• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

রবিবার, ০৭ জুন ২০২০, ২৪ জৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

সাগরে তেল-গ্যাস

অনুসন্ধানে জট খুলছে

২২টি ব্লকে বিডিং শিগগিরই

    সংবাদ :
  • ফয়েজ আহমেদ তুষার
  • | ঢাকা , বুধবার, ১১ মার্চ ২০২০

দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর সমুদ্রের অগভীর ও গভীর অংশে উন্মুক্ত ২২টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের (বিডিং রাউন্ড) উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। আগামী সপ্তাহে এ সংক্রান্ত একটি সময়সূচি ঘোষণা করা হবে। দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এ খাতে নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক আদালতে ২০১২ সালে মায়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর সর্বমোট এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চলের মালিক হয় বাংলাদেশ। এরপর কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বিশাল এই সমুদ্র এলাকার সম্পদ আহরণে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। যেখানে মায়ানমার ও ভারত তাদের সমুদ্রসীমা থেকে তেল-গ্যাস তুলছে। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অধীনে ২৬টি গ্যাস ব্লক রয়েছে। এরমধ্যে গভীর সমুদ্রে রয়েছে ১৫টি ব্লক। আর অগভীর সমুদ্রে ব্লক সংখ্যা ১১টি। সেগুলোর মধ্যে ২২টি নিয়ে এখনও কোন চুক্তি হয়নি। বর্তমানে অগভীর সমুদ্রের ব্লল্ক এসএস ১১ সান্তোস ও ক্রিস এনার্জি এবং এসএস ৪ ও এসএস ৯ নম্বর ব্লক ভারতীয় দুটি কোম্পানি ওএনজিসি ভিদেশ (ওভিএল) ও অয়েল ইন্ডিয়া (ওআইএল) ইজারা নিয়েছে। আর গভীর সমুদ্রে ডিএস ১২ নম্বর ব্লকের জন্য ২০১৭ সালে কোরিয়ান কোম্পানি পেসকো দাইয়ুর সঙ্গে পিএসসি সই হয়। কোম্পানিটি কিছু জরিপ কাজও সম্পন্ন করেছে। কিন্তু এখন তারা ব্লক ছেড়ে যেতে চাইছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ভালো সাড়া মিলেনি। যেসব আন্তর্জাতিক কোম্পানি চুক্তি করে কাজ শুরু করেছে তারাও পরবর্তীতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কোম্পানিগুলো বলছে চুক্তিতে গ্যাসের যে দর ধরা হয়েছে তা অনেক কম, যা বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত নয়। পরবর্তীতে সরকার তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রণীত মডেল উৎপাদন-অংশীদারিত্ব চুক্তিতে (পিএসসি) পরিবর্তন এনে নতুন মডেল পিএসসি-২০১৯ ঘোষণা করে। এতে গ্যাসের দাম বাড়ানো ছাড়াও তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর জন্য গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকার মনে করছে এতে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহী হবে। ২০০৮ সালের মডেল পিএসসিতেও গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছিল। পরে সমালোচনার মুখে তা বাতিল করা হয়। ওই পিএসসির অধীনে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কয়েকবার দরপত্র আহ্বান করেও পর্যাপ্ত সাড়া পায়নি পেট্রোবাংলা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস রপ্তানির সুযোগ এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা না থাকায় আইওসিগুলো সেভাবে দরপত্রে অংশ নেয়নি।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, মুজিববর্ষকে সামনে রেখে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ আগামী সপ্তাহে এ সংক্রান্ত একটি সময়সূচি ঘোষণা করবে। জ্বালানি বিভাগ মুজিববর্ষের মধ্যে (২০২১ সালের ১৭ মার্র্চের মধ্যে) দরপ্রক্রিয়া শেষ করতে চাইছে। যাতে একটা সুখবর সবাইকে জানানো যায়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সরকার তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোরালো উদ্যোগ নিচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলাকে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন পিএসসিতে কিছু সংশোধন আনা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়।

মডেল পিএসসি অনুযায়ী প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের জন্য আন্তর্জাতিক কেম্পানিগুলো ৭ দশমিক ২৫ ইউএস ডলার পাবে। আগের পিএসসিতে এর পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৫ ডলার। নতুন পিএসসি অনুযায়ী রপ্তানির আগে আইওসিগুলো পেট্রোবাংলাকে গ্যাস কেনার প্রস্তাব দিবে। পেট্রোবাংলা গ্যাস না কিনলে তা দেশের ভেতর তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির চেষ্টা করা হবে। তাতেও ব্যর্থ হলে পরে রপ্তানি করা যাবে। আইওসিগুলো সমুদ্রে যে গ্যাস পাবে তাতে তার অংশ ও পেট্রোবাংলা অংশ দুটোই রপ্তানি করতে পারবে।

