• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, ২৩ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিক্ষোভ

কনসার্টের গানে জাবি উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি

ছাত্রলীগ সম্পাদকের পদত্যাগ

সংবাদ :
  • প্রতিনিধি, জাবি

| ঢাকা , শুক্রবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৯

image

গতকাল জাবি উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দুর্নীতিবিরোধী কনসার্ট করে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা-সংবাদ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে গতকাল দিনভর বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দুর্নীতি বিরোধী কনসার্ট করেছে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কনসার্টের গানেও উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি।

গতকাল সকাল থেকেই পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আন্দোলনকারী শিক্ষক শিক্ষার্থীরা ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করে। পরে বেলা সাড়ে বারোটায় পুরাতন প্রশাসনিক ভবন হতে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। বিক্ষোভ মিছিল উপাচার্যের বাসভবনের সামনে উপস্থিত হলে বাসভবনে প্রবেশের গেটে সতর্ক অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায় পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। এ অবস্থায় আন্দোলনকারী শিক্ষকরা পুলিশ ও বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের মাঝখানে ব্যারিকেড তৈরি করে। ২০ মিনিট সেখানে অবস্থান করার পর আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পুনরায় পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনে ফিরে যায়। সেখানে আন্দোলনের অবস্থান নিয়ে বিকেল তিনটা পর্যন্ত বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশে আন্দোলনকারীরা হল বন্ধের প্রতিবাদ, ছাত্রলীগের হামলার বিচারসহ দুর্নীতির অভিযোগে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবি জানান। সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি সুস্মিতা মরিয়ম বলেন, ছাত্রলীগের যে নেতারা টাকা পেয়েছেন তারাই মিডিয়ার সামনে স্বতঃফূর্তভাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তারাই স্বীকার করেছে কিভাবে টাকা ছড়ানো হয়েছে আর দুর্নীতির তদন্তের দায়-দায়িত্ব শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নয়। বরং এটা রাষ্ট্রের কাজ এবং রাষ্ট্রকেই জাবির উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়টি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।

আন্দোলনের মুখপাত্র অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, উপাচার্যের দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করতে প্রাথমিক প্রমাণ সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। বিশেষ করে টাকা ভাগ-বাটোয়ারায় যারা যুক্ত ছিলেন, গণমাধ্যমের কাছে তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক যেসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অর্থ কেলেঙ্কারির সংবাদ প্রকাশ করেছে, সেগুলো প্রাথমিক তদন্তের জন্য যথেষ্ট বলে আমরা মনে করি।

সরকার এই প্রমাণগুলো আমলে না নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ গ্রহণ না করায় বিস্ময় প্রকাশ করে অধ্যাপক রায়হান রাইন আরও বলেন, তথ্য-প্রমাণগুলো আমলে নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কার্যকরী তদন্ত হলে উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হবে। এর মাধ্যমে অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম উপাচার্য পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন, সেটিও প্রমাণিত হবে।

ছাত্র ফ্রন্টের শাখা সভাপতি মাহাথির মুহাম্মদ বলেন, টাকার ভাগ পাওয়া ছাত্রলীগ নেতারা যেখানে নিজেই টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে সেখানে আর কত প্রমাণ দরকার? তদন্তের মুখোমুখি না হয়ে উপাচার্য নিজেই নিজেকে দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করেছেন। এদিকে আন্দোলন দমাতে আন্দোলনকারীদের উপর ‘শিবির’ ট্যাগ লাগানো হচ্ছে। তাদের ওপর ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিচ্ছে দুর্নীতিবাজ উপাচার্য। দুর্নীতিমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার যে পবিত্র আন্দোলন আমরা শুরু করেছি তাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে যারা নস্যাৎ করার চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধেও দুর্গ গড়ে তোলা হবে। উপাচার্য ফারজানা ইসলাম জাবির পরিবেশকে দূষিত করে ফেলেছে। তাকে অপসারণ করা না পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে পাবে না। তিনি আরও বলেন, যে উপাচার্য তদন্তের মুখোমুখি না হয়ে ছাত্রলীগকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপরে লেলিয়ে দিতে পারে, সম্মানিত শিক্ষকদের উপর হাত তোলার নির্দেশ দিতে পারে উপাচার্য নামক সম্মানজনক পদে থাকার মতো অধিকার সেই ব্যক্তির থাকে না। জাবিকে এবং জাবির মান-মর্যাদাকে রক্ষা করার জন্য ব্যক্তি ফারজানার অপসারণ ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।

এদিকে, জাবি উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং তার অপসারণ দাবিতে চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির যেসব অভিযোগ তুলেছে, এর সুনির্দিষ্ট তথ্য তো তাদের কাছে থাকার কথা। তারা যদি অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদেরও সাজা হবে। যে মিথ্যা অভিযোগ করবে, তার শাস্তি হবে।

গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে দুস্থ ও অস্বচ্ছল সাংবাদিকদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার জন্য আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি আরও বলেন, কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। ক্লাস বর্জন, ভাঙচুর, অবরোধ চলছে। এগুলো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, ছাত্র-শিক্ষকরা এসব কেন করবে?

