• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ২৩ মে ২০২০, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ রমজান ১৪৪১

এমপিওভুক্তি নিয়ে অনেক জেলায় অসন্তোষ

কিছু নামসর্বস্ব ও বিএনপি জামায়াত নেতার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানও রয়েছে

সংবাদ :
  • রাকিব উদ্দিন

| ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৯

নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি নিয়ে অনেক জেলায় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কারণ সরকার দলীয় প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি) ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট অনেক প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তালিকায় স্থান পাইনি। আবার নামসর্বস্ব কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। এমনকি সরকারি কলেজও এমপিওভুক্ত হয়েছে। বিএনপির নেতা এবং স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত নেতাদের নামে প্রতিষ্ঠিত বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্ত হয়েছে। জামায়াত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এনজিও প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির তালিকায় রয়েছে। এমপিওভুক্তির তালিকা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়ায় এমপিওভুক্তির নীতিমালা স্থগিতের সিন্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা এম সাইফুর রহমান ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ বেশ কয়েকজন নেতার প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত নেতাদের আত্মীয়-স্বজনের নামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন সাংবাদিকদের বলেছেন, এমপিওর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত সরকারি কলেজটি বাদ দেয়া হবে। বিএনপি-জামায়াত কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্যতার কারণে এমপিও পেয়েছে।

যদিও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ইতোমধ্যে বলেছেন, এমপিভুক্তিতে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ মিথ্যা। কোন রাজনৈতিক বিবেচনা করা হয়নি। তবে শিক্ষাবিদরা স্বাধীনতা বিরোধীদের নামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম পরিবর্তন করে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণের দাবি জানিয়েছেন।

সরকারি কলেজকে এমপিওভুক্তি :

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার শাহজালাল কলেজকে জাতীয়করণ করে গত বছরের ১২ আগস্ট আদেশ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আদেশে বলা হয়েছিল, ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্মীকরণ বিধিমালা-২০১৮’এর আলোকে জেলা ও উপজেলাধীন ২৭১টি কলেজ ৮ আগস্ট হতে সরকারি করা হলো।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠান সরকারি করা হয়েছে। সেই ২৭১ কলেজের মধ্যে ১টি হলো শাহজালাল কলেজ। এবারের এমপিওভুক্তির তালিকায় দেখা যায়, তালিকার ৫১ নম্বরে (ইআইএন ১২৯৪৯২) থাকা শাহজালাল কলেজটির ডিগ্রি স্তরের এমপিওভুক্ত হয়েছে।

এ ব্যাপারে শাহজালাল কলেজের অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক সংবাদকে বলেছেন, ‘যারা তালিকা করেছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন সরকারি হওয়ার পরও আমাদের কলেজের ডিগ্রি শাখা এমপিওভুক্তির তালিকায় যুক্ত হলো কিভাবে। তারা হয়তো ঠিকভাবে তথ্য যাচাই বাছ্ইা করেন নাই। আবার এমনও হতে পারে, একাদশ শ্রেণী পর্যন্ত সরকারি হলো; আর ডিগ্রি স্তর এমপিওভুক্ত হলো।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারের এমপিওভুক্তির তালিকায় স্থান পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, বগুড়া সদরের শহীদ জিয়াউর রহমান টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ, নেত্রকোনার কমলাকান্দা হিলফুল ফুজুল দাখিল মাদ্রাসা, ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার শহীদ জিয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাজী খমির উদ্দিন প্রধান আলিম মাদ্রাসা, বগুড়ার গাবতলীর শহীদ জিয়াউর রহমান গার্লস হাইস্কুল, কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ড. খন্দকার মোশাররফ হোসান হাইস্কুল, পটুয়াখালী সদরের হিলফুল ফুজুল টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার এম সাইফুর রহমান টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ, সাতক্ষীরার তালার শহীদ জিয়াউর রহমান মহাবিদ্যালয়, ঝালকাঠির নলছিটির প্যালেস্টাইন টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বগুড়ার গাবতলীর শহীদ জিয়াউর রহমান হাইস্কুল, কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সোনাকান্দা ড. মোশাররফ হোসান ইসলামিয়া রহমানিয়া দাখিল মাদ্রাসা এবং ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের হিলফুল ফুজুল টেকনিক্যাল ও বিএম কলেজ। হিলফুল ফুজুল জামায়াত ইসলামীর এনজিও হিসেবে পরিচিত।

জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের বাসিন্দ ’৭১-এর শান্তি কমিটির সদস্য খামির উদ্দীন প্রধানের নামে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাটির আলিম স্তর এবার এমপিওভুক্ত হয়েছে। এতে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯৪ সালে চাকলা খামির উদ্দীন দাখিল মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠার এক বছরেই ১৯৯৫ এমপিওভুক্ত হয়। মাদরাসাটি ২০০২ সালে আলিম শাখার একাডেমিক স্বীকৃতি পায়।

পঞ্চগড়ের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল ইসলাম একটি গণমাধ্যমকে বলেন, খামির উদ্দীন শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীল কাছে সরবরাহ করতেন। অনেক টাকা পয়সার মালিক ছিলেন খামির। সে যুদ্ধারাধীদের বিচার শুরুর আগেই মারা যায়। এই এমপিওভুক্তি বাতিল অথবা এর নাম পরিবর্তন করে একজন মুক্তিযোদ্ধার নামে করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায় যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি আলহাজ ঝুনু মিয়ার নামে নামকরণকৃত আলহাজ ঝুনু মিয়া হাইস্কুলের নিম্ন মাধ্যমিক স্তর এমপিওভুক্ত হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজন। ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ঝুনু মিয়ার নামে জামালগঞ্জ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সদরকান্দি গ্রামের আবদুল জলিল একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ঝুনু মিয়াসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এই মামলাটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্তের জন্য পাঠিয়েছিলেন আদালত।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য আকবর হোসেন বলেন, ‘লাল মিয়া একাত্তরে ছিলেন হাওরাঞ্চলের ত্রাস। তার নেতৃত্বাধীন রাজাকার বাহিনী লুটপাট, অগ্নিংযোগ, ধর্ষণ, খুনের অসংখ্য ঘটনা ঘটিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার রাজাকারের নামে প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি দেয়াটা আমাদের জন্য কষ্টের।’

২৩ অক্টোবর প্রকাশিত নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তালিকার প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। প্রায় ৯ বছর পর এবার দুই হাজার ৭৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়।

তালিকা পর্যালোচনা করে জানা গেছে, এমপিওভুক্তির তালিকায় স্থান পায়নি নোয়াখালীর কবিরহাটে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বাবার নামে ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মোশাররফ হোসেন মাধ্যমিক হাইস্কুল, টাঙ্গাইলের ধনবাড়িতে কৃষি মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাকের মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত রেজিয়া কলেজ। তবে ভোলার এমপি আবদুল্লা আল ইসলাম জ্যাকব্রে মা, বাবা, স্ত্রী ও নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত চারটি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। এছাড়া এমপিওভুক্তির দাবিতে আন্দোলন করে আসা শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি ও সম্পাদকের প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্ত হয়নি।

মাদারীপুর জেলায় এমপিওভুক্ত হয়েছে মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠান, যার একটি বিএনপি নেতার প্রতিষ্ঠান। অথচ জামালপুর সদর উপজেলায় প্রায় ১৮টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। কিন্তু ২৩টি উপজেলায় একটি প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্ত হয়নি।

আবার পঞ্চগড়ের বোদায় ঝলইশালশিড়ি ইউনিয়নের নতুন হাট টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজম্যান্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান ১০ বছর আগে স্থাপন হলেও সেটির অস্তিত্ব নেই এখন। বর্তমানে সেই স্থানটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় পরে আছে। তার আশপাশ দিয়ে লাগানো হয়েছে সুপারির বাগান। অথচ এই প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অসঙ্গতিপূর্ণ এমপিও নীতিমালার কারণেই তালিকা প্রকাশে তুগলকি কা- ঘটেছে। এজন্য এখন নীতিমালাটি স্থগিত করার সিন্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন করে নীতিমালা প্রণয়ন করার জন্য কমিটিও গঠন করা হচ্ছে।

বর্তমান নীতিমালায় এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হারে শহর ও মফস্বল এলাকায় ৭০ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। মফস্বল এলাকার জন্য এই হার পরিবর্তন করে ৪০ শতাংশ হতে পারে বলে জানা গেছে।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ইতোমধ্যে বলেছেন, এমপিওভুক্তির বর্তমান নীতিমালাটি স্থগিত করা হবে। এরপর নীতিমালায় সংশোধনী আনার জন্য একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হবে। ওই কমিটি যে নীতিমালা প্রণয়ন করবে সে আলোকে আগামীতে এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।