• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, ১৯ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

ক্ষোভের ঢেউ লেগেছিল গোপালগঞ্জেও

সংবাদ :
  • রবীন্দ্রনাথ অধিকারী গোপালগঞ্জ থেকে

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

image

ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জের ছাত্র-শিক্ষক ও ভাষাপ্রেমিক বাঙালির বিশেষ অবদান রয়েছে। ঢাকা থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গোপালগঞ্জ ১৯৫২ সালে ছিল মহাকুমা শহর। ১৯৫১ সালে গোপালগঞ্জ সদরে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এখানে ক্ষুব্ধ ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে ভাষা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে। ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পর দেশের অন্যান্য স্থানের মতো বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান গোপালগঞ্জেও ভাষা সংগ্রাম শুরু হয়। সুসংগঠিত কোন ফোরামের কর্মসূচি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পূর্বে এখানে পালনের খবর না থাকলেও আন্দোলন চলাকালে যোগাযোগ স্বল্পতার কারণে গোপালগঞ্জে তখন বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মসূচি পালন করে।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসার পর রেসকোর্স মহয়দানে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ এ ঘোষণা দেয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় তার ঢেউ গোপালগঞ্জে এসে পৌঁছায়। এখানেও বাঙালি আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, ছাত্র ও প্রগতিশীল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ভাষা আন্দোলনের সংগ্রাম কমিটি গঠন করে। এই কমিটির গোপালগঞ্জ মহাকুমার আহ্বায়ক ছিলেন গোপালগঞ্জের কায়েদে আযম মেমোরিয়াল কলেজের তৎকালীন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এবং পরে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য সাঈদ আলী খান। যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলেন হেলেনা বেগম। ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন প্রগতিশীল নেতা মুখলেসুর রহমান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আবদুল লতিফ, রহমত জান সরদার, জহুরুল হক ভূঁইয়া, ইমামউদ্দিন সরদার, ফজলুর রহমান, আমিরুল ইসলাম টুকু, আবুল হোসেন ভূঁইয়া ও শেখ লুৎফর রহমান লুথু। তারা ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ছাত্র-জনতাকে সচেতন করার জন্য গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েন। স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত করেন। ঢাকার ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চালুর দাবিতে সক্রিয় করে তোলেন। তাদের আহ্বানে বেশিরভাগ স্কুল-কলেজে তখন ছাত্রছাত্রীরা কালো ব্যাজ ধারণ করে এবং ক্লাস বর্জন কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তৎকালীন কায়েদে আযম মেমোরিয়াল কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র আবুল হোসেন ভূঁইয়ার তৎপরতা উল্লেখযোগ্য ছিল। এলাকায় ভাষা আন্দোলনের সময় তৎকালীন মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও পাক বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াহিদুজ্জামানসহ (ঠান্ডা মিয়া) তার লোকজন ভাষা আন্দোলকারীদের ওপর রুষ্ট ছিলেন।

ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে মুকসুদপুরের বিভিন্ন হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীরা শোক মিছিল ও কালো ব্যাজ ধারণ করে। রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই সেøাগানে মুখরিত করে তোলে। এছাড়া ওই দিন গোপালগঞ্জ মহাকুমা বারের আইনজীবীরা প্রতিবাদ সভা করেন। পুলিশের বর্বরোচিত হামলা ও গুলি বর্ষণের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন এবং ঢাকা থেকে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় রফিক, সফিক, বরকত, সালাম, জব্বার নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পরার পরপরই এখানে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের নতুন মাত্রা যোগ হয়। ছাত্রলীগ কর্মী ও ছাত্র-নেতারা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনসচেতনতা বাড়াতে সাহসী ভূমিকা পালন করেন তখন।

ভাষা আন্দোলনের প্রায় দু’বছর পর ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পূর্বে এখানে প্রথম ভাষা আন্দোলন কমিটির পক্ষে থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গোপালগঞ্জ শহরের ব্যাংকপাড়ার বাড়ির আঙিনায় অস্থায়ীভাবে একটি শহীদ মিনার তৈরি করেন। ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি এ শহীদ মিনারকে ঘিরেই উল্লিখিত ছাত্র-জনতা ও বাংলাভাষা প্রেমিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা প্রথম শহীদ দিবস পালন করেন। এ শহীদ মিনারটি এখন জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসেবেই মর্যাদা পায়।