• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ মহররম ১৪৪২, ১১ আশ্বিন ১৪২৭

করোনা চিকিৎসায় আইসিইউ সংকট

বিশেষজ্ঞ দরকার ৮০০ জন, আছে ৫০

সংবাদ :
  • বাকী বিল্লাহ

| ঢাকা , সোমবার, ১৮ মে ২০২০

image

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ বিশেষজ্ঞ সংকট চলছে। অপরদিকে আইসিইউ গুলোতে অক্সিজেনের স্বল্পতা রয়েছে। ফলে করোনা রোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসায় সমস্যা হচ্ছে। আইসিইউতে সিট পাওয়া এখন সোনার হরিণ হয়ে ওঠেছে। বিশেষজ্ঞের অভাবে মৃত্যুর হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অপরদিকে বাংলাদেশ ক্রিটিক্যাল কেয়ার সোসাইটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, করোনা রোগীদের চিকিৎসা আইসিইউ ও অ্যানেসথেসিয়ার চিকিৎসকরা কাজ করেন। বিশেষজ্ঞ সংকট রয়েছে। তাদের মতে, ৫০০ আইসিইউ ও অ্যানসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের দরকার। এখন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ও আনারি ডাক্তার দিয়ে আইসিইউ চালানো হচ্ছে। আইসিইউ চালানোর জন্য জরুরিভিত্তিতে ডাক্তার নিয়োগ দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে ক্রিটিক্যাল কেয়ার সোসাইটি।

একজন সিনিয়র আইসিইউ বিশেষজ্ঞ বলেন, রাজধানীর উত্তরা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে প্রথম থেকে করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ওই হাসপাতালে আইসিইউ মেডিসিন ইউনিটে সিট আছে ২৬টি। চলে মাত্র ১০টা। অন্যগুলো আইসিইউ বিশেষজ্ঞের অভাবে ঠিক মতো চালানো যাচ্ছে না। সেখানে বিশেষজ্ঞ আছে ১১ জন। নতুন করে ৮ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। অন্য সিটগুলো চালানোর চেষ্টা চলছে। সেখানে এখন ১৯ জন ডাক্তার থাকলেও ২৬টি বেডের জন্য দরকার কমপক্ষে ৫০ জন।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে এখন আইসিইউ বেড চলছে ১০টি। বিশেষজ্ঞ আছেন ৮ জন। এরমধ্যে একজন অপারেশন থিয়েটারে কাজ করেন। ২ জন আইসিইউতে ডিউটি করেন। সেখানে প্রস্তাবিত আইসিইউ সিট আছে ২০টি। এ ২০টি সিট চালাতে কমপক্ষে ৪০ জন চিকিৎসক দরকার। কুর্মিটোলা জেনালের হাসপাতালে আইসিইউ বেড ২২টি। চলে ১০টি। বিশেষজ্ঞ আছেন ১৩ থেকে ১৪ জন। আর ২২ বেড চালাতে কমপক্ষে ৪০ জন বিশেষজ্ঞ দরকার। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার জন্য বার্ন ইউনিটে আইসিইউ আছে ১০টি। আরও অনেক দরকার বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।

ঢাকা মহানগর হাসপাতালে আইসিইউ ৫টি ও লালকুঠি হাসপাতালে আইসিইউ ১০টির চালু করার কথা থাকলেও এখনও হয়নি। কমলাপুর রেলওয়ে হাসপাতালে ৫টি আইসিইউ চালু করার কথা থাকলেও এখনও হয়নি।

আইসিইউ সিট ও ইউনিট বাড়ানোর জন্য সরকার সম্প্রতি উচ্চ পর্যায়ের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটির একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, আইসিইউর ৫শ’ বেড চালাতে দরকার কমপক্ষে ৮শ’ আইসিইউ বিশেষজ্ঞ। তারমধ্যে আছে ৫০ জন। করোনা চিকিৎসার এখনও আইসিইউ বেড আছে ৩শ’র কিছু বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেন্টাল অক্সিজেন সিস্টেম নেই। লিকুইড সিলিন্ডার অক্সিজেন দিয়ে কাজ চলছে। আর মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসার জন্য একটি আইসিইউ বেডের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ দরকার । তাকে রোগীর অবস্থা বুঝে মেশিন চালাতে হয়। প্রতি মুহূর্তে মেশিনের পাশে থাকতে হবে। করোনা চিকিৎসার ৩০টি হাসপাতালে ১০টি করে গড়ে বেড থাকলে প্রতি ১০টি বেডের জন্য ২০ জন করে ধরলেও ২শ’ আইসিইউ বিশেষজ্ঞ দরকার। এর নরমালি ডিউটি ডাক্তার দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। নতুন ও পুরাতন মিলে এখন ৩২০টি আইসিইউ বেড আছে। সেই অনুসারে বিশেষজ্ঞ নেই। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা বলছেন, ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, চেষ্টা করছে। বিশেষজ্ঞ পদায়ন করে আইসিইউর অন্য সিটগুলো চালু করার চেষ্টা অব্যাহত আছে।

আইসিইউ বিশেষজ্ঞরা জানান, যে জনবল আছে তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গিয়ে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১০ বেডের আইসিইউ তিন শিফটে চালাতে কমপক্ষে ৮ জন করে হলেও ২৪ জন দরকার। তারা টানা ১০ দিন ডিউটি করার পর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী তাদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন ও ৭ দিন বিশ্রাম এরপর আবার ডিউটি করতে হচ্ছে। করোনা চিকিৎসায় আইসিইউ ইউনিটে নরমালি ৮ থেকে ১০ জন ডিউটি করতে হচ্ছে। সারা বাংলাদেশে করোনা চিকিৎসার হাসপাতালগুলোতে ৩শ’ পুরনো সিট। এক জায়গার বিশেষজ্ঞ আরেক জায়গায় নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এজন্য জরুরিভিত্তিতে আইসিইউ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেয়া দরকার। এখনও বেকার আছে ৫শ’। তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে। আর যারা অবসরে গেছেন তাদের এ মহামারীর সময় মুমূর্ষু রোগীদের সেবায় কাজে লাগানো যায় বলে বিশেষজ্ঞ মতামত দেন।

আইসিইউ বিশেষজ্ঞ কমিটির একজন কর্মকর্তা বলেন, করোনা রোগীদের জন্য নতুন করে ১২০টি সিট বিভিন্ন হাসপাতালে দেয়া হয়েছে। আর বাড়ানো সম্ভব হয়নি। আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ৫ ভাগ রোগীর আইসিইউ সিট দরকার। সে অনুপাতে সিট নেই। ভেন্টিলেটার ও অন্য যন্ত্রপাতি এবং টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে।

আইসিইউ বিশেষজ্ঞ কমিটির একজন বলেন, এখন সারাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট খোলা হচ্ছে। তারমধ্যে কুয়েক মৈত্রী হাসপাতাল, মুগদা হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ কিছু হাসপাতালে আইসিইউ সিট আছে। এরমধ্যে কোন কোন হাসপাতালে ১২ থেকে ২০টি পর্যন্ত সিট থাকলেও ঢাকার বাইরের অনেক হাসপাতালে কোন সিট নেই। আর আইসিইউ সিটের জন্য আলাদা জায়গা, ভেন্টিলেটর, যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টেকনিশিয়ান ও আইসিইউ বিশেষজ্ঞ দরকার। কিন্তু হঠাৎ করে বিশেষজ্ঞ পাওয়া কষ্টকর। সরকার নতুন করে জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন হাসপাতালের জন্য আইসিইউ ইউনিট চালু করার পদক্ষেপ নিয়েছে। এ নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিলেট, দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে এসব বেড চালু করা হয়েছে। অন্যগুলো প্রক্রিয়াধীন আছে বলে এ বিশেষজ্ঞ জানান। তিনি বলেন, আইসিইউ চালানোর জন্য ইতোমধ্যে অনেককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক স্থানে ভেন্টিলেটর, অক্সিজেন ও বিশেষজ্ঞ জনবলের অভাবের কারণে করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এরপরও চেষ্টা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে আইসিইউ বিশেষজ্ঞ সংকট মারাত্মক। সারাদেশে বিশেষজ্ঞ আছে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন। যার কারণে আপাতত অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার দিয়ে কোন মতে কাজ চালিয়ে নেয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে। এছাড়াও বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট চালু করতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সেরও দরকার। আইসিইউ চালাতে কমপক্ষে তিন শিফটে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স দরকার। নতুন করে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এজন্য সময় লাগবে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তারের দরকার। এছাড়াও আইসিইউনিটে অক্সিজেন সরবরাহ, এক্স-রে মেশিন, ইসিজি মেশিন, আলাদা মনিটরসহ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ দরকার। সেখানে সর্বক্ষণ, ডাক্তার, স্টাফ, টেকনিশিয়ান সব সময় থাকতে হবে।

বাংলাদেশ ক্রিটিক্যাল কেয়ার সোসাইটির সভাপতি প্রফেসর ডা ইউএইচ শাহেরা খাতুন বেলা বলেন, আইসিইউতে যেখানে ডাক্তার দরকার ৫০ জনের। সেখানে করোনা রোগীর চিকিৎসায় ২ জন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ছাত্র দিয়ে আইসিইউ ও অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগ চালানো হয়। এখন মেডিকেল কলেজগুলোর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ছাত্র ও অনারারি ডাক্তার দিয়ে আইসিইউ চলছে। একজন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বেশ কিছু অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার এখন আক্রান্ত। দেশে প্রথম যিনি আক্রান্ত তিনি অ্যানেসথেসিয়ার ডাক্তার। দেশে ১শ’ জনে ৫ জন করোনা রোগী আইসিইউ দরকার। ৮০ জন বাসায় থেকে চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়ে যায়। আর ২০ জন ভর্তি হয়। তারমধ্যে ৪ থেকে ৫ জন আইসিইউ সাপোর্ট লাগে। তারা নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস অক্সিজেন ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে নেয়। তাদের লাইফ সাপোর্ট দরকার। এজন্য এখন সারাদেশের করোনা রোগীদের জন্য আইসিইউ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দরকার। দেশে এখনও বেকার আছে আইসিইউ ও অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার। যতোটুকু সম্ভব জরুরিভিত্তিতে ৫শ’ আইসিইউ ও অ্যানেসথেসিয়া ডাক্তার নিয়োগ দেয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।