নাইকো মামলায় ক্ষতিপূরণ আদায়ে সরকারের অগ্রগতি

নাইকোর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ আদায়ে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত ‘ইকসিডে’ করা মামলার রায় বাংলাদেশের পক্ষে আসতে শুরু করেছে। বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপুটেড (ইকসিড)’ ট্রাইব্যুনাল ক্ষতিপূরণ ঘোষণার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দায়বদ্ধতা সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে, যা বাংলাদেশের পক্ষে এসেছে বলে দাবি করেছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে গ্যাসক্ষেত্র ধবংস করায় কানাডার কোম্পানি নাইকো রিসোর্সের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা সহজ হবে। শীঘ্রই সংবাদ সম্মেলন করে জ্বালানি বিভাগ রায় সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। সূত্র জানায়, ক্ষতিপূরণ আদায় বন্ধ করার জন্য নাইকোর করা আবেদনের বিপক্ষেই এই সিদ্ধান্ত এসেছে। এতে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস সম্পদ ধ্বংস করায় নাইকোর কাছে বাংলাদেশ যে ক্ষতিপূরণ চেয়েছে তা আদায় করা সহজ হবে। কারণ টেংরিটিলা গ্যাসক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পেছনে নাইকোর দায় রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক আদালত থেকে একটি ভালো খবর এসেছে। শীঘ্রই জাতির সামনে তা তুলে ধরা হবে।

সরকার টেংরাটিলা, ফেনী ও কামতা গ্যাসক্ষেত্রকে ‘প্রান্তিক’ (যে ক্ষেত্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে) দেখিয়ে সেখান থেকে গ্যাস তোলার জন্য ১৯৯৯ সালে নাইকো-বাপেক্স যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে চুক্তি করে। ওই চুক্তির অধীনে নাইকোর অদক্ষ কূপ খনন প্রক্রিয়ার কারণে ২০০৫ সালে দুইবার (৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন) সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে ওই গ্যাসক্ষেত্র ও সন্নিহিত এলাকায় পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

পেট্রোবাংলা প্রথমে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু তা সফল না হওয়ায় ২০০৮ সালে ঢাকার দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ৭৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করে। অন্যদিকে, ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে নাইকো-বাপেক্সের যৌথ চুক্তির অধীনে গ্যাস তুলে জাতীয় গ্রিড দেয়া হচ্ছিল। টেংরাটিলা বিস্ফোরণের পর পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) হাইকোর্টে একটি মামলা করে। তাতে টেংরাটিলার ক্ষতিপূরণ দাবি করা ছাড়াও বলা হয়, নাইকোর সঙ্গে সরকার অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চুক্তিটি করেছে। তাই চুক্তি বাতিল করা দরকার। কিন্তু হাইকোর্ট চুক্তি বাতিলের কোনো নির্দেশনা দেননি। তবে টেংরাটিলার ক্ষতিপূরণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত নাইকোকে ফেনীর গ্যাসের দাম পরিশোধ না করার আদেশ দেন। ফলে পেট্রোবাংলা নাইকোকে গ্যাসের দাম দেয়া বন্ধ করে দেয়।

পেট্রোবাংলার আটকে রাখা ওই অর্থ আদায়ে ও ক্ষতিপূরণ না দেয়ার জন্য ২০১০ সালে ইকসিডে দুটো মামলা দায়ের করে নাইকো। আন্তর্জাতিক আদালত ২০১৪ সালে পাওনা পরিশোধে নাইকোর পক্ষে রায় দেয়। ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের পাওনা বাবদ আটকে রাখা অর্থ সুদসহ নাইকোকে পরিশোধ করতে বলে। তবে দেশের আদালতে মামলা থাকায় এখনও এই অর্থ পরিশোধ করতে হয়নি। ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ ইকসিডে চুক্তি সম্পাদনে নাইকোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে বাংলাদেশ। দাবির সপক্ষে তারা কানাডার আদালতে নাইকোর বিরুদ্ধে সেদেশের করা সরকারের মামলার নথিপত্র সংগ্রহ করেছে যাতে প্রমাণিত হয়েছে এ গ্যাসক্ষেত্রের ইজারা পেতে কোম্পানিটি দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিল। টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণের পর তখনকার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেন নাইকোর কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। সমালোচনার মুখে ২০০৫ সালের ১৮ জুন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য হন মোশাররফ। পরে কানাডার আদালতে নাইকো স্বীকার করে যে, ২০০৫ সালের মে মাসে মোশাররফকে প্রায় ২ লাখ ডলার দামের একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার (গাড়ি) উপঢৌকন দিয়েছিল তারা। এর বাইরেও বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ বাবদ ৫ হাজার ডলার দেয়া হয়েছিল তাকে। ঘুষ দেয়ার কারণে কানাডার আদালতের রায়ে নাইকোকে ৯৫ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়।