• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ রবিউস সানি ১৪৪১

ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধু

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯

image

আজ ১৬ মার্চ। একাত্তর সালের ১৫ মার্চ ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেন পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। পুরো পাকিস্তানের সব শ্রেণীপেশার মানুষ এবং রাজনীতিকরা মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠককে দেশ ও দেশবাসীর ভাগ্যনির্ধারণী গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বলে মনে করেন। বেলা ১১টার আগে আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান সাদা মোটর গাড়িতে বাংলার আপামর মানুষের শোকের প্রতীক কালো পতাকা উড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে (বর্তমান রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধা) এলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতাকে স্বাগত জানান।

বেলা পৌনে ১১টায় বঙ্গবন্ধু তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার সময় সমবেত বিপুলসংখ্যক মানুষ জাতীয় নেতাকে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ মহান জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ প্রভৃতি ধ্বনি দিয়ে বিদায় শুভেচ্ছা জানায়। বঙ্গবন্ধু তার কর্মী, সমর্থক ও ভক্তদের প্রতি ‘জয় বাংলা’ বলে শুভেচ্ছা জানিয়ে নিজের গাড়িতে আরোহণ করেন। এ সময় অপেক্ষমাণ দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরাও বঙ্গবন্ধুকে ‘জয় বাংলা’ বলে শুভেচ্ছা জানান। বঙ্গবন্ধুকে তখন বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছিল। জাতীয় নেতার পানে ছিল সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবি আর হাতাকাটা গলাবদ্ধ কোট (মুজিব কোট)। প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে আলোচনা বৈঠকে অংশ নেয়ার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট ভবনের প্রধান ফটকে পৌঁছলে একদল দেশি-বিদেশি সাংবাদিক বাঙালি জাতির প্রতিনিধিকে স্বাগত জানান। বঙ্গবন্ধু গাড়ি থেকে নেমে কয়েক মিনিট তাদের সঙ্গে আলাপ করেন। এ সময় প্রেসিডেন্ট ভবনের প্রধান ফটকের অদূরে সংরক্ষিত এলাকার বাইরে দাঁড়িয়ে ছাত্র-জনতা ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনি দিয়ে প্রিয় নেতাকে অভিবাদন জানান।

বঙ্গবন্ধু কালো পতাকা উড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে পৌঁছলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বাাঙালি জাতির নেতাকে স্বাগত জানিয়ে আলোচনা কক্ষে নিয়ে যান। বেলা ১১টায় রুদ্ধদ্বার কক্ষে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও সংসদীয় ক্ষমতার অধিকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে শুরু হয় একান্ত আলোচনা। বৈঠক চলে আড়াই ঘণ্টা ধরে। বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার বাসভবনের বারান্দার সিঁড়ি পর্যন্ত এসে বঙ্গবন্ধুকে বিদায় জানান। বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট ভবনের প্রধন ফটকে পৌঁছলে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও আলোকচিত্র শিল্পীরা তার গাড়ি ঘিরে ধরেন। বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছায় গাড়ি থেকে নেমে সাংবাদিকদের জানান, ‘আমি রাজনৈতিক ও অন্য সমস্যা সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আরও আলোচনা হবে। এটি দু’এক মিনিটের ব্যাপার নয়। এজন্য সময়ের দরকার। আলোচনা চলবে। কাল সকালে আমরা আবার বসছি। এর চেয়ে বেশি কিছু আমার বলার নেই।’

প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে সরাসরি ধানমন্ডির বাসভাবনে ফিরে বঙ্গবন্ধু দলের শীর্ষস্থানীয় সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। গভীর রাত পর্যন্ত এই বৈঠক চলে। দু’দফা সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার ফাঁকে বিকেলে বঙ্গবন্ধু তার বাসভবনে বনভেনশন মুসলিম লীগ প্রধান ফজলুল কাদের চৌধুরীকে সাক্ষাৎ দান করেন। তারা কিছুক্ষণ একসঙ্গে কাটান।

এছাড়া আজ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের পঞ্চদশ দিবস। সকালে যখন প্রেসিডেন্ট ভবনে মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা চলছিল ঠিক তখন সারা বাংলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে পালিত হচ্ছে অসহযোগ আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বশাসিত অফিস চালু রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কেবল সেসব ছাড়া সারা বাংলায় অন্য সব অফিস-আদালত ও প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের অসহযোগিতা অব্যাহত থাকে। রাজধানী ঢাকায় একমাত্র প্রেসিডেন্ট ভবন ছাড়া সর্বত্র কালো পতাকা ওড়ে।

আজ ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে আসাদুজ্জামান খান সভাপতিত্ব করেন। চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সভা করেন। সভা শেষে মিছিল বের করা হয়। মিছিলে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও শিল্পী মুর্তজা বশীর নেতৃত্ব দেন। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ব্রতচারী আন্দোলনের অনুশীলন শুরু হয়। বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিল্পী ও সাহিত্যিকরা কবিতা পাঠ ও গণসংগীত পরিবেশন করেন। বুলবুল ললিতকলা অ্যাকাডেমির শিল্পীরা ধানমন্ডিতে দেশের গান পরিবেশন করেন। বিকেলে ডাক বিভাগের কর্মীরা বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সমাবেশ শেষে রাজপথে শোভাযাত্রা বের করেন। টঙ্গীতে শ্রমিকরা একটি দীর্ঘ ও সুশৃঙ্খল জঙ্গি মিছিল বের করেন। নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যায় ডকইয়ার্ড শ্রমিকরা নৌ-মিছিল বের করেন। সারাদেশে সভা ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে যে কোন ত্যাগ স্বীকারের জন্য দৃঢ়সংকল্প ব্যক্ত করা হয়। আজ ময়মনসিংহে এক জনসভায় ভাষণদানকালে ন্যাপ প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধামন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আহ্বান জানান। ন্যাপ প্রধান বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানান।