• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ মহররম ১৪৪১

অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে গেলেন রুবেল ও দিদার

সংবাদ :
  • নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , শনিবার, ১৬ মার্চ ২০১৯

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে দুটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় অবিশ^াস্যভাবে বেঁচে গেলেন বাংলাদেশি নাগরিক রুবেল ও দিদার। গুলিতে রুবেল আহত হয়েছেন। দিদার রক্ষা পেলেন গাড়ির নিচে লুকিয়ে। আল নূর মসজিদের ভেতরে গতকাল সন্ত্রাসীর গুলিতে আহত হয় রুবেল। এ সময় তিনি ছটফট করছিলেন। কিছুক্ষণ পর মো. দিদার তার ভাইয়ের খোঁজে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করেন। তার কাছে পানি চান গুলিবিদ্ধ রুবেল। দিদার তাকে পানি পান করান। এরপর আহত রুবেলকে উদ্ধার করে নেয়া হয় ক্রাইস্টচার্চ হাসপাতালে। সেখানে গতকাল বাংলাদেশ সময় বিকেলে তার শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়।

আহতদের অনেকে পানি চেয়ে বাঁচার আকুতি জানিয়েও বাঁচতে পারেননি। আহত বাংলাদেশি রুবেল সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ ছোট শহর। লোকসংখ্যা কম। শহরের মসজিদে গতকাল সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত হামলায় ৪৯ জন নিহত হয়েছে। আহতদের ওপর বন্দুকধারী সন্ত্রাসী দ্বিতীয় দফা গুলিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে গেছে। দিদারের কাছ থেকে এই লোমহর্ষক ঘটনা শোনেন তার বন্ধু এহসানুল বাশার। তিনি নিউজিল্যান্ডের এক প্রবাসী বাংলাদেশি। এহসানুল বাশার সাংবাদিকদের বলেন, আরও অনেকের মতো আমার বন্ধু দিদারকেও হয়তো আজ হারাতে হতো। কিন্তু তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। আল নূর মসজিদে ঢোকার সময়ই গুলির শব্দ শুনতে পান দিদার। গুলির শব্দ কানে আসতেই মসজিদের মূল ভবনের পাশের দরজা দিয়ে বাইরে চলে আসেন দিদার। বাইরে এসে সোজা চলে যান মসজিদের গাড়ি রাখার জায়গায়। বিরামহীন গুলির শব্দে একটি ব্যক্তিগত গাড়ির নিচে লুকিয়ে পড়েন দিদার। কিছু সময় পর গুলির শব্দ থেমে গেলে দিদার মসজিদের ভেতরে যান ভাই মিনারকে খুঁজতে। মিনারও পালিয়ে বের হয়েছিলেন। পরে দিদার মসজিদের ভেতরে ঢোকার পর দেখেন নারকীয় দৃশ্য।

দিদারের বরাতে এহসানুল বাশার বলেন, আল নূর মসজিদের ভেতরে রক্তাক্ত অসংখ্য নিস্তেজ দেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। গুলিবিদ্ধ অনেকে ছটফট করছিলেন। কেউ আবার এক ফোঁটা পানির জন্য কাকুতি-মিনতি করছিলেন। দিদারকে দেখে রুবেল নামের গুলিবিদ্ধ এক বাংলাদেশি পানি চেয়েছিলেন। তাকে পানি দিয়ে দিদার বাইরে চলে যান। ঠিক এই সময় বন্দুকধারী আবারও বন্দুকে গুলি ভরে মসজিদের ভেতরে আসে। আহত যারা ছিলেন, বেছে বেছে তাদের দিকে আবারও গুলি চালায় বন্দুকধারী। এই দফায় রুবেল মৃত হওয়ার ভান করে নিজের প্রাণ রক্ষা করেন।

এহসানুল বাশার বলেন, ১৪ বছরের বেশি সময় ধরে নিউজিল্যান্ডে বসবাস করছিল। কিন্তু অকারণে কাউকে একটুও চিৎকার করতে দেখেনি। আর উগ্রবাদী চিন্তা তো দূরের কথা। শ্রেণীভেদেও কারও মধ্যে নাক সিঁটকানো ভাব নেই। বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ শহর ক্রাইস্টচার্চ। সেই শহরেই এই নৃশংস হামলা! এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না।

নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যান্টারবুরির শিক্ষক ড. মেজবাহউদ্দিন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন তিনি। হুট করেই শুনতে পান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘লকডাউন’ হয়েছে। নিরাপত্তারক্ষীদের তাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনে ঢুকে পড়েন তিনি। লকডাউনের আগেই অবশ্য মানুষের মুখে মুখে তিনি জেনে যান সেই ভয়ংকর খবর। হামলা হয়েছে ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে। শুরু হয় চরম উৎকণ্ঠার সময়। স্থানীয় সময় অনুযায়ী ক্রাইস্টচার্চে তখন নেমে এসেছে রাত। রাস্তা তখন একদম ফাঁকা, গাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে। শুধু শোনা যাচ্ছে পুলিশের গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। আকাশে উড়ছে হেলিকপ্টার।

মেজবাহউদ্দিন বলেন, প্রথমে শুনেছিলেন একটি মসজিদে হামলা হয়েছে। পরে জানা যায়, হামলা হয়েছে দুটি মসজিদে। স্থানীয় সময় দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়েই থাকতে হয়েছে তাকে। কারণ পুরো শহরই তখন অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল। লকডাউন শেষ হয় সন্ধ্যা ৬টায়, এর পর বাসায় ফিরতে পেরেছেন তিনি। চার ঘণ্টারও বেশি সময় চরম উৎকণ্ঠায় কেটেছে তার। বাসায় ফিরতে পারলেও কাটেনি আতঙ্কের আবহ। ক্রাইস্টচার্চেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন মেজবাহউদ্দিন। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। তার দুই ছেলেরই স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি। দুপুর ১২টার কিছু পরে তার স্ত্রী ছেলেদের নিয়ে ঘরে ফিরেছিলেন। এর পরই ঘটে মসজিদে হামলার ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকার পুরোটা সময় তার কেটেছে ফোনে। স্ত্রী-সন্তানদের খোঁজ নিয়েছেন, আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে কথা বলেছেন ক্ষণে ক্ষণে। ক্রাইস্টচার্চে বাংলাদেশিদের সংখ্যা তুলনামূলক কম বলে জানান মেজবাহ। তিনি বলেন, সংখ্যাটি হবে ৩০০ থেকে ৫০০। তার বাসাও হ্যাগলি পার্কের কাছে। হামলার পর বাসায় ফিরেও কিছুটা অবরুদ্ধ অবস্থাতেই আছেন সবাই।