• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১কার্তিক ১৪২৬, ১৬ সফর ১৪৪১

কারাগারের আদালতে যেতে খালেদার অস্বীকার

খালেদার অনুপস্থিতিতে বিচার চলতে পারে কি না এনিয়ে শুনানি আজ

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচারে কারাগারের মধ্যে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে হাজির হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতকাল অস্থায়ী আদালতে আনতে কারা কর্তৃপক্ষ খালেদা জিয়ার কাছে গেলে উপস্থিত হতে অনিচ্ছুক বলে জানিয়ে দেন কারা কর্তৃপক্ষকে। পরে আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি শেষে খালেদা জিয়ার জামিন বৃদ্ধির ব্যাখ্যা এবং তার অনুপস্থিতিতে মামলার কার্যক্রম চলতে পারে কি না, সে বিষয়ে শুনানির জন্য আজ দিন ধার্য করেন বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আখতারুজ্জামান।

এর আগে এদিন সকাল ১০টার দিকে বিচারক আখতারুজ্জামান তার খাস কামরায় যান। বেলা পৌনে ১১টার দিকে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালত কক্ষে যান। অপর দুই আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খান আসামির কাঠগড়ায় হাজির হলেও খালেদা জিয়া তখনও আসেননি কারাগারে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন। প্রথম দিনের কার্যক্রমে বিএনপির চেয়ারপারসনের পক্ষের আইনজীবী আদালতে অনুপস্থিত থাকলেও এদিন দুজন আইনজীবী মামলার কার্যক্রমে অংশ নেন। শুরুতে এ মামলায় খালেদা জিয়ার জামিনের সময় বাড়ানো ও এই আদালতে মামলার কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া আদালতের কাছে লিখিত আবেদন করেন। আদালত স্থানান্তর নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনেই এটাকে কারাগার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এত ছোট আদালত আমরা চারজন আসলেও বসতে পারছি না। সাংবাদিকসহ অন্য সবাই দাঁড়িয়ে আছে। ডিফেন্সের সবাই আসলে এখানে এত সাফোকেশন হবে, বিচারকাজ চালানো সম্ভব না। তিনি বলেন, এই অবস্থায় এখানে বিচারকাজ চলতে পারে কি-না, এটা সংবিধান পরিপন্থী কি-না সে বিষয়ে আমরা পিটিশনে উল্লেখ করেছি।

এই আদালত বসানো নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং খালেদার চিকিৎসা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি নেতাদের সাক্ষাৎ করার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, বেগম জিয়ার চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। আর এই আদালত করার ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলাপ করা হয়নি। এ অবস্থায় কারাগারের ভেতরে আদালত বসানো যায় কি-না এখন যেহেতু তার কাছে আইনজীবীরা গিয়েছেন, তিনি একটি সিদ্ধান্ত দেবেন। এসময় সাধারণত আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বিচারকের নাম থাকলেও এবারের প্রজ্ঞাপনে তা ছিল না কেন, সেই প্রশ্ন তোলেন সানাউল্লাহ মিয়া। এরপর দেয়া বক্তব্যে জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলার অপর দুই আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খানের পক্ষে এই আদালত ‘আইনসম্মত’ না হওয়ায় এখানে মামলার বিচারিক কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনা না করার আবেদন পড়ে শোনান আইনজীবী আমিনুল ইসলাম।

এভাবে আদালত বসানো সংবিধানের ৩৫(৩) ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ ধারার সাংঘর্ষিক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেআইনিভাবে গঠিত অত্র আদালত ও বিচারিক কার্যক্রম স্থানান্তর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করায় ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় বরাবর একটি আবেদন পেশ করা হয়েছে। এই রূপ অবস্থায় আইনসম্মত আদালত প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত অত্র মামলার কার্যক্রম ন্যায়বিচারের স্বার্থে স্থগিত হওয়া আবশ্যক। তিনি বলেন, আদালত কক্ষটি আনুমানিক ১২ বাই ২৪ ফুট সরু আয়তনের। এবং এই ছোট্ট কক্ষে বিচারকের আসন, আইনজীবীদের বসার স্থান, পাবলিক প্রসিকিউটর, সাক্ষী ও বিচারপ্রার্থীদের বসার স্থানসহ আদালতের স্টাফ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সকলের একত্রে আদালত কক্ষে অবস্থান বিচার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ মোটেই সম্ভবপর নয়।

