• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬, ১৪ রবিউল আওয়াল ১৪৪১

পাবনায় গৃহবধূ ধর্ষণ মামলা না নিয়ে থানায় বিয়ে

আ’লীগ নেতা ঘন্টুসহ ২ জন গ্রেফতার

ধর্ষণের আলামত ও বিয়ের কাগজপত্র জব্দ

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, পাবনা

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

image

পাবনায় দলবেধে গৃহবধূকে ধর্ষণে থানায় তাদের একজনের সঙ্গে বিয়ের পর মামলার ঘটনার অন্যতম আসামি দাপুনিয়া ইউপি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ঘন্টুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল বেলা ১১টায় ঈশ্বরদীর মুলাডুলি এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাবনা সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইবনে মিজান এই তথ্য নিশ্চিত করেন। গ্রেফতারকৃত ঘন্টু সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের দড়িকামালপুর গ্রামের সিরাজ মাস্টারের ছেলে। এ নিয়ে এই মামলায় অভিযুক্ত ৫ আসামির দুই জনকে গ্রেফতার করা হলো।

সম্প্রতি ধর্ষণের মামলা না নিয়ে মীমাংসা করতে অভিযুক্ত যুবকের সঙ্গে গৃহবধূকে বিয়ে দেয়ার অভিযোগ ওঠে সদর থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে জেলা পুলিশ তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে ধর্ষণ মামলা নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেয় এবং পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবাইদুল হক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক ইকরামুল হককে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে।

পাবনা পুলিশ সুপারের নির্দেশে ৯ সেপ্টেম্বর রাতে পুলিশ ৫ জনকে আসামি করে মামলাটি নথিভুক্ত করে এবং ধর্ষণের অভিযোগে রাসেলকে গ্রেফতার করে। পরে বুধবার সকালে ঘটনার মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত শরিফুল ইসলাম ঘন্টুকে গ্রেফতার করা হয়। পরে মঙ্গলবার রাতে ডাক্তারি পরীক্ষা শেষে পরিবারের কাছে নির্যাতিতা গৃহবধূকে হস্তান্তর করে পুলিশ। তবে ঘন্টু স্থানীয় আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পদে থাকলেও তার অপকর্মের দায় দল নেবে না বলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে দাপুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর খান বলেন, ‘ঘন্টু আমার কমিটির যুগ্ম সম্পাদক। তিনি সভাপতি এবং আমার কোন কথা শুনেন না। তিনি তার মতো করে চলাফেরা করেন। আমরা বলেও তাকে সংশোধন করতে পারি নাই।’ কারোর ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় দল বহন করবে না বলেও তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, শরিফুল ইসলাম ঘন্টু গত ৪/৫ বছর পূর্বে সৌদি আরব থেকে ফিরে এসে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রীয় হন। অল্প দিনের মধ্যেই নিজস্ব বাহিনী তৈরি করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেন। তার ত্রাসের রাজত্বে ওই এলাকায় ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতারা কোণঠাসা হয়ে পরে।

সরেজমিনে ওই এলাকায় ঘুরে ঘন্টু বাহিনীর অপকর্মের সত্যতাও মিলেছে। তবে ভয়ে নাম প্রকাশ করে কেউ বক্তব্য না দিলেও ওসি ওবাইদুল হকের সঙ্গে ঘন্টুর বিশেষ সম্পর্কের বিষয়টি এলাকায় ‘ওপেন সিক্রেট’ বলেই মন্তব্য করেন স্থানীয়রা। তারা জানান, ঘন্টু বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সালিসি বাণিজ্য করলেও প্রশাসন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই। সর্বশেষ ধর্ষণ মামলা থেকে ঘন্টুকে বাঁচাতেই ওসি ওবাইদুল হক থানায় এই বিয়ের নাটক সাজান।

এ ঘটনার পর গত মঙ্গলবার পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে ধর্ষণের আলামত ও থানায় বিয়ে দেয়ার কাগজপত্র জব্দ করেন। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনাস্থল ঘন্টুর ব্যক্তিগত অফিস অপরাধস্থল হিসেবে চিহ্নিত করে ‘ক্রাইম’ সিল যুক্ত ফিতা দিয়ে ঘিরে দেন।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ও আলামত দেখে দলবদ্ধ ধর্ষণের সত্যতা মিলেছে। ওসির কাছে থেকে শো’কজ নোটিশের জবাব পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আসামিরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, এই ঘটনায় কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।

এদিকে থানায় বিয়ের বিষয়টি ওসি ওবাইদুল হক অস্বীকার করলেও পুলিশি তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার রাতে বিয়ের কাবিনামাসহ সমস্ত কাগজপত্র জব্দ করেছে পুলিশ।

এই বিয়ের কাজী মাওলানা ফজলুল হক আজম বলেন, যদিও বিবাহিত নারীকে তাৎক্ষণিকভাবে তালাকের পর বিয়ে দেয়ার কোন বিধি-বিধান নেই, তবুও ওসি ওবাইদুল হকের চাপে আমার এলাকার বাইরে গিয়ে বিয়ের কাজটি সম্পন্ন করতে হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কথিত ওই বিয়ের প্রমাণিক কাগজপত্রাদি জব্দ করেছেন। তবে এই অনিচ্ছাকৃত কাজের জন্য কাজী অনুতপ্ত বলেও জানান। উল্লেখ্য, কাজীর কর্ম এলাকা ঈশ্বরদী। জানা গেছে প্রথমে বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের জন্য পাবনা থানার নিকটবর্তী কাজী অফিসের কাজীকে ডেকে আনা হয়, তিনি বিয়ে পড়াতে এবং রেজিস্ট্রেশন করতে রাজি না হওয়ার পর সদর থানার ওসি কাজী মাওলানা ফজলুল হককে থানায় ডেকে এনে বিয়ে পড়ান।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ আগস্ট রাতে পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের যশোদল সাহাপুর গ্রামের তিন সন্তানের জননী এক গৃহবধূকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে রাসেল, ঘন্টু, ওসমান, হোসেন ও সঞ্জু নামের ৫ যুবক আটকে রেখে টানা ৪ দিন ধরে ধর্ষণ করে।

পরে গত ৫ সেপ্টেম্বর তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ওই গৃহবধূ নিজেই বাদী হয়ে পাবনা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে, মামলাটি নথিভুক্ত না করে অভিযুক্ত এক ধর্ষক রাসেলের সঙ্গে থানা চত্বরে বিয়ে দিয়ে ঘটনাটির নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন ওসি। এ সংবাদ গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে।

মহিলা পরিষদের স্মারকলিপি

পাবনা সদর থানার গণধর্ষণ অতপর ভিকটিমের অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযোগ আমলে না নিয়ে ধর্ষককে আটক করে থানা চত্বরে জোরপূর্বক বিয়ে দেয়াসহ দেশব্যাপী কন্যাশিশু ও নারী নির্যাতন, খুন-ধর্ষণ এর ঘটনার উদ্বেগ ও বিস্ময় প্রকাশ করে এবং উক্ত ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিয়ে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গতকাল পাবনা জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে।

ধর্ষক এবং এই জঘন্য ঘটনা ধামাপাচা দেয়ার প্রচেষ্টাকারী পুলিশ অফিসারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে মহিলা পরিষদ।