• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১ মহররম ১৪৪২, ০৩ আশ্বিন ১৪২৭

করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব, বাজারে আসতে সময় লাগবে 

১০৮টি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে

সংবাদ :
  • ইমদাদুল হাসান রাতুল

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২০

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন (প্রতিষেধক) আবিষ্কারের চেষ্টা করছে বিভিন্ন দেশ। সারা বিশ্বের গবেষকেরা হন?্যে হয়ে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা ব?্যবস্থার সন্ধান করছেন। এ মুহূর্তে সারা বিশ্বই কোন দেশ আগে করোনার ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারে, সে অপেক্ষায় রয়েছে। এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে অ্যন্টিবডি তৈরির কাজও চলছে। কোভিড-১৯ রোগ প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে ১০৮টি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন (প্রতিষেধক) তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ইতোমধ্যেই আটটিকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের (মানবদেহে প্রয়োগ) অনুমতিও দেয়া হয়েছে। এরইমধ্যে ভ্যাকসিন আবিষ্কারে সফল হওয়ার দাবি জানিয়েছে ইতালি। যদিও ডব্লি­উএইচও এ নিয়ে কোন সিদ্ধান্ত দেয়নি। বাজারে আসতে কিছুটা বিলম্ব হলেও করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারে বিশ্ব যে দ্বারপ্রান্তে রয়েছে তা বলাই যায়। 

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়াতে থাকে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। এর পরপরই বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের কাজে লেগে যায়। এরইমধ্যে যুক্তরাজ্য একটি ভ্যাকসিন মানবদেহে প্রযােগও করেছে।  এছাড?াও যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি কানাডা ও চীনসহ বেশ কযকেটি দেশ ভ্যাকসিন

আবিষ্কারের কথা জানিযেেছ।  গতকাল ইতালি সফল ব্যক্তির আবিষ্কারের দাবি করেছে। এছাডা ইসরাইলসহ বেশ কয?েকটি দেশ অ্যান্টিবডি আবিষ্কারের দাবি করেছে। দেশগুলো অবশ্য বলেছে ভ্যাকসিন বাজারে আসতে বেশ সময? লাগবে। সবগুলো দেশ সঠিক ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দাবি করলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো কোনো মত দেয?নি। 

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহর থেকে প্রাণঘাতী করোনা ছড়ায়। ভাইরাসটির কারণে।এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৮ জন। এছাড়া এ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে ৩৭ লাখ ২৭ হাজার ৮০২ জনের শরীরে। এরইমধ্যে ২১০টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়েছে করোনা ভাইরাস। আক্রান্তদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১২ লাখ ৪২ হাজার ৩৪৭ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ২২ লাখ ২৭ হাজার ১১৭ জন। এদের মধ্যে ২১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৬৯ জনের শরীরে মৃদু সংক্রমণ থাকলেও ৪৯ হাজার ২৪৮ জনের অবস্থা গুরুতর।বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ৯২৯ জনের শরীরে। এদের মধ্যে মারা গেছেন ১৮৩ জন এবং সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন ১৪০৩ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৯ হাজার ৩৪৩ জন।

ইতালীয় গবেষকরা বলছেন, ইঁদুরের দেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে দেখা গেছে, তা করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরিতে সক্ষম। ওই অ্যান্টিবডি মানবকোষেও করোনাভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হবে। গ্রীষ্ম মৌসুম শেষে এই ভ্যাকসিন মানুষের দেহে প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করছেন তারা।