সমাবেশ শেষে সন্ধ্যা পৌনে ছয়টায় বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে তাদের পূর্বঘোষিত ‘প্রতিবাদী কনসার্ট’ আয়োজন করেন। চলমান আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে এ কনসার্টে গান গেয়েছেন সিনা হাসান, আহমেদ হাসান সানী, তুহিন কান্তি দাস, নাইম মাহমু ও মূইজ মাহফুজ। উপাচার্যের বাসভবনের সামনে রাত নয়টা পর্যন্ত গান ও কবিতা আবৃত্তিসহ বিভিন্ন পরিবেশনায় কনসার্টমুখর করে তুলেছেন তারা।

নতুন কর্মসূচি সম্পর্কে আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সভাপতি আরিফুল ইসলাম অনিক বলেন, উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে কাল (আজ) একটি বিক্ষোভ মিছিল করব। ক্যাম্পাসের মধ্যে প্রতিবাদী চিত্র প্রদর্শনী এবং উপাচার্যের দুর্নীতি ও অনিয়মসহ বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নথি শিক্ষা মন্ত্রীকে দেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৩ অক্টোবর একনেকে জাবির অধিকতর উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করা হয়। প্রকল্পের টাকা ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ ওঠে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। এরপর থেকেই উপাচার্যকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে তার অপসারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সংগঠন ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’। তিন মাসের লাগাতার আন্দোলনের পর গত সোমবার, ৪ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে সংগঠনটির ব্যানারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে। পরদিন ৫ নভেম্বর শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে ৮ শিক্ষকসহ অন্তত ৩৫ জন আহত হয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠলে সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

জাবি ছাত্রলীগ সম্পাদকের পদত্যাগ

জাহাঙ্গীরগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চল পদত্যাগ করেছেন। গত মঙ্গলবার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলেও গতকাল সন্ধ্যায় এটি জানাজানি হয়। দফতর সম্পাদক আহসান হাবিব পদত্যাগপত্র পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন তবে পদত্যাগের কারণ জানাননি। আহসান হাবিব সাংবাদিকদের বলেন, গত মঙ্গলবার পদত্যাগপত্র পেয়েছি। আমি পড়ে দেখিনি। সভাপতি-সেক্রেটারির কাছে হস্তান্তর করেছি। ধারণা করছি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে হতে পারে। পদত্যাগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলে প্রেস রিলিজ দিয়ে জানিয়ে দেয়া হবে।’ মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি চঞ্চলের সঙ্গে। শাখা সভপাতি জুয়েল রানার দাবি তিনি এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। জুয়েল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না, কেন্দ্রও আমাকে কিছু জানায়নি।’ আগস্টের ২৮ তারিখ থেকেই ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করছিলেন চঞ্চল। এরপর শাখা ছাত্রলীগের কোন কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়নি। এর আগে ২৩ আগস্ট গণমাধ্যমে খবর বের হয়, ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম শাখা ছাত্রলীগকে ১ কোটি টাকা বণ্টন করে দিয়েছেন। যেখান থেকে চঞ্চল ২৫ লাখ টাকা ভাগে পেয়েছেন। গণমাধ্যমের কাছে তখন চঞ্চল এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে ছাত্রলীগে চঞ্চলের বিরোধী গ্রুপ গণমাধ্যমে দাবি করেন টাকা পেয়ে কাউকে যেন ভাগ দিতে না হয় সেজন্য লাপাত্তা হয়ে গেছেন চঞ্চল। এর আগে শাখা ছাত্রলীগ সম্পাদকের বিরুদ্ধে ৬০ লাখ টাকা নিয়োগ বণিজ্য করার খবর বের হয় গণমাধ্যমে। ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর জুয়েল রানাকে সভাপতি ও আবু সুফিয়ান চঞ্চলকে সাধারণ সম্পাদক করে এক বছরের জন্য শাখা কমিটির অনুমোদন দেয়া হয়। কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রায় দুই বছর ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিতে চলছে জাবি ছাত্রলীগ। নেতৃত্ব পাওয়ার ৩ বছরেও হল কমিটি ঘোষণা করতে পারেনি শাখা সভাপতি- সেক্রেটারি।