• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৯ আশ্বিন ১৪২৬, ২৪ মহররম ১৪৪১

ঋণ খেলাপিদের বিশেষ সুযোগ আটকে গেল হাইকোর্টে

সংবাদ :
  • অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , বুধবার, ২২ মে ২০১৯

image

খেলাপিদের ঋণ সহজ শর্তে পুনঃতফসিলের বিশেষ সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা প্রজ্ঞাপনের ওপর আগামী ২৪ জুন পর্যন্ত স্থিতাবস্থা জারি করেছেন হাইকোর্ট। ওইদিনই পরবর্তী আদেশে দেবেন আদালত। প্রজ্ঞাপন স্থগিত চেয়ে আইনজীবী মনজিল মোরসেদের করা এক আবেদনের শুনানি করে বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার এই আদেশ দেয়।

আদেশের পর মনজিল মোরসেদ বলেন, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরে খেলাপি ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা ওই সার্কুলারকে আদালত ‘দুষ্টের পালন, শিষ্টের দমন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মনিরুজ্জামান।

রুলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের সচিব, অর্থ বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দুই সচিব, আইন সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, ঋণখেলাপিদের নতুন করে একটা সুযোগ দিয়ে ২ শতাংশ (ডাইন পেমেন্ট) সুদ জমা দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সার্কুলার দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সার্কুলারের বিষয় নিয়ে ১৬ মে আমরা আদালতকে অবহিত করি। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনজীবী জানান, এ সংক্রান্ত কোনো সার্কুলার তারা দেননি। পরে আদালত ঋণখেলাপিদের তালিকা দেয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু দেখা যায়, ১৬ মে বিকেলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সার্কুলার জারি করা হয়। পরে আমরা ওই সার্কুলার চ্যালেঞ্জ করি। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণখেলাপিরা খেলাপির হাত থেকে মুক্তি পাবেন, এ কারণে সিআইবিতে তাদের নাম থাকবে না। তখন নতুন করে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে যাবেন। এতে ব্যাংকের মেরুদন্ড ভেঙে যাবে। এ কারণে আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম মামলার শুনানি না হওয়া পর্যন্ত সার্কুলারের কার্যক্রম স্থিতিবস্থা রাখার জন্য। আদালত আগামী ২৪ জুন পর্যন্ত সার্কুলারের কার্যক্রমের ওপর স্থিতাবস্থা দিয়েছেন।

রিট শুনানির সময় আদালত ব্যাংকের আইনজীবীকে বলেন, ঋণখেলাপিদের জন্য কাজ করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ উঠেপড়ে লেগেছে। ঋণ নিয়ে ব্যাংকের টাকা পাচার করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপই নেই। ২০ বছর ধরে এক কোটি টাকার ওপরে ঋণখেলাপিদের তালিকা, ঋণের পরিমাণ ও সুদ মওকুফের তালিকা চাইলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি না দেয়ায় গত ৩০ এপ্রিল ক্ষোভ প্রকাশ করেন আদালত।

গত বৃহস্পতিবার যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শোধ করছেন না, তাদের জন্য বড় সুবিধা চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সুবিধাগুলো হলো বকেয়া ঋণের ২ শতাংশ টাকা জমা দিয়েই তারা ঋণ নিয়মিত করতে পারবেন। এতে সুদহার হবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। আর এক বছরের ঋণ পরিশোধে বিরতিসহ ১০ বছরের মধ্যে বাকি টাকা শোধ করতে পারবেন। আবার ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণও নিতে পারবেন। আর যারা এক বছরের মধ্যে ঋণ শোধ করে দিতে চান, তাদের জন্য রয়েছে বড় ছাড়। তারা চাইলে তহবিল খরচের সমান সুদ দিয়েই বাকি টাকা শোধ করতে পারবেন। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর তহবিল খরচের হার সাড়ে ৭ থেকে ৯ শতাংশ।

ওইদিন সন্ধ্যায় ‘ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন পরিশোধ সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা’ জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে পাঠানো হয়। এ সংক্রান্ত একটি খসড়া নীতিমালা এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয় বলে জানা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই সময় জানায়, ঋণ বিরূপভাবে খেলাপি হয়ে পড়ায় ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদনশীল খাতে স্বাভাবিক ঋণপ্রবাহ বজায় রাখতে ও খেলাপি ঋণ আদায়ে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যেসব ঋণ মন্দ বা ক্ষতিজনক, মানে, খেলাপি হয়ে পড়েছে- এ ক্ষেত্রে এ সুবিধা দেয়া হবে।

ওইদিন বৃহস্পতিবার আরেকটি প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা করে, যেসব ব্যবসায়ী ঋণের সব কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করেছেন, কখনই কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হননি- তারা ‘ভালো গ্রাহক’। তাদের থেকে এক বছরে যে পরিমাণ সুদ আদায় করা হয়েছে, এর ১০ শতাংশ ফেরত দেয়া হবে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কেউ ঋণখেলাপি হলে তা পুনঃতফসিল সুবিধা পেতে ১০ শতাংশ অর্থ এককালীন শোধ করার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের বিষয়ে সার্কুলার জারির পরই তা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিশ্লেষকরা বলেন, ২০১৫ সালেই দেশের বড় ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছিল। ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ আছে- এমন ১১ প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। শর্ত ছিল, এরপর তারা নিয়মিত কিস্তি দিয়ে ভালো হয়ে যাবেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মাত্র দুটি কোম্পানি ছাড়া আর কেউই কিস্তির টাকা পরিশোধ করেননি। আরও দুঃখজনক হলো, নতুন করে যে ছাড় দেয়া হলো- এর পেছনেও আছেন পুনর্গঠন সুবিধা নেয়া ব্যবসায়ীদেরই কেউ কেউ। বিশেষ সুবিধা পেয়ে ঋণখেলাপিরা ভালো হয়ে গেছেন- এমন উদাহরণ বাংলাদেশে কখনো দেখা যায়নি। তাই আবার যে একই ঘটনা ঘটবে না, এর নিশ্চয়তা কী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এ নিয়ে এক প্রিতিক্রিয়ায় বলেন, নতুন এ সুবিধা পুরো ব্যাংক খাতের জন্য অন্তর্ঘাতমূলক ব্যাপার। এ সুযোগ খেলাপি ঋণ কার্পেটের নিচে চলে যাবে। আমার ৬০ বছরের কর্মজীবনে এমন সুবিধার কথা শুনিনি।

এর আগে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে ঋণখেলাপিদের তালিকা দাখিলের নির্দেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে রুলও জারি করেন। রুলে আর্থিক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, সিটি ব্যাংকের সাবেক সিইও মামুন রশিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে কমিশন গঠনে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না এবং এ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

উল্লেখ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, রাষ্ট্র মালিকানাধীন চার ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালীর মুনাফায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০১৮ সালে ব্যাংক চারটির সম্মিলিত নেট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯২ কোটি টাকা। তা আগের বছরের ৪ ভাগের ১ শতাংশ। মুনাফা কমে যাওয়ার কারণ, ব্যাংকগুলোয় বড় গ্রাহকদের অনেকে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেও কিস্তি পরিশোধ করছেন না। ফলে খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে আয় থেকে বিপুল অর্থ সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হচ্ছে। এ ছাড়া এ চার ব্যাংক গ্রাহকদের যে ঋণপত্র, নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টির মতো ‘নন ফান্ডেড’ (নগদ টাকার বাইরে দেয়ার নিশ্চয়তা) সুবিধা দিয়েছিল- এর একাংশও খেলাপি হয়ে গেছে।