• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ১ কার্তিক ১৪২৫, ৫ সফর ১৪৪০

অহিউল্লাহ, আওয়াল ও সিরাজুদ্দিন উপেক্ষিত ভাষা শহীদ

সংবাদ :
  • সেবিকা দেবনাথ

| ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৮

image

‘ভাষা শহীদ’ বলতেই আমাদের মনে পড়ে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর এই পাঁচটি নাম। এর বাইরে আর কোন নাম আমাদের অনেকেরই জানা নেই। তাই ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সময় বলা হয় ‘নাম না জানা’। অথচ প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, ভাষা সংগ্রামীদের স্মৃতিচারণ, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ওই পাঁচ জন ছাড়া আরও তিনজন ভাষা শহীদের নাম ও পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তারা আজও পাননি ভাষা শহীদের স্বীকৃতি। উপেক্ষিত সেই তিন ভাষা শহীদ হলেন, ১০ বছর বয়সী অহিউল্লাহ, রিকশাচালক আবদুল আওয়াল এবং সিরাজুদ্দিন। তারা তিন জনই শহীদ হন ২২ ফেব্রুয়ারি।

অহিউল্লাহ : রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমানের ছেলে অহিউল্লাহ বাহান্নতে ছিলেন তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর সরকার ২২ ফেব্রুয়ারি সেনা মোতায়েন করে। নবাবপুর রোডেও ছিল অনেক সেনা। নবাবপুর রোড দিয়ে জনতার ঢল দেখে কৌতূহলবশত তা দেখতে এসেছিলেন অহিউল্লাহ। ঘটনার সময় অহিউল্লাহ মনের আনন্দে নবাবপুর রোডের পাশে ‘খোশমহল’ রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে কাগজ চিবুচ্ছিলেন। এমন সময় একটি গুলি তার মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়। গুলিতে মারা যাওয়ার পর পুলিশ অহিউল্লাহর লাশ গুম করে ফেলে। ২৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদে তার শাহাদাতের খবর ছাপানো হয়। তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। ঢাকা সিটি করপোরেশনের লাশ দাফনের খাতায় অহিউল্লাহর নাম পাওয়া গেলেও তার কবর শনাক্ত করা যায়নি। ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিকের শহীদ দিবস সংখ্যা-১৯৫৪ অনুযায়ী শহীদ হওয়ার পর অহিউল্লাহর পকেটে এক টুকরো কাগজ পাওয়া গিয়েছিল। এতে খুব সুন্দর শৈল্পিক গুণসহ প্রজাপতি ও জীব-জন্তুর ছবি আঁকা ছিল। ভাষাশহীদ অহিউল্লাহর মরদেহ প্রত্যক্ষকারী ছিলেন তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ভাষাসংগ্রামী ডা. মেজর (অব.) মোহাম্মদ মাহফুজ হোসেন। তিনি বলেন, ‘সেইদিনই (২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২) দুপুর বেলায় নবাবপুর রোডের মানসী হলের সম্মুখে স্কুলের ছাত্রদের একটি মিছিলের ওপর টইল মিলিটারির গাড়ি হইতে গুলি ছোড়া হয়। সেই জায়গায় সফিউল্লা (হবে অহিউল্লাহ) নামে ১০-১২ বয়সের একটি ছাত্র গুলিবিদ্ধ হইয়া মারা যায়। তাহার লাশ মেডিকেল মর্গে দেখিয়াছি। বুকের পকেটে তাহার নিজ হাতে থাকা প্রজাপতি সংবলিত এক টুকরা কাগজ ছিল।’ সাংবাদিক আহমেদ নূরে আলম ‘অহিউল্লাহ; বায়ান্নর একটি বিস্মৃত কিশোর-শহীদ’ শীর্ষক এক নিবন্ধে, অহিউল্লাহর বাসার ঠিকানা ছাপা হয় ‘১৫২ লুৎফর রহমান লেন’। নানাজনের কাছ থেকে অহিউল্লাহর শারীরিক বিবরণের কথা শুনে শুনে ভাষা আন্দোলন গবেষণাকেন্দ্র ও জাদুঘরের উদ্যোগে ২০০৭ সালের আঁকা হয়েছে অহিউল্লাহর ছবি। এই ছবিটিই ভাষাশহীদ অহিউল্লাহর একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন। ছবিটি এঁকেছেন শিল্পী শ্যামল বিশ্বাস।

আবদুল আওয়াল : ২৬ বছর বয়সী আবদুল আওয়াল পেশায় ছিলেন একজন রিকশাচালক। দৈনিক আজাদ এবং দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তার রিকশার লাইসেন্স নং ছিল- ৩৪০২। পিতার নাম মোহাম্মদ হালিম। ঢাকার ১৯ নম্বর হাফিজুল্লা লেন মৌলভী বাজারে থাকতেন। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে একুশের ভাষাশহীদদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যারাক হোস্টেল প্রাঙ্গণে। সেই জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন রিকশাচালক আবদুল আওয়াল। জানাজা শেষে বিশাল শোক মিছিল বের হয়। সেই শোক মিছিলেও অংশ নেন তিনি। মিছিলটি যখন কার্জন হলের সামনের রাস্তা অতিক্রম করছিল, তখন অতর্কিতে একটি মিলিটারির ট্রাক মিছিলের এক পাশে উঠিয়ে দেয়া হয়। ট্রাকের আঘাতে সরকারি নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন আবদুল আওয়াল। সরকারি প্রেস নোটে অবশ্য বলা হয়েছিল, এটা নেহায়েত একটা সড়ক দুর্ঘটনা মাত্র। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, শোক মিছিল ছত্রভঙ্গ করতেই সরকারি নির্দেশে মিছিলের ওপর দিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর ট্রাক চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। আবদুুল আওয়ালের সাথে সেদিন কার্জন হল এলাকায় আরও নাম-পরিচয়হীন এক বালকও ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে শহীদ হয়েছিল। প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়েদউল্লার উপস্থিতিতে মাওলানা আবদুল গফুর তার জানাজা পড়ান। তাকে আজিমপুর গোরস্থানে সরকারি তত্ত্বাবধানে অজ্ঞাত স্থানে সমাহিত করা হয়। ভাষা আন্দোলন ভিত্তিক বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা যায়, আবদুল আওয়াল ছিলেন বিবাহিত। ‘বসিরন’ নামে তার ৬ বছরের একটি কন্যাসন্তানও ছিল। বর্তমান শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৯৫৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। ওই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ভাষাশহীদ আবদুল আওয়ালের কন্যা বসিরন।