ইতালীয় ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা টাকিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লুইগি আরিসিচিও জানিয়েছেন, বিজ্ঞানীদের তৈরি ভ্যাকসিন মানুষের শরীরে যে কার্যকর হবে, তার সংকেত মিলেছে স্পালানজানি হাসপাতালেই। তিনি মনে করেন, এটিই বিশ্বের প্রথম ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন (যে ভ্যাকসিন সরকারি ছাড়পত্রের  অপেক্ষায়), যা মানুষের শরীর থেকে করোনাভাইরাসকে দূরে রাখতে সক্ষম। এ মুহূর্তে তাদের গবেষণা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তাদেরকে প্রাযুক্তিক সহায়তা দিচ্ছে মার্কিন সংস্থা লিনারেক্স। করোনার সঙ্গে লড়ছে সবাই। আমরা কোন প্রতিযোগিতায় নেই; বরং সবার সহায়তা পেলেই লড়াই সার্থক হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইসরায়েলে গবেষকেরা করোনাভাইরাসের একটি মূল অ্যান্টিবডি পৃথক করতে সক্ষম হয়েছেন। দেশটির প্রধান জৈব গবেষণাগারে এ গবেষণা করা হয় বলে দাবি করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাফতালি বেনেট। তিনি এ পদক্ষেপকে করোনাভাইরাস মহামারি রুখতে সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন বলে গত উল্লেখ করেন। বেনেটের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মনোক্লোনাল নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি নামের এ অ্যান্টিবডি তৈরি করেছে ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল রিসার্চ (আইআইবিআর)। এ অ্যান্টিবডি বাহকের শরীরের ভেতর থেকে করোনাভাইরাস সৃষ্টিকারী ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে। আমি বায়োলজিক্যাল ইনস্টিটিউট কর্মীদের জন্য গর্বিত, যারা একটি বড় অগ্রগতি অর্জন করেছেন। অ্যান্টিবডি বা প্যাসিভ ভ্যাকসিন ভাইরাসকে আক্রমণ করে এবং এটি দেহের মধ্যেই একে নিস্ক্রিয় করে দেয়।

আইআইবিআর পরিচালক সুমেল সাপিরা বলেন, তাদের অ্যান্টিবডি ফর্মূলা প্যাটেন্ট করানো হয়েছে। কোনো আন্তর্জাতিক উৎপাদক অনুমতি সাপেক্ষে তা উৎপাদন করতে পারবেন।

ইসরাইলে আইআইবিআর করোনভাইরাসটির চিকিৎসা এবং ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট শ্বাসযন্ত্রের রোগ, কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের রক্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ নানা কাজ করছে। সায়েন্স ডাইরেক্ট সাময়িকীর মে সংখ্যায় বলা হয়, এ ধরনের নমুনার ক্ষেত্রে সেরে ওঠা ব্যক্তির শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এগুলো সম্ভাব্য নিরাময়ের চাবিকাঠি হিসাবে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। আইআইবিআর যে অ্যান্টিবডির সন্ধান পেয়েছে, তা মনোক্লোনাল, অর্থাৎ, এটি একটি একক পুনরুদ্ধারকৃত কোষ থেকে নেয়া হয়েছিল এবং এভাবে চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরির ক্ষেত্রে আরও সম্ভাব্য শক্তিশালী উপায়। অন্য যেসব জায়গায় অ্যান্টিবডি থেকে চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলো পলিক্লোনাল, যা একাধিক কোষ থেকে তৈরি অ্যান্টিবডি ব্যবহার করে।

গত ২৮ এপ্রিল বিশ্ব সাহায্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) চলমান পরীক্ষামূলক কোভিড-১৯ চিকিৎসার তালিকা দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ৩৩টি সুনির্দিষ্ট ধরনের এবং ‘অন্যান্য’ ওষুধ ব্যবহার করে চিকিৎসার কথা আছে। এগুলোতে সব মিলিয়ে একক ওষুধ বা ওষুধের সমন্বয়ে দুইশ’র কাছাকাছি ধারার চিকিৎসা চলছে। তালিকায় প্লাজমা ও স্টেম সেলসহ অনেকগুলো পরীক্ষামূলক থেরাপির কথাও আছে। ডব্লিউএইচও অবশ্য এখন পর্যন্ত কোন ওষুধ বা চিকিৎসাকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে সংস্থাটি এবং এর সহযোগীরা কয়েকটি ওষুধ ব্যবহার করে চারটি চিকিৎসাপদ্ধতি বা ধারা রোগীদের সম্মতিক্রমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার (ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল) একটি উদ্যোগ নিয়েছে। 

