• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১ মহররম ১৪৪২, ০৩ আশ্বিন ১৪২৭

করোনার নমুনা পরীক্ষায় সমন্বয়হীনতা ও ভোগান্তি য় হেল্পলাইনে ফোন করেও সহযোগিতা পাওয়া যায় না য় রয়েছে কিট সংকট নিজস্

হেল্পলাইনে ফোন করেও সহযোগিতা পাওয়া যায় না রয়েছে কিট সংকট

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , রোববার, ০৩ মে ২০২০

image

প্রতিদিনই যারা করোনা রোগীর তথ্য জানাতে আপনাদের-আমাদের সামনে নিজেদের উপস্থাপন করতে আসেন আইডিসিআর নামধারী এই সংস্থাটি রাখার বা জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ আমি নিজে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আলমগীর সাহেবকে জানালে তিনি বলেন, সহযোগিতা করার সুযোগ নেই। সংস্থার হেল্পলাইনে কয়েক দফা যোগাযোগ করার পর তার বললো তারা কিছুই করতে পারবে না। তাহলে আমার প্রশ্ন কেন এই সহযোগিতা করার জন্য আকুতি করে থাকি। ০১৪০১১৮৪৫৬০ নম্বরে ২৩ এপ্রিল সব তথ্য দেয়ার পরও কোন পদক্ষেপ নেয়নি। করোনায় আক্রান্ত হওয়া সাংবাদিক শাহে নেওয়াজ নিজের করোনা টেস্টের পরীক্ষার ক্ষেত্রে ভোগান্তির কথা তুলে ধরে নিজের সহকর্মীদের উদ্দেশে একথা বলেছেন। লেখাটি রীতিমতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কোভিড-১৯ পরীক্ষায় ও নমুনা সংগ্রহে চলছে চরম অব্যবস্থাপনা। পদে পদে মানুষকে পড়তে হচ্ছে না ভোগান্তিতে। কখনো ফোন করে হেল্পলাইনে কাউকে পাওয়া যায়, আর ফোন ধরলেও নমুনা সংগ্রহের বিষয়ে সঠিক কোন তথ্য দেন না আইইডিসিআর। আইইডিসিআরসহ রাজধানীসহ সারাদেশে নমুনা পরীক্ষার জন্য যেসব হাসপাতাল রয়েছে সেগুলোতে রয়েছে কিট সংকট এবং চরম অব্যবস্থাপনা। নমুনার ফলাফল পেতেও লেগে যায় কয়েকদিন। সূত্র জানায়, নমুনা সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত টেকনোলজিস্ট নেই । কোন কোন হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহ এবং তা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া দুই কাজটি করতে হয় একজন টেকনোলজিস্টকে। এমন অব্যবস্থাপনায় দিনে দিনে করোনা সংক্রমণ যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। করোনা টেস্ট ব্যাপকভাবে না হওয়ার কারণে আক্রান্ত অনেকেই জানতে পারছে না যে তার কোভিড-১৯ সংক্রমণ রয়েছে। অথচ ওই ব্যক্তি নিজের অজান্তে বাসা থেকে শুরু করে বাজার, অফিস আদালত সবদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর ভাইরাস অন্যদের মধ্যে ছড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব সেলিম মোল্লা টেলিফোনে সংবাদকে জানান, করোনাভাইরাসের সংখ্যা বাড়লেও পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহের মূল দায়িত্ব পালনকারী মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সংখ্যা বাড়েনি। বর্তমানে সারাদেশে সরকারিভাবে ৩ হাজার টেকনোলজিস্ট কাজ করছে। করোনা পরিস্থিতিতে এতো কম সংখ্যক টেকনোলজিস্ট দিয়ে এতো বড় জনবলের করোনা সংক্রমণ পরীক্ষা নমুনা সংগ্রহ বা পরীক্ষা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তিনি আরো, সম্প্রতি সরকার ২ হাজার চিকিৎসক ও ৬ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছে করোনা সংক্রমণের পরিস্থিতি বিবেচনা করে। অথচ রোগের যারা নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার দায়িত্বে থাকবেন সেই টেকনোলজিস্ট একজনও নিয়োগ দেয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে টেকনোলজিস্ট এবং যন্ত্রপাতির সংখ্যা বাড়ানো উচিত। বর্তমানে ১৫ হাজার ডিপ্লোমা টেকোলজিস্ট বেকার রয়েছে। সবমিলিয়ে ৩০ হাজার টেকনোলজিস্ট রয়েছে যারা বেকার আছে। যোগ্য এসব টেকনোলিজস্টদের করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা দ্রুত করার জন্য নিয়োগ দেয়া দরকার। তাহলে সমস্যার সমাধান হবে।

কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়েছে এমন কয়েকজন ব্যক্তি জানান, করোনার লক্ষণ দেখা দেয়ার পর নমুনা পরীক্ষার জন্য তারা আইইডিসিআরে যোগাযোগ করেছেন। ১০ থেকে ১২ বার যোগাযোগ করেও অনেকে নমুনা দিতে পারেননি। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্বদ্যালয় হাসপাতালসহ অন্য হাসপাতালগুলোতে নমুনা দিতে গিয়েও করোনার লক্ষণে আক্রান্ত রোগীদের চরম হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়েছে। পরীক্ষার জন্য টাকা জমা দেয়া, রসিদ সংগ্রহ এবং নমুনা দেয়াসহ প্রতিটি জায়গায় দীর্ঘ লাইন ধরতে হচ্ছে। ভোর ৬টার সময় এসে লাইনে দাড়িয়েও অনেক সময় নমুনা দেয়া যায় না। এছাড়া বাড়ি বাড়ি গিয়ে আইইডিসিআর থেকে নমুনা সংগ্রহের যে কথা বলা হয়েছে সেটি রীতিমতো সোনার হরিণ। অনেকেই নমুনা দিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা টেলিফোনে সংবাদকে জানান, হাসপাতালগুলোতে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। আইইডিসিআারে হটলাইনে সারাদেশ থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ফোন করে। লাইনগুলো এ কারণে ব্যস্ত থাকে। ফলে টেলিফোনে পেতে কিছুটা সময় লাগে। তবে ভোগান্তি কমাতে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ হাজার ৮২৭ জনের নমুনা সংগ্রহ করা ও পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৭৬ হাজার ৬৬ জনের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে আসা কয়েকজন ব্যক্তি বলেন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫শ’ ব্যক্তি আসেন করোনা নমুনা দেয়ার জন্য। সকাল ৬টা থেকে এসে অনেকে লাইনে দাঁড়ান। কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নমুনা দিতে পারছেন না তারা। আবার অনেকেই জানেন না কিভাবে কোথায় করোনা নমুনা জমা দিতে হয়। চরম অব্যস্থাপনা এখানে। একই অবস্থা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারস্বীকৃত করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতে।

