• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

একাদশ সংসদ নির্বাচন

আ’লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অধিকাংশই অনিশ্চয়তায়

সংবাদ :
  • ফয়েজ আহমেদ তুষার

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অধিকাংশই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। মনোনয়ন পাবেন, কি পাবেন না; এমন দোদুল্যমান পরিস্থিতিতেও নিজের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে জনসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। বর্তমান মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং দলের জেষ্ঠ্য নেতাদের মধ্যে যারা বর্তমান সংসদের সদস্য তাদের প্রায় সবার মনোনয়ন নিশ্চিত হলেও এখনও দেড়শতাধিক আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়নি।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই প্রতিটি আসনের প্রার্থী বাছাই ও মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নেয়ায় স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের সুযোগ অনেকটাই খর্ব হয়েছে। জনপ্রিয়, সৎ, যোগ্য, কর্মীবান্ধব এবং নবীন প্রার্থীদের এবার অগ্রাধিকার দেয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক কেন্দ্রীয় সূত্র। বিতর্কিত, সংগঠনবিরোধী কর্মকা-ে লিপ্ত এবং সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœকারীদের বেশিরভাগই এবার মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জোটবদ্ধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে শরিকদের মন রাখতে আসন ছেড়ে দেয়ার রীতির কারণেও নিশ্চিত মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন অনেক প্রার্থী। বিভিন্ন আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের মন্তব্যে এই অনিশ্চয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে। কিছুটা আগে মনোনয়ন নিশ্চিত করা হলে দলীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি কোন্দল নিরসন সহজ হবে বলে মনে করছেন অনেকে।

ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় অনেক নেতাই বলেছেন, ‘আশা আছে- বিশ্বাসও আছে, নেত্রীর সুনজরে থাকবো, নৌকার মনোনয়ন নিয়েই নির্বাচন করবো’।

একটি আসনে দুই বা ততোধিক প্রার্থীর সবার বক্তব্য একই রকম। মনোনয়ন না পেলে কী করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বেশিরভাগ নেতাই নৌকার পক্ষে কাজ করার কথা বলছেন। তবে বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক আসনেই দলীয় মনোনয়ন লাভে ব্যর্থ প্রার্থীরা নৌকার বিপক্ষে কাজ করেছেন, হয় বিদ্রোহী প্রাথী হয়ে অথবা নিস্ক্রিয় থেকে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের যেসব বিদ্রোহী প্রার্থী জয় পেয়েছে তাদের অধিকাংশেরই স্থানীয় পদ বহাল থেকেছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিগত নির্বাচনের তুলানায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। বর্তমান সরকারের নেয়া এযাবৎ কালের সর্ববৃহৎ যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে রয়েছে সেসব প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য আরও একবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে চায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী, স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী, মধ্যম আয়ের দেশ, পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সবার ঘরে বিদ্যুৎ- এসব ক্ষমতায় থেকে উদযাপন করতে চায় দলটি। দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই নৌকাকে আবারও ক্ষমতায় আনতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে ‘প্রার্থী একটি বড় ফ্যাক্টর’- এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সোমবার মন্ত্রিসভায় বলেছেন, ‘দল ভালো হলে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ; প্রার্থী ভালো হলে ৭০ শতাংশ বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য এবার ভালো প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোন ছাড় দেয়া হবে না।

মন্ত্রিসভার বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সরকার এবার একটি ভালো নির্বাচন উপহার দিতে চায়। এজন্য এলাকাভিত্তিক জনপ্রিয়, অধিকতর সৎ ও ত্যাগী নেতাদের প্রার্থী করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন দেয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। নানা কারণে বিতর্কিত, সংগঠনবিরোধী কর্মকা-ে লিপ্ত এবং সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœকারী ব্যক্তিরা এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবে না। তদবির করেও কেউ দলের মনোনয়ন ভাগিয়ে নিতে পারবে না। আগামী শনিবার দলের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভা ডেকেছে আওয়ামী লীগ। সন্ধ্যা ৭টায় দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে দলের করণীয় নির্ধারণে সভায় আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সৎ, যোগ্য এবং জনপ্রিয় প্রার্থীদেরই এবার মনোনয়ন দেয়া হবে। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যাকেই মনোনয়ন দেয়া হউক সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নৌকার পক্ষে কাজ করতে হবে। যদি কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যায় তাকে কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে জোটের শরিকদের আসন ছেড়ে দেয়া প্রসঙ্গে মঙ্গলবার ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় পার্টিসহ জোটের শরিকদের জন্য ৬৫ থেকে ৭০টি আসন দেয়া হবে। আর বিএনপি নির্বাচনে না এলে জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করবে এটা তারাই (জাতীয় পার্টি) বলেছে। ওবায়দুল কাদের জানান, আগামী (অক্টোবর) মাসেই নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে। এই সরকারের আকার ছোট হবে। সংসদ সদস্য নন এমন কাউকে এখানে মন্ত্রী করা হবে না।

