• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ জিলকদ ১৪৪১

২৫ বছরে চার শতাধিক নৌদুর্ঘটনা

অবৈধ নৌযানের ডাটাবেজ তৈরি করতে পারেনি নৌমন্ত্রণালয়

সংবাদ :
  • ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

| ঢাকা , মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২০

সারাদেশে ছোট-বড় মিলে কত জাহাজ নৌযান চলাচল করে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই নৌমন্ত্রণালয়ে। সারাদেশের নৌযানের ডাটা তৈরির জন্য একটি প্রকল্প নেয়া হলেও পরিকল্পনা কমিশনে তা আটকে আছে। তাই সারাদেশে অবৈধ নৌযানের কোন তথ্য নেই নৌপরিবহন অধিদফতরে। অথচ নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ও অদক্ষ চালকসহ ১০টি কারণে গত ২৫ বছরে প্রায় ৪ শতাধিক নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৪ হাজারের অধিক মানুষ নিহত হয়েছে বেসরকারি সূত্র জানায়। সর্বশেষ গতকাল বুড়িগঙ্গা নদীতে মুর্নিংবার্ড নামের একটি দেড় তলা লঞ্চডুবির ঘটনায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনও অনেকে নিখোঁজ আছে বলে স্থানীয়রা জানান।

জানা গেছে, নৌযানে ত্রুটিপূর্ণ নকশা প্রণয়ন ও অনেকক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে নৌযান নির্মাণ, অবকাঠামোগত ও যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস প্রদান, অদক্ষ মাস্টার ও ড্রাইভার দিয়ে নৌযান পরিচালনা, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য বোঝাই করে অবৈধ নৌযান চলাচল, আবহাওয়ার পূর্বাভাস যথাযথভাবে অনুসরণ না করাসহ একাধিক কারণে ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০১৪ সালে পদ্মা নদীর মাওয়া ঘাটে ডুবে যাওয়া এমএল পিনাক-৬টি আবহাওয়া পূর্বাভাস অমান্য করে পদ্মা পাড়ি দিয়েছিল। ফিটনেস না থাকার পরও এই লঞ্চটিকে টোকনের (সিøপের) মাধ্যমে সাময়িক চলাচলের অনুমতি নেয়া হয়েছিল বলে নৌপরিবহন অধিদফতর সূত্র জানায়। এছাড়া নৌপথে দিক-নির্দেশক বিকন ও বয়াবাতি না থাকা, নাব্যতা সংকট ও ডুবোচর, নৌপথে কারেন্ট জাল বিছিয়ে রাখা এবং আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়ে একাধিক লঞ্চ দুর্ঘটনায় শিকার হয়েছে। তবে গতকাল দুর্ঘটনায় দুই লঞ্চের ফিটনেস সদন ছিল বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) কমডোর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম।

তিনি মুঠোফোসে সংবাদকে বলেন, গতকাল বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় তদন্ত ছাড়া কিছু বলা যাবে না। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে দুটি লঞ্চেই ফিটনেস সদন ছিল। একটি লঞ্চ ঘাটের ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। অপর লঞ্চটি ঘাটে নোঙর করার জন্য আসছিল। এরমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে। এটা একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট। তাই তদন্ত ছাড়া কিছু বলা যাবে না। সারাদেশে নৌযানের ডাটা তৈরির জন্য একটি প্রকল্প পরিকল্পনা জমা দেয়া আছে। কিন্তু এখনও অনুমোদন করা হয়নি বলে কাজ শুরু করা যায়নি বলে জানান তিনি।

নৌমন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, নৌপথে দুর্ঘটনার এসব কারণের মধ্যে প্রধান কারণে হলো ত্রুটিপূর্ণ নকশা প্রণয়ন ও অনুমোদিত নকশা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে নৌযান নির্মাণ করা। এছাড়া অবকাঠামোগত ও যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস প্রদান করা। দেখা যায়, অনেকক্ষেত্রে নৌযান নির্মাণে কোন নকশা অনুসরণ করা হয় না। এছাড়া কর্মকর্তাদের গফলতির কারণে নৌযানের অবকাঠামোগত যান্ত্রিক ত্রুটি সঠিকভাবে যাচাই-বাচাই না করেই ফিটনেস প্রদান করা হয়। তাই বিভিন্ন সময় এসব ফিটনেসবিহীন নৌযানেই দুর্ঘটনায় শিকার হয়ে থাকে। এছাড়া নৌযানে বার্ষিক সার্ভে করার সময় কালক্ষেপণ করা হয়। এতে নৌযানের মালিকরা যাতে আর্থিক ক্ষতির শিকার না হয়। সেজন্য টোকনের (স্লিপের) মাধ্যমে সাময়িক চলাচলের অনুমতি দেয়া হয় নৌযানকে। তাই এই টোনেক নিয়ে চলাচলের সময়ও দুর্ঘটনায় শিকার হয় নৌযানগুলো। এছাড়া সারাদেশে কত নৌযান রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেসবিহীন তার সঠিক তথ্য নেই নৌপরিবহন অধিদফতরে।

এ বিষয়ে নৌপরিবহন অধিদফতরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মো. মনজুরুল কবীর সংবাদকে বলেন, সারাদেশে কত হাজার অবৈধ নৌযান আছে সেই তথ্য আমাদের কাছে নেই। সারাদেশের নৌযানের ডাটাবেজ তৈরির জন্য একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু অনুমোদন হয়নি। এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার নৌযান ফিটনেস সনদ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, অদক্ষ মাস্টার ও ড্রাইভার (চালক) নিয়োগও দুর্ঘটনায় অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, বৈধ নৌযানেও অদক্ষ-অপেশাদার মাস্টার-ড্রাইভার দ্বারা পরিচালিত হয়। এর ফলেও ঘটে নৌদুর্ঘটনা। ২০১২ সালের ১২ মার্চ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে নিমজ্জ্বিত হয় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি শরীয়তপুর-১; এই দুর্ঘটনার পর উদ্ধার করা হয় ১৪৭টি লাশ। এই ট্র্যাজেডির পর সরকারি তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দুর্ঘটনাকবলিত দোতলা লঞ্চটির মাস্টার ও ড্রাইভারের নাম লঞ্চমালিক নিজেই বলতে পারেননি বলে তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়।

অবৈধ নৌযানও দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ। গত ১৫ মে-২০১৪ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে এমভি মিরাজ-৪ এবং এর মাত্র ১২ দিন আগে ৩ মে পটুয়াখালীর গলাচিপায় রামদাবাদ নদীতে দুর্ঘটনাকবলিত এমভি শাতিল-১। দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট দফতরের নথিপত্র যাচাই, লঞ্চ দুটির নকসা ও অবকঠামো পরীক্ষা এবং তদন্ত কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে জানা গেছে, যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও এ দুটি যাত্রীবাহী নৌযানকে ফিটনেস সনদ দেয়া হয়েছিল। অবকাঠামোগত মারাত্মক ত্রুটির কারণেই সামান্য কালবৈশাখী ঝড়ের আঘাতে ভারসাম্য হারিয়ে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে লঞ্চ দুটি ডুবে যায়। এছাড়া এমভি মিরাজ-৪ ও এমভি শাতিল-১- দুটি লঞ্চেই ছিলেন অদক্ষ মাস্টার। তারা আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও তাৎক্ষণিক ঘূর্ণিঝড় উপেক্ষা করে নৌযান দুটি চালাচ্ছিলেন। অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল অধ্যাদেশ ইনল্যান্ড সিপিং অর্ডিনেন্স (আইএসও)- ১৯৭৬ এর অধীনে প্রণীত বিধি অনুযায়ী, নৌযানের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সনদ এবং মাস্টার ও ড্রাইভারের সনদ যাচাই এবং যাত্রীসংখ্যা গণনার পরই সেটি ছাড়ার অনুমতি দেয়ার (ভয়েজ ডিক্লারেশন) বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর বন্দর এবং নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক (নৌ-নিট্রা) বিভাগের। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্দর কর্মকর্তা ও ট্রাফিক ইনস্পেক্টররা (টিআই) এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়। এছাড়া অবৈধ নৌযান চলাচল, আবহাওয়ার পূর্বাভাষ যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, নৌপথে দিক-নির্দেশক বিকন ও বয়াবাতি না থাকা, নাব্যতা সংকট ও ডুবোচর, নৌপথে কারেন্ট জাল বিছিয়ে রাখা এবং আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে লঞ্চ দুর্ঘটনায় শিকার হয়ে থাকে। তবে অনেক দুর্ঘটনার জন্য বালুবাহী নৌযানই বেশি দায়ী করছে তদন্ত কমিটি। ২০১৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুরের মতলব যাওয়ার পথে মুন্সীগঞ্জের মেঘনা নদীতে নিমজ্জিত হয় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি সারস। এটি মিথিলা ফারজানা নামের বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় ডুবে যায়। এতে ১৬ জনের লাশের উদ্ধার করা হয়। এছাড়া অনেক যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন বলে তাদের স্বজনরা দাবি করেছেন। এদিকে লঞ্চে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয়া, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার ব্যবস্থা আছে কিনা- এগুলো খোঁজ নেয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষে (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু তাও সঠিকভাবে কর্মকর্তারা তত্ত্বাবধায়ন করছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়।

নৌমন্ত্রণালয় সূত্রে জানায়, ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৪ সালে আগস্ট পর্যন্ত ৩৯৩টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৬১৩ জন লোক নিহত হয়েছেন। এছাড়া এই সব ঘটনায় ৪৭৯ জন আহত এবং নিখোঁজ রয়েছে প্রায় ৪৬২ জন মানুষ। তবে এই দুই যুগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নৌদুর্ঘটনা ঘটে ২০০১ সালে। সে বছর এর সংখ্যা ছিল ৩১টি। ২০০৫ সালে নৌদুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ২৮টি, ২০০২ সালে ২৬টি ও ২০০৩ সালে ২৩টি। আর ২০টি করে নৌদুর্ঘটনা ঘটে ১৯৯৩, ১৯৯৬, ২০০৪ ও ২০০৬ সালে। ১৯টি করে দুর্ঘটনা ঘটে ১৯৯১ ও ২০০০ সালে। ১৯৯২ সালে ১৭টি, ২০১০ সালে ১৬টি ও ২০১২ সালে ১৫টি দুর্ঘটনা ঘটে। এই নৌদুর্ঘটনার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই মামলা করে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর। গত দুই যুগে ৩১০টি মামলা করা হয়েছে। ২০০১ সালে সবচেয়ে বেশি মামলা হয় ২৯টি। এরমধ্যে ২২টি মামলায় শাস্তি হয়। বাকি ৭টি মামলা খারিজ হয়। ২০০২ সালে মামলা হয় ২৩টি, যার মধ্যে ১৯টিতে শাস্তি হয়। ২০০৩ সালে ২১টির মামলার মধ্যে ১৬টিতে ও ২০০৫ সালে ২০টির মধ্যে ১৮টিতে দায়ীদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা ও ৩ বছরের কারাদ- দেয়ার বিধান রয়েছে মেরিন কোর্টে। তবে আবার আপিল বিভাগে গিয়ে স্থগিত করে নিয়ে আসে আসামিরা।