• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২১ জিলহজ ১৪৪১, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭

অঙ্গীকারে আবাদ্ধ সংঘবদ্ধ ডাকাতদল

ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে ডাকাতিতে নামে

সংবাদ :
  • সাইফ বাবলু

| ঢাকা , রোববার, ১৫ মার্চ ২০২০

একে অপরকে না ছেড়ে যাওয়ার অঙ্গীকার বিপদে একজন আরেকজনের পাশে থাকা, পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সঙ্গীদের নাম প্রকাশ না করারও শপথ নেয়। এরপর সংঘবদ্ধ হয়ে ডাকাতিতে নামে। এ পর্যন্ত একাধিক ডাকাতি করেছেন। ধরা পড়লেও নির্ধারিত আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনে বেরিয়ে এসে ফের ডাকাতিতে সক্রিয় হয়। ডাকাতির সময় তারা ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক তৈরি করেন এবং নির্বিগ্নে ডাকাতি করে আবার ককটেল ফাটিয়ে পালিয়ে যায়। সিসি ক্যামেরা যাতে ধরা না পড়ে এ জন্য ডাকাতির সময় প্রত্যেকেই মুখোশ পরে।

রাজধানীর তুরাগ এলাকায় ককটেল ফাঁটিয়ে একটি বাহিনীর সিভিল স্টাফের বাসায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে গত জানুয়ারি মাসে। ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেফতারের পর এমন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পুলিশের উত্তরা জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার কামরুজ্জামান সরদারের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ চক্রকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে বেশ চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। চক্রের ১০ জনের একটি শক্তিশালী গ্রুপ রয়েছে যারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে চুক্তিতেও ডাকাতি করে থাকেন। এ দলের দিক্ষাগুরু বর্তমানে জেলে আছে। তার অবর্তমানে ৩ থেকে ৪ জন পুরো গ্রুপকে সংঘঠিত করে ডাকাতি চালাচ্ছে।

অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার কামরুজ্জামান সর্দার জানান, গত ১৮ জানুয়ারি রাজধানীর তুরাগ থানার বাউনিয়া এলাকায় একটি বাহিনীর সিভিল স্টাফ সাজ্জাদুর রহমানের বাসায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সংঘবদ্ধ ডাকাত দল বাসার গ্রিল কেটে সাজ্জাদুর রহমান ও তার পরিবারের সবাইকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বর্ণলঙ্কারসহ প্রায় ৪ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়। এ ঘটনায় তুরাগ থানায় অজ্ঞাত ডাকাতদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এরপর ২৫ জানুয়ারি পল্লবী এলাকায় একটি বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসারের বাসায় ডাকাতির ঘটনা ঘটে। তুরাগ থানায় ডাকাতি যে কায়দায় করা হয়েছে পল্লবীতেও একই কায়দায় ডাকাতরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ১৭ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায়। ওই ঘটনায় পল্লবী থানায় মামলা হয় (মামলা নং ৫২)। দুটি মামলা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ প্রথমে কোন ক্লু পাচ্ছিল না। কারণ ডাকাতরা ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছিল। পাশাপাশি তারা প্রত্যেকেই মুখোশ পড়া ছিল।

এডিসি কামরুজ্জামান জানান, ২০১৯ সালে পুলিশ একটি ডাকাতির ঘটনায় ক্লু উদ্ঘাটন করেছে এবং সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের নেতা মনিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে মনিরকে এ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মনিরের দেয়া তথ্যে জানা যায়, তার গ্রুপের বেশ কয়েকজন বাইরে রয়েছে। তারা বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি করছে। তথ্য প্রযুক্তির সহযোগিতায় ভোলার চরফ্যাশন থেকে মো. মাসুদ ওরফে ভোলা মাসুদকে গ্রেফতার করা হয়। ভোলা মাসুদ ডাকাতির মামলায় জেলে থাকা মনিরের গ্রুপের হয়ে ডাকাতি করত। এর পর তার দেয়া তথ্যে গ্রেফতার করা হয় মো. ফজলে সর্দার, হান্নাত সরদার, খায়রুল, সোহরাব হোসেন কামাল, জুয়েলারি মালিক মামুনকে।