পরিস্থিতি যাই হোক বিএনপি এবার নির্বাচনে আসবে, আওয়ামী লীগ এ বিষয়টি নিশ্চিত ধরে নিয়ে জোটবদ্ধ নির্বাচনের দিকেই এগুচ্ছে। চলছে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে আসন নিয়ে দেন-দরবার। নির্বাচনে জোটে জাতীয় পার্টিকে (জাপা) নিতেও আলোচনা চলছে। জাপা চেয়ারম্যান এরশাদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠকও করেছে আওয়ামী লীগ। এরশাদ এবার একশ’ আসনের দাবি তুলেছেন। তবে অন্তত সত্তরটি আসন চান তিনি। জাপাকে যদি পঞ্চাশটি আসনও ছেড়ে দেয়া হয় সেক্ষেত্রে ঐ পঞ্চাশটি আসনেই জনসংযোগে ব্যস্ত আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বঞ্চিত হবে। এছাড়া জোটের অন্যান্য শরিকদেরও ২০টি আসন ছেড়ে দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও রয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা যারা নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশী তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রথম বারের মতো সংসদ সদস্য হওয়ার আশায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা থেকে মনোনয়ন প্রত্যশীদের মধ্যে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাঈল চৌধুরী সম্রাটসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সবাই এবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মনোনয়ন পাওয়ার আশাও করছেন। তবে কোন কারণে মনোনয়ন বঞ্চিত হলে নৌকার প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করবেন তারা।

মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন আসনে বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্য, স্থানীয় নেতা, ব্যবসায়ীসহ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী অনেকেই এবার জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস সংবাদকে বলেন, আমি আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য। গত পাঁচ বছর এলাকার উন্নয়নে কাজ করেছি। এলাকাবাসীর সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ রেখেছি। আমার একান্ত বিশ্বাস জননেত্রী শেখ হাসিনা এবারও আমাকে মনোনয়ন দিয়ে মুন্সীগঞ্জবাসীর সেবা করার সুযোগ দেবেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদেরও আমার প্রতি আস্থা আছে। জনগণের সমর্থন ও দোয়াও আমার জন্য রয়েছে। তবে কোন কারণে আমি যদি মনোনয়ন না পাই, নেত্রী যাকেই মনোনয়ন দেবেন তার পক্ষেই আমি কাজ করবো। এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী এবার মনোনয়ন চাইছেন। জনসংযোগও করছেন তিনি। তবে নৌকার মনোনয়ন না পেলে বিদ্রোহী প্রার্থী হবেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।

মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি সংবাদকে বলেন, আমি এলাকাবাসীর সঙ্গে সর্বদাই আছি। এলাকার স্বার্থে এলাকবাসীর উন্নয়নে কাজ করছি। নৌকার মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনের প্রত্যাশতো রয়েছেই। নেত্রীর সম্মতি থাকলে অবশ্যই নির্বাচন করবো। তিনি যদি অন্য কাউকে মনোনয়ন দেন, নির্দ্বিধায় তার পক্ষে মাঠে নামবো।

গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ ঢাকা বিভাগের কয়েকটি জেলা এবং রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নির্বাচনী জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ডিসেম্বরের শেষ দিকে একাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে কাজ করছে নির্বাচন কমিশন। আগামী (অক্টোবর) মাসেই দেয়া হবে তফসিল। এদিকে তফসিলের আগেই সারাদেশে জাতীয় নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। তবে চূড়ান্ত মনোনয়ন নিশ্চিত না হওয়ায় প্রার্থীদের পাশাপাশি কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। সবার মধ্যেই চলছে আলোচনা-সমালোচনা, মনোনয়ন নিয়ে নানা গুঞ্জন।