• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১১ বৈশাখ ১৪২৫, ১৭ শাবান ১৪৪০

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বর্ষবরণ

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৯

image

‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’ প্রতিপাদ্যে রোববার সকালে নববর্ষ বরণে ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা -সংবাদ

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ়প্রত্যয়ে বাঙালি জাতি বরণ করেছে বাংলা নববর্ষ ১৪২৬। নববর্ষবরণের মধ্য দিয়ে রোববার দিনব্যাপী বাঙালি জাতি জীর্ণ-পুরাতনকে পেছনে ফেলে সম্ভাবনার নতুন বছরে প্রবেশ করেছে। শহর-নগর, গ্রাম-গ্রামান্তরÑ সর্বত্রই ছিল বর্ষবরণের প্রাণোচ্ছল উৎসব তরঙ্গ। বর্ষবরণের নানা আয়োজনে মেতেছিল দেশবাসী। ঢাকার রমনার পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও টিএসসিসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছিল নানা অনুষ্ঠান। ওই আয়োজনে দলে দলে যোগ দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন রাজধানীবাসী। উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন বিদেশিরাও। প্রতিবারের মতো এ বছরও বর্ষবরণের মূল আয়োজন ছিল রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠান ছিল পহেলা বৈশাখের বড় আয়োজন।

‘অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে শুভবোধ জাগ্রত’ প্রতিপাদ্যে এবারের পহেলা বৈশাখ বরণ করেছে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। সকাল সোয়া ৬টায় রমনার বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জন্য যখন ক্ষোভে ফুঁসছে দেশ ঠিক ওই সময় ছায়ানটের বর্ষবরণের প্রভাতি আয়োজনে সব সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে শুভবোধের জাগরণের আহ্বান জানান ছায়ানটের সভাপতি সন্জীদা খাতুন। এ সময় অনুষ্ঠানস্থলে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এক মিনিট নীরবতায় সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করার শপথ নেন অনুষ্ঠানে আগতরা। প্রভাতি এ আয়োজনে ছায়ানটের শিল্পীরা গেয়ে শোনান ১৩টি গান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন শাহ্? ও পঞ্চকবির বিভিন্ন গান পরিবেশন করা হয় ছায়ানটের এবারের আয়োজনে। যথারীতি জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।

এর আগে শুভবোধ জাগরণের আহ্বান জানিয়ে সন্জীদা খাতুন বলেন, ‘অন্তরে ইচ্ছা জাগুক’, ‘ওরা অপরাধ করে’- কেবল এই কথা না বলে প্রত্যেকে নিজেকে বিশুদ্ধ করার চেষ্টা করি। আর আমরা যেন নীতিবিহীন অন্যায়-অত্যাচারের নীরব দর্শক মাত্র হয়ে না থাকি। প্রতিবাদ, প্রতিকার সন্ধানে হতে পারি অবিচল। নববর্ষ এমন বার্তাই সঞ্চার করুক আমাদের অন্তরে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা : পহেলা বৈশাখ বরণের প্রধান আকর্ষণ ছিল চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। সকাল সাড়ে ৯টায় মঙ্গল শোভাযাত্রা উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। বাদ্যের তালে তালে তরুণ-তরুণীদের নৃত্য, হৈ-হুল্লোড় আর আনন্দ-উল্লাস মাতিয়ে রেখেছিলেন পুরো শোভাযাত্রা। ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’ প্রতিপাদ্যে এবারের শোভাযাত্রার বাঘ ও বকের অনুষঙ্গকে মূল শিল্প কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়। রঙ-বেরঙের মুখোশ, শোলার পাখি, টেপাপুতুল, ঢাকঢোল-বাঁশি, লোকজ ঐতিহ্যের গাজীর পটের গাছ ইত্যাদি শিল্পকর্মগুলো নিয়ে শোভযাত্রায় অংশ নেন চারুকলার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। চারুকলা থেকে বের হয়ে শাহবাগ মোড়, ঢাকা ক্লাব ও শিশুপার্কের সামনে দিয়ে টিএসসি ঘুরে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হয় শোভাযাত্রাটি। গতবারের মতো এ বছরও ছিল মুখোশ ব্যবহার নিষিদ্ধ। শোভাযাত্রার নিরাপত্তার স্বার্থে রমনা পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশ এলাকার সব রাস্তা এ সময় বন্ধ করে দেয়া হয়।

হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ : চ্যানেল আই ও সুরের ধারার উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম এই আয়োজন। এবারের আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবুল মোমেন এমপি, ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলী দাস, ইউনিলিভার বাংলাদেশের সিইও কেদার লেলে প্রমুখ। এ সময় লোটে শেরিংকে উৎসবের উত্তরীয় পরিয়ে দেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ। তিনি প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বর্ষবরণ উৎসব উপভোগ করেন। তার সম্মানে সংগীত পরিবেশন করেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এবং সারাদেশ থেকে আসা হাজারো শিল্পী। বাংলা ও ভুটানের ভাষায় ‘রাঙামাটির রঙে চোখ জোড়ালো’ গানটি পরিবেশন করেন কোনাল। এরপর লোটে শেরিংকে মঞ্চে নিয়ে আসেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, শাইখ সিরাজ ও সুরের ধারার চেয়ারম্যান রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে লোটে শেরিং বাংলায় বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। এ সময় তিনি দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা পান্তা ভাত খাইয়েছেন?’ আমি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর ঢাকায় এফসিপিএস করেছি। আসলে আমার মন উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত অনুভব করছে কখন ময়মনসিংহ যাব। বাংলায় তার মুগ্ধকর কথা শুনে উপস্থিত সবাই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠে একযোগে করতালি দিয়ে বাংলাদেশের বন্ধু লোটে শেরিংকেও শুভেচ্ছা জানান। এবারের এ আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘লোকসুরে বাংলা গান’। ছিল নৃত্য পরিবেশনা এবং আবৃত্তি পাঠ ও ফ্যাশন শো। উৎসবের মেলায় স্টলগুলো শোভা পায় বাঙালির হাজার বছরের বিভিন্ন ঐতিহ্যের উপাদান, বৈশাখের হরেক রকম পণ্যসামগ্রী, পিঠা-পুলি, মাটির তৈরি তৈজস, বেত, কাঁথা, পিতল, পাট ও পাটজাত দ্রব্যের জিনিসপত্রসহ রকমারি পণ্যসামগ্রী।

বাংলা একাডেমি : বর্ষবরণ উপলক্ষে বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। একাডেমির রবীন্দ্র চত্বরে আয়োজিত নববর্ষ বক্তৃত অনুষ্ঠানে মূল বক্তা ছিলেন প্রাবন্ধিক মফিদুল হক। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন সেমন্তী মঞ্জরী, জুলি শারমিন, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, মশিউর রহমান রিংকু ও ইসরাত জাহান জুঁই। এছাড়া নববর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বইয়ের ‘আড়ং’য়ের আয়োজন করা হয়। বৈশাখের সকালে দশ দিনের এই আড়ংয়ের উদ্বোধন করেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। ১০ বৈশাখ শেষ হবে এই বইয়ের আড়ং।

শিল্পকলা একাডেমি : শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পরিবেশিত হয় বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী লোকজ পরিবেশনাÑ লাঠিখেলা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নৃত্য, ঢাকঢোল পরিবেশনা, লোকনৃত্য, সাইদুলের কিচ্ছা ও অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী।

জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয় : সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান। শোভাযাত্রাটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, ওয়াইজঘাট, আহসান মঞ্জিল, মুন কমপ্লেক্স, পাটুয়াটুলী, বাটা ক্রসিং হয়ে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসে। শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘নদী’। শোভাযাত্রার মূল স্লোগান ছিল, ‘বাঁচলে নদী বাঁচবে দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত মেলায় গ্রামীণ খাবার ও মাটির তৈরি তৈজসপত্র এবং খেলনার স্টল স্থান পায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শোভাযাত্রা : বাংলা নববর্ষবরণে রাজধানীতে অ্যান্টিটেরোরিজম শোভাযাত্রা বের করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট। বৈশাখের দুপুর ১২টার দিকে রমনা পার্কে পুলিশের সাব-কন্ট্রোল রুমের সামনে শোভাযাত্রাটির উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এ সময় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া উপস্থিত ছিলেন। সাব-কন্ট্রোল রুম থেকে বের হয়ে শাহবাগ প্রদক্ষিণ করে পুনরায় সাব-কন্ট্রোল রুমে গিয়ে শেষ হয় শোভাযাত্রাটি।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট : বিকাল ৪টায় ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চে যন্ত্রসংগীতের মাধ্যমে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। জোটের এই অনুষ্ঠানে দলীয় সংগীত পরিবেশন করে বহ্নিশিখা, স্বভূমি লেখক শিল্পীকেন্দ্র। রবীন্দ্রসংগীত, শাহ আবদুল করিমের গান, ধামাইল, হাসন রাজার গান, লোকগীতি, লালনগীতি, বাউলসংগীত, ভাওয়াইয়া গান পরিবেশন করেন শিল্পীরা।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যজন ও সংগীতাঙ্গন মনিপুর। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল কল্পরেখা, ইউসেপ স্কুল, আগারগাঁও আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও বধ্যভূমির সন্তান দলের পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে বাউল গান পরিবেশন করেন রঞ্জিত দাস বাউল ও মমতা দাসী।

বিএসএমএমইউ : বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম আয়োজনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ বরণ করেছে। এদিন সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পূবালী ব্যাংকের সামনে শাহবাগ মোড়ে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিএসএমএমইউয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির : ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলা প্রাঙ্গণে বর্ষবরণ কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখী মেলা।

এছাড়া জাতীয় জাদুঘর, নজরুল একাডেমি, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট, সোনারগাঁও, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, ঢাকা রিজেন্সি, ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, অফিসার্স ক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠান নানা আয়োজনে বর্ষবরণ করে।