করোনার সম্ভাব্য একটি ভ্যাকসিন যৌথভাবে তৈরি করছে জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বায়োটেক কোম্পানি। জার্মানিতে তা মানবদেহে প্রয়োগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মানবদেহে পুশ করা হবে আগামী সপ্তাহে। জার্মান কোম্পানি বায়োএনটেক জানিয়েছে, এই বছরের শেষে ভ্যাকসিনটি বাজারে আসবে। জার্মান ফার্মাসিটিউকাল কোম্পানি বায়োএনটেক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অপর কোম্পানি ফাইজার সম্ভাব্য ওই ভ্যাকসিন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই যৌথভাবে তাদের গবেষণা চালাচ্ছে। বিশ্বে এখন পর্যন্ত করোনার সম্ভাব্য যে ৮টি ভ্যাকসিন মানবদেহে প্রয়োগের অনুমোদন পেয়েছে তার মধ্যে এটি অন্যতম।

জার্মান কোম্পানি বায়োএনটেক এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) উগুর সাহিন  বলেছেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষে অনুমোদন পেলে ২০২০ সালের শেষ দিকে ভ্যাকসিনটির কয়েক লাখ ডোজ উৎপাদন করতে পারবে তারা। ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট কোন মহামারী থেকে রক্ষায় ১৮ মাসের মধ্যে ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়ার চল বিশ্বে থাকলেও বৈশ্বিক এই মহামারীর কারণে ঐতিহাসিক দ্রুততার সঙ্গে আরও অনেক কম সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়া সম্ভব।

যেকোন মহামারী পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিনের (প্রতিষেধক টিকা) উপকারিতা অপরিসীম। তাই বর্তমান এই মহামারি পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিনের অনুমোদন অতীতে চলে আসা পদ্ধতির চেয়ে আরও ভিন্নভাবে হতে পারে। আমাদের ভিন্নপথে হাঁটতে হবে।

বায়োএনটেক সিইও তাদের তৈরি এই ভ্যাকসিনের সম্ভাবনা নিয়ে বলেন ‘এই ভ্যাকসিন যে কাজ করছে আমরা তা দেখতে পাচ্ছি। এমনকি কম মাত্রায় প্রয়োগ করেও এই ভ্যাকসিন শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বিভিন্ন প্রাণীর দেহে আমরা এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেছি। তা বেশ কার্যকরীও হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, মানুষের ক্ষেত্রেও এই ভ্যাকসিন একইরকমভাবে কাজ করবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লি­উএইচও) তাদের ওয়েবসাইটে একটি নথিতে জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে সম্ভ্যাব্য এই ১০৮টি ভ্যাকসিন তৈরির কাজ 

 মধ্যে ৮টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অর্থাৎ মানবদেহে প্রয়োগের অনুমোদন পেয়েছে। তবে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ১০৪টি। গবেষণাধীন সম্ভ্যাব্য ভ্যাকসিনের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে, জাপানের ইউনিভার্সিটি অব টোকিও, তুলানে বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা এবং দ্য ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ।  ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য অনুমোদন পাওয়া ৮টি ভ্যাকসিনের মধ্যে ৫টি চীনের। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে একটি করে ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে। অপরটি যৌথভাবে তৈরির কাজ করছে জার্মান কোম্পানি বায়োএনটেকে ও যুক্তরাষ্ট্রের বায়োটেক কোম্পানি পিজফার। 

গত ১৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমবারের মতো মানবদেহে পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর আরও ৭টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা বায়োটেক কোম্পানি তাদের তৈরি কোভিড-১৯ এর সম্ভ্যাব্য ভ্যাকসিন মানবদেহে প্রয়োগ করে। পরীক্ষা-নিরিক্ষা শেষে কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তা বাজারে আসবে।