আদালত কক্ষ সংকীর্ণ হওয়ায় সাফোকেশন ও গরমের কারণে যে কেউ যে কোন সময় মারা যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই আইনজীবী আরও বলেন, এ আদালত গুহার মতো। স্যাঁতসেঁতে অবস্থা। এখানে ঠিকমতো শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া যায় না। যে কোন সময় যে-কারও ‘সাফোকেশন’ হতে পারে। আমিনুল ইসলাম বলেন, গেজেটে বলা হয়েছে নিরাপত্তাজনিত কারণে কারাগার স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বকশীবাজারের আদালত থেকে যতবারই সময় পেছানো হয়েছে, ততবারই বেগম জিয়ার অসুস্থতার কারণে সেটা করা হয়েছিল। নিরাপত্তার বিষয়টি তো একবারও ওঠেনি বা প্রসিকিউশন থেকেও বলা হয়নি। তিনি বলেন, কারাগারে থাকা আসামিকে উপস্থিত করানোর দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষ ও প্রসিকিউশনের। কিন্তু এখানে বেগম জিয়া উপস্থিত নাই। তিনি অনুপস্থিত থাকাবস্থায় কোরাম নন-জুজিস হওয়া সত্ত্বেও বিচার কার্যক্রম চলছে। প্রসিকিউশন সেটা বলার কথা থাকলেও, তারা কিছু বলছে না।

এরপর রাষ্ট্রপক্ষে দেয়া বক্তব্যে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতে বলেন, আইন মেনে এ আদালত গঠিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার সুবিধার জন্য এখানে আদালত বসেছেন। বেগম খালেদা জিয়া ও অন্য আসামিদের আইনজীবীরা এই আদালতকে সংবিধান পরিপন্থী, আইন পরিপন্থী ও অবৈধ বলছেন। আবার তারাই সেখানে দাঁড়িয়ে জামিন আবেদন করছেন। এই আদালত যে কোনো আইনে বৈধ। বৈধ আদালতে দাঁড়িয়ে তারা জামিনের জন্য শুনানি করছেন। কিন্তু বৈধ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছেন না। আদালতের গঠন নিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্যকে ‘আষাঢ়ে গল্প’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, আদালত গঠনের ক্ষেত্রে পাবলিক হওয়ার পাশাপাশি দ্রুত বিচারের কথাও আছে। তারা দ্রুত বিচারের বিষয়ে কোন কথা বলছেন না। দ্রুত বিচারের স্বার্থে এখন যে অবস্থা আছে, সেই অবস্থায়ই আদালতের কার্যক্রম শুরু হোক।

পরে বিচারক আখতারুজ্জামান আদালতে খালেদার হাজির না হওয়া প্রসঙ্গে কারা কর্তৃপক্ষের চিঠির বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়েছে, উনি (খালেদা জিয়া) কোর্টে আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। তার মানে, আসতে অনিচ্ছুক। এরপর বিচারক খালেদার আইনজীবীর কাছে জানতে চান, খালেদা যদি না আসেন তাহলে জামিন শুনানি কীভাবে হবে এবং আর এভাবে আসতে অনিচ্ছুক হলে, কোরাম নন-জুডিস রেখে বিচারকাজ চালানো যাবে কি-না। এর জবাবে সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, বেগম জিয়া যেহেতু কারাগারে আছেন আর আদালত কারাগারের ভেতরে। দুইটাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সে কারণে উনি কেন আসতে পারেননি, কী বলেছেন সেটা আমরা এখনও নিশ্চিত না। আবার উনি যেহেতু আগের দিন বলেছেন অনেক বেশি অসুস্থ। উনার শারীরিক অবস্থা কি, সেটাও তার সঙ্গে দেখা করা ছাড়া বলা সম্ভব না। আর কারাগারে থাকা আসামির অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলতে পারে কি-না সে বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা দিতে পড়াশোনা করার সময় প্রয়োজন বলে আদালতের কাছে আবেদন জানান সানাউল্লাহ মিয়া।

