• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২১ জিলহজ ১৪৪১, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭

জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী

করোনাযুদ্ধে সবাই ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন

গৃহহীন ও ভূমিহীনরা ৬ মাস বিনামূল্যে খাবার পাবেন রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানে ৫ হাজার কোটি টাকা দেয়া হবে নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তায় বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান

    সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
  • | ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২০

image

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেয়া করোনাভাইরাসের প্রকোপ মোকাবিলা’ বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করে, এ যুদ্ধে দেশবাসীকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বীর বাঙালি নানা দুর্যোগ-সংকট সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করেছে। আমরা সবার প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হব, ইনশাআল্লাহ। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সবাই যার যার ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন। গতকাল সন্ধ্যায় ‘স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী ভাষণে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশ ও জাতির সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনাও দেন। ভাষণটি সরকারি, বেসরকারি সব টেলিভিশন ও রেডিওতে একযোগে প্রচারিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গোটা বিশ্ব এখন বিপর্যস্ত। আজ সমগ্র বিশ্ব এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছে। এ ভাইরাস জনস্বাস্থ্যসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক থাবা বসাতে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা আভাস দিচ্ছেন। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিরলস কাজের মধ্য দিয়ে যখন আমরা তার ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, এমন সময় আমাদের ওপরও এই আঘাত আসতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার মানুষকে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা। যেকোন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমাদের সরকার প্রস্তুত রয়েছে। আমরা জনগণের সরকার। সব সময়ই আমরা জনগণের পাশে আছি। আমি নিজে সর্বক্ষণ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। নিম্নআয়ের ব্যক্তিদের ‘ঘরে-ফেরা’ কর্মসূচির আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা প্রদান করা হবে। গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভাসানচরে ১ লাখ মানুষের থাকার ও কর্মসংস্থান উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কেউ যেতে চাইলে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বিনামূল্যে ভিজিডি, ভিজিএফ এবং ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। একইভাবে বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সেবা ও দেয়া হচ্ছে।

নিম্ন-আয়ের মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি বাণিজ্যে আঘাত আসতে পারে। এই আঘাত মোকাবিলায় আমরা কিছু আপদকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য আমি ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছি। এ তহবিলের অর্থ দ্বারা কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে। এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ব্যবসাবান্ধব বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী জুন মাস পর্যন্ত কোন গ্রাহককে ঋণখেলাপি না করার ঘোষণা দিয়েছে। রপ্তানি আয় আদায়ের সময়সীমা ২ মাস থেকে বৃদ্ধি করে ৬ মাস করা হয়েছে। একইভাবে আমদানি ব্যয় মেটানোর সময়সীমা ৪ মাস থেকে বৃদ্ধি করে ৬ মাস করা হয়েছে। মোবাইলে ব্যাংকিং-এ আর্থিক লেনদেনের সীমা বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি এবং গ্যাস বিল পরিশোধের সময়সীমা সারচার্জ বা জরিমানা ছাড়া জুন মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এনজিওগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধ সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে। ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের প্রাক্কালে দেশবাসী ও বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। ভাষণে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহিদ এবং ২ লাখ নির্যাতিত মা-বোনদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব বিদেশি রাষ্ট্র এবং জনগণ সহযোগিতা করেছিলেন, তাদেরও তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার শিকার সব শহিদদের এবং পাঁচত্তরের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা বিরোধীদের ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের শিকার বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেলসহ শহীদ হওয়া বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অন্য সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের কথাও স্মরণ করেন।

এবারের (২০২০) স্বাধীনতা দিবস এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে উদযাপিত হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে বলেন, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গোটা বিশ্ব এখন বিপর্যস্ত। ধনী বা দরিদ্র, উন্নত বা উন্নয়নশীল, ছোট বা বড় - সব দেশই আজ কমবেশি নভেল করোনা নামক এক ভয়ঙ্কর ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশও এ সংক্রমণ থেকে মুক্ত নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে আমরা এবারের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ভিন্নভাবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জনসমাগম হয় এমন ধরনের সব অনুষ্ঠানের আয়োজন থেকে সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনসহ সব জেলায় শিশু সমাবেশ ইতোমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই কারণে আমরা মুজিববর্ষের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জনসমাগম না করে টেলিভিশনের মাধ্যমে সম্প্রচার করেছি।

দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের স্বাধীনতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রাম এবং বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার ফসল। ১৯৪৮-৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র নির্বাচন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬-দফা, ১১-দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০’র নির্বাচনের পথ পেরিয়ে আমরা উপনীত হই ৭১’র ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনাতর সংগ্রাম। জয় বাংলা’। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমগ্র জাতি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে। বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম স্তব্ধ করে দিতে ২৫-এ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অতর্কিত হত্যা শুরু করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি সামরিক শাসক তাকে বন্দী করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনে। পাকিস্তানের জেলে ১০ মাস বন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে জাতির পিতা ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন। শুরু করেন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন। স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছর হাতে সময় পেয়েছিলেন তিনি। প্রায় ১ কোটি শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা, শহীদ পরিবার, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা, নির্যাতিত মা-বোনদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, তাদের প্রতিষ্ঠিত করা সব কাজই তিনি করেছিলেন এই সাড়ে তিন বছরে। জাতির পিতা বলতেন, ‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা বাংলার মানুষ যেন অন্ন পায়, বস্ত্র পায়, উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।’ তিনি যখন দেশ পুনর্গঠনের কাজে নিমগ্ন, ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকরা তাকে পরিবারের ১৮ জন সদস্যসহ হত্যা করে। আমরা দু’বোন বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যাই।