• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শুক্রবার, ২২ জানুয়ারী ২০২১, ৮ মাঘ ১৪২৭, ৮ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নিরাপদে জ্বালানি তেল খালাসের লক্ষ্যে

এক যুগেও শেষ হয়নি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পের কাজ

    সংবাদ :
  • ফয়েজ আহমেদ তুষার
  • | ঢাকা , সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২০

স্বল্প ব্যয়ে ও নিরাপদে জ্বালানি তেল খালাসে সাগরে পাইপলাইন নির্মাণে গৃহীত সরকারের সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের কাজ এক যুগেও শেষ হয়নি। বেশ কয়েকবার প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ব্যয়ও বেড়েছে বহুগুণ।

২০০৯ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এসপিএম প্রকল্পটি হাতে নেয়। ২০১০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) যখন প্রকল্পটি অনুমোদন করে তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৫৪ কোটি টাকা। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এরপর কয়েকবার প্রকল্প প্রস্তাব পরিবর্তনের পর সর্বশেষ সংশোধনী অনুসারে গত বছর ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা আগামী বছরের (২০২১) আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে ইস্টার্ন রিফাইনারি লি. (ইআরএল)। প্রকল্পের শুরু থেকে কয়েক ধাপে ডিপিপি সংশোধনের পর ব্যয় বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৪২৬ কোটি টাকায়। বিপিসির দাবি, ঋণ ছাড় হতে বিলম্ব হওয়ায় এবং জমি অধিগ্রহণে জটিলতার কারণে সময় মতো প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

প্রকল্প পরিচিতি : সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনালটি মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিমে নির্মাণ করা হবে। টার্মিনাল থেকে সাগরে ১৪৬ কিলোমিটার ও ভূমিতে ৭৪ কিলোমিটার মোট ২২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে দুটি পাইপ লাইন নির্মাণ করা হবে। এরমধ্যে ৩৬ ইঞ্চি ব্যসের ৩২ কিলোমিটার এবং ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের ১৮৮ কিলোমিটার পাইপলাইন বসবে। মহেশখালী দ্বীপে ক্রুড অয়েল ও ডিজেলের জন্য পৃথক পৃথক ৬টি স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হবে। এখান থেকে পতেঙ্গায় অবস্থিত ইআরএলের স্টোরেজ ট্যাংকে তেল আনা হবে।

বার বার ডিপিপি সংশোধন : ২০১০ সালে একনেকে অনুমোদিত এসপিএম প্রকল্পের ধরা হয়েছিল ৯৫৪ কোটি টাকা। সে সময় ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ৯০৪ কোটি ঋণ দিতে চেয়েছিল। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এরমধ্যে ঘটাতির কথা বলে নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। প্রথম নকশায় একটি পাইপলাইন ছিল। নতুন নকশায় গভীর সমুদ্র থেকে দুটি পাইপলাইনে তেল খালাসের বিষয় যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য ৯৪ কিলোমিটার বেড়ে ২২০ কিলোমিটারে দাঁড়ায়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ২৪৩ কোটি টাকায়। ২০১৫ সালের মার্চে প্রথমবার ডিপিপি সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এতে বৈদেশিক সহায়তা ধরা হয় তিন হাজার ৩০০ কোটি। কিন্ত প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আইডিবি দিতে অপারগতা প্রকাশ করে।

পরবর্তীতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে নতুন ডিপিপি তৈরি করে ২০১৫ সালের নভেম্বরে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। এ সময় প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় পাঁচ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এরমধ্যে চার হাজার ২৯৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় চীনের এক্সিম ব্যাংক। আর বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ বিশেষ আইনের আওতায় টেন্ডার ছাড়া প্রকল্কেপ্পর কাজ পায় চীনের চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ব্যুরো (সিপিপিবি)। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে সিপিপিবির সঙ্গে বিপিসি ও ইআরএলের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২০১৭ সালের অক্টোবরে চীনের এক্সিম ব্যাংক ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৭ সালের ৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গত ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা আগামী বছরের আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে ইআরএল।

জ্বালানি বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের অবকাঠামোতে মাদার ভেসেল (বৃহৎ জাহাজ) থেকে জ্বালানি তেল খালাস করা সম্ভব নয়। কারণ কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলের নাব্যতা কমে যাচ্ছে। এ সীমাবদ্ধতার কারণে মাদার ভেসেল গভীর সমুদ্রে নোঙর করা হয়। সেখান থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে আমাদনি করা জ্বালানি তেল খালাস করা হয়। এভাবে একটি বড় মাপের ভেসেল (এক লাখ টনের ওপরে) খালাস করতে ১১ দিন সময় লাগে। এ ছাড়া লাইটার জাহজের মাধ্যমে তেল খালাসে অপচয় হয় বেশি। কিন্তু সাগরে ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে তেল খালাস করে পাইপ লাইনের মাধ্যমে তা স্টোরেজ ট্যাংক পর্যন্ত নিতে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় লাগবে। ফলে সময় বাঁচবে ৯ দিন। এজন্য ২০১০ সালেই এসপিএম প্রকল্ক হাতে নেয়া হয়।

এ বিষয়ে বিপিসির সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সংবাদকে বলেন, এক্সিম ব্যাংক হতে ঋণের টাকা পেতে দেরি হয়েছে। এছাড়া কিছু জায়গায় পাইপলাইনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা যাচ্ছে না। এজন্য প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে। বিপিসি’র দাবি, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমদানিকৃত তেল নিরাপদে, স্বল্প খরচে এবং কম সময়ে খালাস করা সম্ভব হবে। এতে বছরে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড) পাইলাইনের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচ দশমিক ৬ একর জমির জমি দিতে রাজি হচ্ছে না। গত দুই বছর ধরে কেইপিজেড এর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকেও সমাধান মিলছে না। প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জার্মানির আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স ২০১৮ সাল থেকে কেইপিজেডের ভেতর কাজ করতে গিয়ে বার বার বাধা পেয়েছে। জ্বালানি বিভাগ থেকে এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিলেও বিষয়টি প্রায় দুই বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। কেইপিজেড বিকল্প রুটের প্রস্তাব দিলে পরমার্শক প্রতিষ্ঠান যাচাই করে জানিয়েছে সেটি বাস্তবসম্মত নয়।

উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা ৫৫ লাখ মেট্রিকটন। এরমধ্যে ৫০ লাখ টনই আমদানি করা হয়। বাকিটা দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পাওয়া যায়। এরমধ্যে ইআরএলের শোধন ক্ষমতা ১৫ রাল মেট্রিকটন। এর দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে শোধন ক্ষমতা ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাবে। তখন পাইপলাইনের মাধ্যমে সহজেই তেল খালাস করা সম্ভব হবে।