• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১১ ফাল্গুন ১৪২৪, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৩৯

ভাষাসৈনিক গাজীউল হক

একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘোষণা দেন যিনি

সংবাদ :
  • সেবিকা দেবনাথ

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

image

গাজীউল হক। পুরো নাম পীরজাদা ড. আবু নসর মুহাম্মদ গাজীউল হক। ১৯২৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার নামাজগড়ে জন্মগ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা দেশের যেকোন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন সামনের সারিতে।

বগুড়ায় থাকা অবস্থায় ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তিনি। সে সময় তিনি পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের বগুড়া শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। মূলত ওই সময় থেকেই ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ সংগ্রাম শুরু হয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল কর্মসূচির সময় বগুড়ায় তিনি সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলনের জনক সংগঠক তমদ্দুন মজলিস, ভাষা অন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত থেকে ১৯৪৮-১৯৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে আইএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হয়ে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ওঠেন। ১৯৫২ সালে তিনি এমএ পাস করেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার এমএ ডিগ্রি কেড়ে নেয়। পরবর্তীতে ছাত্র নেতা ইশতিয়াক, মোহাম্মদ সুলতান, জিল্লুর রহমান প্রমুখের প্রচন্ড আন্দোলনের চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার এমএ ডিগ্রি ফেরত দিতে বাধ্য হয়।

ভাষা সৈনিকদের বক্তব্য এবং ভাষা আন্দোলন ভিত্তিক বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাহান্নতে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করেন গাজীউল হক। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার ব্যাপারে ২০ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল পুকুর পাড়ে ১১ জন ছাত্র নেতার যে গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই বৈঠকের অন্যতম উদ্যোক্তাও ছিলেন তিনি। ওই বৈঠক থেকেই পরের দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার কৌশল নির্ধারণ করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক সমাবেশে তিনি সভাপতিত্ব করেন এবং ১৪৪ ধারা ভঙের ঘোষণা দেন।

১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এসে পল্টনের জনসভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্র হলে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়। ঘোষণানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠানে গাজীউল হকও অংশ নেন এবং সভা শেষে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা ছিল উত্তাল। এ আন্দোলন ছড়িয়ে গিয়েছিল সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিস আদালতে রাজপথে সবখানে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিমনেসিয়াম মাঠের পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত) গেটের পাশে ছাত্রছাত্রীদের জমায়েত শুরু হতে থাকে। সকাল ১১টায় কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আবদুল মতিন, গাজীউল হক প্রমুখের উপস্থিতিতে ছাত্রছাত্রীদের সমাবেশ শুরু হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিকে তছনছ করে দেয়ার জন্য ঢাকাতে সমাবেশ, মিছিল-মিটিংয়ের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সময় ধরে উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আবদুল মতিন এবং গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভঙের পক্ষে মত দিলেও সমাবেশ থেকে নেতারা এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হন। এ অবস্থায় বাংলার দামাল ছেলেরা দমনমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। উপস্থিত সাধারণ ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভঙের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং মিছিল নিয়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) দিকে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। অধিকার আদায়ের দাবিতে শত শত বিদ্রোহী কণ্ঠে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে। পুলিশের সঙ্গে ছাত্র জনতার সংঘর্ষ হয়। সেøাগানে সেøাগানে কেঁপে উঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বুলেট আর লড়াই শুরু হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ এবং গুলি বর্ষণ শুরু করে। গুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ, এবং আব্দুল জব্বার নামের তিন তরুণ মারা যায়।

২১ ফেব্রুয়ারি টিয়ার শেলের আঘাতে গাজীউল হক আহত ও অজ্ঞান হয়ে পড়েন। ২৩ ফেব্রুয়ারি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে গাজীউল হক পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। বগুড়ায় এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সেখানকার আলতাফুন্নেছা মাঠে তার গায়েবানা জানাজাও পড়ানো হয়েছিল।

ভাষা গবেষক এবং ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরের নির্বাহী পরিচালক এম আর মাহবুব সংবাদ’কে বলেন, ‘১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সরকার যে ১৪৪ ধারা জারি করেছিলেন আর সেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারীদের যে কয়জন ছিলেন তার মধ্যে অন্যতম একজন গাজীউল হক। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনের চরম মুহূর্তে ছাত্র-জনতা সমাবেশে সভাপতিত্ব করা এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার মতো ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়ে তিনি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে গৌরবজনক আসনে সমাসীন হয়ে আছেন এবং থাকবেন। একুশে পদক প্রাপ্ত এই ভাষা সৈনিকই রচনা করেন একুশের প্রথম গান ‘ভুলব না ভুলব না ভুলব না সে একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’। এই গানটি গেয়েই ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত প্রভাতফেরি করা হতো।