পুলিশ জানায়, সংঘবদ্ধ এ চক্রের দলনেতা সোহরাব হোসেন কামাল। তাকে রিমান্ড হেফাজতে এনেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, পর পর দুটি ডাকাতির ঘটনায় ৯ থেকে ১০ জন জড়িত ছিল। এর মধ্যে দলনেতা সোহরাব হোসেনসহ ৬ জন গ্রেফতার হয়েছে। এখনও ৩ জনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, সংঘবদ্ধ এ চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। এ চক্রের একাধিক সদস্য রয়েছে। চক্রের সদস্যরা যখন কোন বাসা বাড়ি, অথবা অফিস আদালত কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ডাকাতি করতে যায় তখন কোরআন শরীফ সামনে রেখে মাটিতে হাত দিয়ে শপথ করে নেয়। শপথ বাক্য পাঠ করান সোহরাব হোসেন। তারা শপথ করেন এ বলে যে, ডাকাতির সময় তারা একসঙ্গে থাকবেন। যেকোন বিপদ আসলে কেউ কাউকে ছেড়ে যাবেন না। যার উপর যে দায়িত্ব থাকে সে দায়িত্ব পালন করবেন। কোন কারণে পুলিশের হাতে ধরা পড়লে কেউ কারও নাম প্রকাশ করবে না।

পুলিশ জানায়, ডাকাতির সময় এরা দায়িত্ব ভাগ করে নেয়। দু’জনের দায়িত্ব থাকে ডাকাতি করার সময় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো। কখনও ডাকাতির শুরুতে অথবা ডাকাতি শেষে পালিয়ে যাওয়ার সময় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এছাড়া আরও দু’জনের দায়িত্ব থাকে গ্রিলকাটা, তালা ভাঙা। অন্যরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে। দু’জনের দায়িত্ব থাকে মালামাল গুছানো। ডাকাতি করে মালামাল এরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। নগদ অর্থ ভাগাভাগি করে নিলেও লুট করা স্বর্ণলঙ্কার এরা নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে। অন্যান্য মালামাল বিক্রির জন্য এদের কয়েকজন ব্যবসায়ী রয়েছে যারা এদের কাছ থেকে কমমূল্যে ডাকাতির মালামাল কিনে থাকেন।

সংঘবদ্ধ এ চক্রের বিরুদ্ধে মাদারীপুর, কালকিনি উপজেলা, শিবচর, ময়মনসিংহের ত্রিশাল, মানিকগঞ্জের সিংগাইর, গাজীপুরের শ্রীপুর, যশোর ও বরিশাল মেট্টোপটিলনের বিমানবন্দর থানাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক মামলা রয়েছে। সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা ডাকাতি করতে গিয়ে কখনও কখনও খুনের ঘটনাও ঘটিয়ে থাকে। ডাকাতিতে বাধা পেলে এরা হত্যার মতো ঘটনা ঘটায়। এদের মধ্যে কয়েকজন রয়েছে যারা পূর্বে একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত আইনজীবীর সহযোগিতা নিয়ে ডাকাতির মামলা থেকে সহজে জামিনে বেড়িয়ে আসে এবং পুনরায় ডাকাতি করে।

পুলিশ জানায়, এদের মধ্যে প্রত্যেকেই দল গঠন করা, সদস্য সংগ্রহ, ডাকাতিতে নেতৃত্ব দেয়ার মধ্যে অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেকান্দার, ভাগনে মনির, রুবেলসহ আরও কয়েকজন রয়েছে যারা প্রত্যেকেই ডাকাত সর্দার মনিরের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছে। মনির একটি ডাকাতির মামলায় জেলে রয়েছে। জেলে থাকলেও সেখান থেকে মনির গ্রুপের লোকজন নিয়ে ডাকাতির নেতৃত্ব দিচ্ছে। সংঘবন্ধ গ্রুপটি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি এলাকায় শতাধিক ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে। সব ঘটনায় মামলা হয়নি। সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ অনেকের বাসায় ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। গ্রুপের অধিকাংশ মাদারীপুর এলাকার। বাকিরা বিভিন্ন এলাকার। ডাকাতির সময় হলে এরা একত্রিত হয়। ডাকাতি শেষ হয়ে যাওয়ার পর এরা নিজেদের মতো থাকেন। এ চক্রের আরও সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।