সম্প্রতি ৩৯ জন সাংবাদিকের মধ্যে করোনার লক্ষণ দেখা দেয়। নমুনা পরীক্ষার জন্য আইইডিসিআরে হেল্প লাইনে একাধিকবার ফোন করার পরও নমুনা দিতে পারেননি। আইইডিসিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তার অসহযোগিতা করছেন। ১৫ থেকে ২০ বার ফোন দিয়েও আইইডিসিআরের হেল্প লাইনে ঢুকতে পারেননি ওই সাংবাদিক। সম্প্রতি করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান দৈনিক সময়ের আলোর প্রধান প্রতিবেদক খোকন। তিনি পরীক্ষার নমুনা হাতে পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি যে তার করোনা পজেটিভ হয়েছে। শুধু তাই নয় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ঢাকা দক্ষিন সিটি করপোরেশনের এক কর্তকর্তা একাধিকবার চেষ্টা করেও নমুনা পরীক্ষা করাতে পারেননি। আইইডিসিআরে বার বার চেষ্টার পরও কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। পরে করোনা লক্ষণ নিয়ে ওই কর্মকর্তা মারা যাওয়ার পর তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার পর তার করোনা বিষয়টি ধরা পড়ে। এর আগে করোনা আক্রান্ত হয়ে দৈনিক বাংলাদেশের খবর পত্রিকার সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার ইমদাদুল হক বেশ কিছুদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বর্তমানে তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ওই সাংবাদিকের মধ্যে যখন করোনা লক্ষণ দেখা দেয় তখন তিনি আইইডিসিআরে একাধিকবার যোযোগ করলেও কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান করোনা পরীক্ষার জন্য। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে অন্য পরীক্ষা দিলেও করোনার পরীক্ষা দেননি। শেষ পর্যন্ত নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেন। এরপর একজন সাংবাদিক নেতার ডাক্তার মেয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করার পর তার সহযোগিতায় করোনা পরীক্ষার জন্য সাম্পল দিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিন দিন পর তিনি জানতে পারেন তার করোনা পজেটিভ হয়েছে। কিন্তু তিনি অসুস্থ ছিলেন আরও ১৫ দিন আগে থেকে। করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কিনা নিশ্চিত না হতে পারার কারণে ১৫ দিন তিনি বাইরে ঘোরাফেরা করেছেন। যদিও তিনি মাস্ক ব্যবহার করেছেন।

চিকিসৎকরা জানান, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় নমুনা পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই কাজটিতে যাদের ভূমিকা থাকে, সেই মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষায় হিমশিম অবস্থা এই সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চাহিদাপত্র পেয়ে এরই মধ্যে দুই হাজার চিকিৎসক ও পাঁচ হাজারের বেশি নার্স নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকারি কর্ম কমিশন-পিএসসি। কিন্তুও সেই চাহিদাপত্রেও নেই মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কথা।

নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকা টেকনোলজিস্টদের ভাষ্য, লোকবল স্বল্পতায় তাদের একেকজনের ঘাড়ে অনেক কাজ জমছে। বাংলাদেশ এখনও কোভিড-১৯ রোগের নমুনা পরীক্ষায় প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পিছিয়ে আছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্রটি ভিন্ন। গত ২১ মার্চের হিসাব অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীনে বর্তমানে ২৫ হাজার ৬১৫ জন চিকিৎসক কাজ করছেন। ডব্লিউএইচওর মানদ- অনুযায়ী, এক্ষেত্রে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদের সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল এক লাখ ২৮ হাজার ৭৫টি। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতরে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদই আছে সাত হাজার ৯২০টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন আরও কম পাঁচ হাজার ১৮৪ জন। প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য শূন্য দশমিক ৩২ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কাজ করছেন। আর ল্যাব টেকনোলজিস্টের দুই হাজার ১৮২টি পদের মধ্যে এক হাজার ৪১৭ জন কর্মরত আছেন। নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজটি করেন ল্যাব টেকনোলজিস্টরাই।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালায়েয় সূত্র জানায়, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন জেলা থেকে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের প্রেষণে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে আনা হয়। ফলে জেলাগুলোয় নমুনা সংগ্রহ করতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা এমনকি নারায়ণগঞ্জেও অনেকে অভিযোগ করেছেন, নমুনা সংগ্রহের জন্য হটলাইনে ফোনের পর ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায় না। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের পর সবচেয়ে আক্রান্তের এলাকা গাজীপুরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আছেন ১৭ জন। এর মধ্যে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে চারজন এবং হাসপাতালে সাতজন। প্রত্যেকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন করে এবং টঙ্গীতে ২৫০ শয্যা হাসপাতালে একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোটামুটি কাজ চললেও ঝামেলায় আছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মীরা।