সিরাজুদ্দিন : সিরাজুদ্দিন নবাবপুরে ‘নিশাত’ সিনেমা হলের বিপরীত দিকে মিছিলে থাকা অবস্থায় টহলরত ইপিআর জওয়ানের গুলিতে মারা যান। সেরাজুদ্দিন ওরফে নান্না মিয়া ছিলেন সিরাজুদ্দিনের মৃত্যুদৃশ্য প্রত্যক্ষকারী একমাত্র সাক্ষী। তার সাক্ষ্যে জানা যায়, সিরাজুদ্দিন থাকতেন তাঁতিবাজারের বাসাবাড়ি লেনে। ভাষাসৈনিক ও গবেষক আহমদ রফিক তার ‘ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও উত্তর প্রভাব’ শীর্ষক গ্রন্থে (পৃ: ১৯৭) লিখেছেন, ‘কলতাবাজার মহল্লার অধিবাসী সেরাজুদ্দিন ওরফে নান্না মিয়া একাধিক মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করেছেন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। তিনি ১৯৭২ সালে (তিনি তখন স্টেডিয়ামে দোকান-ব্যবসা চালান) এক সাক্ষাৎকারে লেখককে জানান, তিনি বাবুবাজার থেকেই চলমান মিছিলে অংশ নিয়ে সদরঘাটে রাস্তার মোড়ে পৌঁছান। সেখান থেকে ভিক্টোরিয়া বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে রথখোলায় পৌঁছাতেই দেখেন চকচকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সেনাবাহিনীর কয়েকজন জওয়ান ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে। তা সত্ত্বেও মিছিল সেøাগানে রাজপথ মুখরিত করে এগিয়ে চলে। সেরাজুদ্দিন মিছিলে চলতে চলতে দেখতে পান উল্টো দিক থেকে সৈন্য বোঝাই একটি ট্রাক ‘চৌধুরী সাইকেল মার্ট, বরাবর এসে থেমে যায়। এদিকে ‘মানসী’ সিনেমা হলের গলি থেকে পুলিশ ও জওয়ানদের একটি অংশ গলির মুখে এসে দাঁড়ায়। তখনি ট্রাক থেকে গুলি ছুটে আসে মিছিল লক্ষ্য করে। তার কিছু দূরে একজন তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। শার্ট-প্যান্ট পরা ঐ তরুণের কোমরের ওপর গুলি লাগে। রক্তে কাপড় ভিজে যায়। ঐ মিছিলের কয়েকজন তাকে ধরাধরি করে ‘মানসী’র গলিপথে নিয়ে বলে যায় তরুণেরও নাম সিরাজুুদ্দিন, ঠিকানা বাসাবাড়ি লেন, তাঁতিবাজার।’

উপেক্ষিত এই তিন ভাষা শহীদ প্রসঙ্গে ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরের নির্বাহী পরিচালক এম আর মাহবুব সংবাদ’কে বলেন, ভাষা শহীদরা আমাদের অহংকার। কিন্তু আজও সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিক এই পাঁচ জনের বাইরে কোন ভাষা সৈনিকের নাম আমরা জানি না। আজও বলতে হয় নাম না জানা ভাষা শহীদ। এটি দুঃখজনক। অথচ দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে ২২ তারিখ শহীদ হয়েছিলেন রিকশা চালক আবদুল আওয়াল। তার রিকশার লাইসেন্স নাম্বারসহ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। খুশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে মাথায় গুলি লেগে শহীদ হয়েছিলেন অহিউল্লাহ। নিশাত সিনেমা হলের সামনে সিরাজুদ্দিন নামে আরেকজন শহীদ হয়েছেন। তৎকালীন পত্রপত্রিকায় এবং বিভিন্ন গবেষণার তথ্য থেকে বেরিয়ে এসেছে এই তিনজন সেদিন শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যে এই তিনজন ভাষাসৈনিককে নিয়ে কোন গবেষণা হয়নি। তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতিও দেয়া হয়নি। কারা কারা শহীদ হয়েছিলেন, কাদের কোথায় কবর দেয়া হয়েছে, সেই সব গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরকারের হেফাজতে আছে। সেগুলো সরকারের পক্ষ থেকে উপস্থাপন করা হলে ভাষা শহীদদের প্রকৃত সংখ্যাটা আমরা পেতে পারি। আশা করবো সরকার উপেক্ষিত এই তিন ভাষা শহীদকেও রাষ্ট্রীয় সম্মান ও একুশে পদক দেবেন।