• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮, ৯ কার্তিক ১৪২৫, ১৩ সফর ১৪৪০

খালেদা জিয়ার জামিন বহাল কিন্তু মুক্তি পাচ্ছেন না

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৭ মে ২০১৮

image

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দন্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেয়া হাইকোর্টের জামিন বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। তবে আরও কয়েকটি মামলায় গ্রেফতার থাকায় এখনই কারামুক্তি পাচ্ছেন না তিনি। আটক থাকা এসব মামলায় তাকে জামিন নিতে হবে। সেজন্য আরও কিছু সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা। গতকাল খালেদা জিয়াকে দেয়া হাইকোর্টের জামিন আদেশের বিরুদ্ধে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। আপিল বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মুহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। রায়ে এই মামলায় হাইকোর্টে পেপারবুক প্রস্তুত ও বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চকে আপিল (দন্ডাদেশের রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপিল) আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।

রায় ঘোষণার সময় আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, এজে মুহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার মাহাবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখ। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যার্টনি জেনারেল মো. মমতাজ উদ্দিন ফকির, মুরাদ রেজা এবং দুদকের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান। উল্লেখ্য, গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৫-এর বিচারক ড. আখতারুজ্জামানের আদালত খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেন। এরপর থেকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারে রয়েছেন খালেদা জিয়া।

আপিল বিভাগের রায়ের পর খালেদার অন্যতম আইনজীবী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের জামিন বহাল থাকলেও মুক্তিতে কিছুটা বাধা আছে। কারণ সরকার নানা কৌশলে চেষ্টা করবে তার মুক্তিটা বিলম্বিত করার জন্য। নিচের আদালতের কতগুলো মামলায় তাকে আসামি দেখানো হয়েছে। সে মামলাগুলোতে তার জন্য আমাদের জামিন নিতে হবে। সেই জামিন নিতে যতটুকু সময় লাগে সেই সময়টুকু পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব খুব দ্রুত গতিতে...। আপিল বিভাগ যেহেতু তার জামিন বহাল রেখে দিয়েছেন, এখন নিম্ন আদালতে জামিন পেতে আর খুব বেশি অসুবিধা হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘নিম্ন আদালতে মোট সাতটি মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ আছে। এর মধ্যে তিনটি মামলা কুমিল্লায়, দুটো মামলা ঢাকার আদালতে; আর নড়াইল ও পঞ্চগড়ে একটি করে মামলা রয়েছে।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের অন্যতম সদস্য খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, সরকার যদি অশুভ প্রচেষ্টা না করে, তবে এটা স্বচ্ছ যে, তিনি জামিনে মুক্তি পাবেন।’

আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, ‘খালেদা জিয়ার কারামুক্তিতে আরও ৬ মামলায় জামিন পেতে হবে। এর মধ্যে ৪ মামলায় প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট আছে, এগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। কুমিল্লা, নড়াইল এবং ঢাকাতে এ মামলাগুলো রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সর্বমোট মামলা রয়েছে ৩৬টি।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট ভবনের নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, খালেদা জিয়াকে দেয়া হাইকোর্টের জামিন আদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। পাশাপাশি এ মামলার আপিলের পেপারবুক প্রস্তুত থাকায় খালেদা জিয়ার হাইকোর্টের দায়ের করা আপিলের শুনানি আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বলেছেন। খালেদা জিয়ার হাইকোর্টে করা আপিলের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে শুনানির জন্য প্রস্তুতি নেয়া হবে। খালেদা জিয়ার জামিনে কারামুক্তিতে আরও কয়টি মামলায় জামিন পেতে হবে জানতে চাওয়া হলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি জানি না। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে।’ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করতে দুদক প্রস্তুত কিনা জানতে চাওয়া হলে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশ, এটা অবশ্যই নিষ্পত্তি করতে পদক্ষেপ নেবো। আদালতের কাছে আমরা নিবেদন করবো যে, আমরা আপিল শুনানি শুরু করতে প্রস্তুত আছি।’

এদিকে, দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন বহালের সংক্ষিপ্ত আদেশ চেয়ে তার আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলীর আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। সকালে জামিন বহালের রায় আসার পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চে সংক্ষিপ্ত আদেশ চেয়ে আবেদন করেন আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। শুরুতেই আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী আদালতকে বলেন, ‘জামিননামা দাখিল করতে চাই। তাই ঘোষিত রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশ চাচ্ছি। আদালত রায় ঘোষণা করেছেন, যা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটেও থাকবে। রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশের কপি দিন।’ মোহাম্মদ আলীর এমন প্রার্থনার পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে বলেন, ‘রায় ঘোষণার পর সংক্ষিপ্ত আদেশের কপি দেয়ার নজির নেই।’ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রায়ের পর একমুহূর্তও কাউকে আটকে রাখা হলে, তা হবে বেআইনি আটক। এ জন্য সংক্ষিপ্ত আদেশ চাচ্ছি।’ মোহাম্মদ আলীর উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘আপনি যা বলেছেন, তা আমাদের রুলসে নেই।’

তখন মোহাম্মদ আলী বলেন, কোন ব্যক্তির স্বাধীনতা অন্য যেকোন বিষয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আদালত বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রায় পাবেন। বেঞ্চের এক বিচারপতি বলেন, সংক্ষিপ্ত আদেশ দেয়ার নজির নেই। মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘নজির নেই। আপনারা নজির সৃষ্টি করতে পারেন।’ আদালত বলেন, ‘আপনার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলো।’ এ পর্যায়ে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি একা এসেছি। দলবল নিয়ে আসিনি।’ মোহাম্মদ আলীর উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দল দেখে কি আমরা আদেশ দেব? দলবল দেখে আদেশ দিই না।’ মোহাম্মদ আলীকে উদ্দেশ করে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেন, ‘আপনি এটা কী বললেন?’ বেঞ্চের অপর এক বিচারপতি মোহাম্মদ আলীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি যে মন্তব্য করেছেন, সেটি আপত্তিজনক। আপনি কি আমাদের ফোর্স করতে পারেন? আপনি একজন আইনজীবী। কোন দলীয় লোক নই।’ মোহাম্মদ আলীর উদ্দেশে বেঞ্চর আরেক বিচারপতি বলেন, ‘আপনার প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তর্ক করছেন কেন?’ তখন মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এটা ঠিক হয়নি।’ বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ছয় থেকে সাত মিনিটের মতো এই শুনানি চলে।

প্রসঙ্গত, গত ৮ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় সাজা হওয়ার পর খালেদা জিয়া রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল ও জামিনের আবেদন করেন। জামিন আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ১২ মার্চ খালেদা জিয়াকে ৪ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন হাইকোর্ট। এরপর দুদক ও রাষ্ট্র পক্ষ জামিনের বিরুদ্ধে আপিলে গেলে এক দফা স্থগিত করার পর ১৯ মার্চ প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ ৮ মে পর্যন্ত জামিন স্থগিতের আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের আইনজীবীদের আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে বলেন। পরে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা ও দুদকের আইনজীবী মামলার সারসংক্ষেপ জমাদেন। গত ৮ মে লিভ টু আপিল ওপর শুনানি শুরু হয়। ৯ মে দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি নিয়ে আদেশের জন্য ১৫ মে নির্ধারণ করা হলেও আবারও শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে ফের শুনানি নিয়ে গতকাল (১৬ মে) আদেশের জন্য রাখা হয়।

মামলার তথ্য বিবরণী থেকে জানা গেছে, এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশে বিদেশ থেকে পাঠানো ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করার অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই দুদক এই মামলা করে। তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়া, তার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন দুদকের উপপরিচালক হারুন অর রশীদ। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আদালত খালেদা জিয়াসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৪০৯, ১০৯ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করেন। এরপর ২৩৬ কার্য দিবসে ৩২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ, ২৮ কার্য দিবস আত্মপক্ষ সমর্থন ও ১৬ কার্যদিবস যুক্তি তর্কের শুনানি শেষে রায়ের দিন ধার্য করে আদালত। গত ৮ জানুয়ারি ঘোষিত রায়ে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড হয়। এছাড়া অন্য আসামিদের ১০ বছর কারাদন্ড এবং প্রত্যেক আসামির অর্থদন্ড হয়।