খালেদা অসুস্থতার ওপর তার আইনজীবীদের জোর দেয়ার বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাজল বলেন, বারবার বলা হচ্ছে খালেদা অসুস্থ। ওনারা তো (খালেদার আইনজীবীরা) ওইদিন ছিলেন না। উনি (খালেদা) কিসের অসুস্থ। হুইল চেয়ারে ওনাকে আনা হয়েছে। উনি আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সবাই দেখেছে। খালেদা অনুপস্থিত থাকলেও বিচারকাজ তার আইনি গতিতে চলবে বলে আদালতে মন্তব্য করেন তিনি। উভয়পক্ষের বক্তব্যের পর খালেদার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলবে কি-না এবং এই অবস্থায় জামিন শুনানি হবে কি-না সে বিষয়ে বক্তব্যের জন্য আজ দিন ঠিক করে দেন।

পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, আদালত প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি কাস্টডিতে আছেন, কিন্তু আসতে ইচ্ছুক নন। খালেদা জিয়ার প্রকৃত তথ্য হলো, তিনি গুরুতর অসুস্থ। যার কারণে তিনি আসেন নাই। আদালত ভবন এবং জেলখানা একই জায়গায়, দুইটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কারা কর্তৃপক্ষের কি দুটি মাথা আছে, আদালতের কি দুটি মাথা আছে অন্য কিছু লিখে দিবেন। আর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাজল বলেন, ‘কাস্টডিতে থাকাবস্থায়, তাকে হাজির করার দায়িত্ব হচ্ছে জেল কর্তৃপক্ষের। জেল কর্তৃপক্ষ তাকে হাজির করবেন, মাননীয় আদালত তার বিচার করবেন। এক্ষেত্রে খালেদা জিয়া যদি না আসেন, তিনি যদি অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, সেক্ষেত্রে তারা অনুপস্থিতিটাকে উপস্থিতি ধরে নিয়ে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করব। আদালত বলেছেন, আপনারা একদিকে জামিন চাচ্ছেন, আবার জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধির কথা বলছেন, আবার আপনারা সেখানে আসছেন না, সেক্ষেত্রে কীভাবে আমি জামিন বর্ধিত করব, সে ব্যাপারে আপনারা আইনগত ব্যাখ্যা দেন। উনারা আইনগত ব্যাখ্যা আজ দেবেন।

প্রসঙ্গত, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় এ মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এ মামলার অন্য আসামিরা হচ্ছেন, খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীর তখনকার একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান। মামলার আগে থেকেই হারিছ চৌধুরী পলাতক রয়েছেন।

মামলাটির কার্যক্রম এতদিন রাজধানীর বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে চলে আসছিল। এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি অপর আরেকটি মামলা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেন আদালত। রায়ের পর থেকে খালেদা জিয়াকে রাজধানীর পুরনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে। পরে গত ৪ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ আদালতের কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয় সাবেক এই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের ৭ নম্বর কক্ষে। গত ৫ সেপ্টেম্বর প্রথম সেখানে আদালত বসে। ওইদিন খালেদা জিয়া আদালতে গিয়ে বিচারককে বলেন, তিনি অসুস্থ। বারবার তিনি এ আদালতে আসতে পারবেন না। যতদিন ইচ্ছা সাজা দিয়ে দিন। গতকাল (১২ সেপ্টেম্বর) ধার্য তারিখে আবার সেখানে আদালত বসে। আদালত ঘিরে নাজিমউদ্দিন রোড এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। আদালত কক্ষেও অনেক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি দেখা যায়।