে, কিংবা নিজেরা আক্রান্ত হয়েছেন। আসছে ঈদেও যদি এগুলো অব্যাহত থাকলে সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকেই যায়।’