• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ১৭ জিলহজ ১৪৪১, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭

উত্তাল মার্চ

| ঢাকা , শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২০

image

অজেয় বাঙালি একাত্তরের উত্তাল মার্চে তার স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। একাত্তরের ১৪ মার্চ ছিল আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচির শেষ দিন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর ৪ দফা দাবি মেনে নেয়ার দাবিতে রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী সংগঠন এবং যুব, মহিলা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সভা-সমাবেশ-শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতির মাধ্যমে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে নতুন নির্দেশ ঘোষণা করেন।

বঙ্গবন্ধু বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির আকাক্সক্ষাকে নির্মূল করা যাবে না। আমরা অজেয়, কারণ আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। আমরা আমাদের ভাবিষ্যৎ বংশধররা যাতে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম এগিয়ে চলছে। বল প্রয়োগের মাধ্যমে যারা শাসন করার চক্রান্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কী রকম ঐক্যবদ্ধ ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন আমাদে জনগণ বিশ্ববাসীর কাছে তা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকই আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করেছে। যারা নগ্ন বল প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলার মানুষকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল জনগণ চূড়ান্তভাবে তাদের পর্যুদস্ত করেছে। বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, জনতা অকুণ্ঠচিত্তে জানিয়ে দিয়েছেন আত্মসমপর্ণ নয়, তারা আত্মত্যাগের জন্য বদ্ধ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

আজ সকালে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ও ন্যাপ নেতা খান আবদুল ওয়ালী খান আলোচনা বৈঠকে মিলিত হন। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে রুদ্ধদ্বার কক্ষে প্রায় দেড় ঘণ্টা এই আলোচনা চলে। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে জীবনযাপনের জন্যই আমাদের সংগ্রাম। জনগণের সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এ সংগ্রাম চলবেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী ঐক্যবদ্ধ জনগোষ্ঠীকে পৃথিবীর কোন শক্তিই দাবিয়ে রাখতে পারবে না। ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খান সাংবাদিকদের বলেন, আমি পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমার দল ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অদিবেশনে বসার পক্ষপাতি। কেননা, জাতীয় পরিষদই হচ্ছে শাসনতান্ত্রিক সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা ও তার সমাধানের উপযুক্ত স্থান।

আজ ডিআইটি ভবন প্রাঙ্গণে টিভি নাট্যশিল্পীদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করা হয়। বাংলা একাডেমিতে লেখক সবাবেশ শেষে শোভাযাত্রা বের করে। ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে জনসভার আয়োজন করে। সভা শেষে দীর্ঘ মিছিল বের করা হয়। সদরঘাট ফরোয়ার্ড স্টুডেন্টস ব্লুকের উদ্যোগে জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় পল্টন ময়দানে কথাশিল্পী সম্প্রদায় কবিতা পাঠ ও গণসংগীতের আসর বসায়।

আজ বাংলাদেশের জন্য খাদ্যশস্যবাহী ‘মন্টেসেলো ভিক্টরি’ নামের আরেকটি জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে করাচি নিয়ে যাওয়া হয়। ‘ওসান এণ্ডুরাস’ নামের সমরাস্ত্রবাহী আরও একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের ১০নং জেটিতে নোঙর করে। গত ৯ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরের ১৬নং জেটিতে নোঙর করা অস্ত্রবাহী জাহাজ ‘সোয়াত’-এর সমরাস্ত্র খালাসের চেষ্টা করেও কর্তৃপক্ষ বন্দর কর্মী ও শ্রমিকদের অসহযোগিতার কারণে ব্যর্থ হয়। ঢাকায় নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লে. কমান্ডার ইমাম হোসেন এক বিবৃতিতে অবিলম্বে বাংলাদেশে অবস্থানরত সব অবাঙালি সৈন্যকে প্রত্যাহার করে বাঙালি সৈন্যদের তাদের স্থলাভিষিক্ত করার আহ্বান জানান।

স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দেশ থেকে সম্পদ পাচার প্রতিরোধের উদ্দেশে আজ ঢাকায় বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট স্থাপন করে। রাতে সংগ্রাম পরিষদের এক বিবৃতিতে বর্তমান বাংলাদেশের ছুটিতে অবস্থানকারী কেন্দ্রীয় সরকারের সার্ভিসেসের বাঙালি কর্মচারীদের পশ্চিম পাকিস্তানে গমন থেকে বিরত থেকে নিজ নিজ এলাকায় সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানান। জাতীয় শ্রমিক লীগ কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ প্রতিটি শ্রমিক এলাকায় সংগ্রাম পরিষদ ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে ট্রেনিং প্রদানের নির্দেশ দেন।

করাচিতে পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পপতিরা প্রেসিডেন্টের কাছে একটি স্মারকলিপিতে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতির স্বার্থে অবিলম্বে বঙ্গবন্ধুর দাবি মেনে নেয়ার জন্য প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করা হয়। শিল্পপতিরা বলেন, বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাম্প্রতিক অসহযোগ আন্দোলনের ফলে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সমুদয় অর্থ বাংলাদেশে আটকা পড়ে গেছে। এই অচলাবস্থা চলতে থাকলে শীঘ্রই পশ্চিম পাকিস্তানের কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়বে। কেননা পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান বাজার বাংলাদেশ।