• banlag
  • newspaper-active
  • epaper

সোমবার, ২৪ জুন ২০১৯, ১০ আষাঢ় ১৪২৫, ২০ শাওয়াল ১৪৪০

এক দশকের মধ্যে

সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মুখে

সংবাদ :
  • অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

| ঢাকা , বুধবার, ১২ জুন ২০১৯

image

  • ব্যাংক খাতে সমস্যা সমাধানে সরকার ব্যর্থ
  • প্রতিবছর বাড়ছে রাজস্ব ঘাটতি

গত ১০ বছরের যেকোন সময়ের চেয়ে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মুখে রয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ধানের দাম কমায় কৃষক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ব্যাংক খাতের চলমান সমস্যা সমাধানে সরকারের সব পদক্ষেপই ব্যর্থ হয়েছে; পুঁজিবাজারেরও একই অবস্থা- কর আহরণ না বাড়ায় প্রতিবছরই রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে, বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতিও বেড়ে চলেছে। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি খুবই চাপের মুখে রয়েছে। এসব সমস্যা সঠিকভাবে মোকাবিলা না করতে পারলে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জাতীয় অর্থনীতির পর্যালোচনা ও আসন্ন বাজেট প্রসঙ্গ’ শীর্ষক পর্যালোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। এতে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সিনিয়র গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। সিপিডি এসব চাপ মোকাবিলায় ১০টি সুপারিশ তুলে ধরেছে।

ধানের দাম কমায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কৃষক ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা এসব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা দেয়ার সুপারিশ করছি। এতে সরকারের ব্যয় হবে ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ১ কোটি ৮০ লাখ কৃষকের ব্যাংক হিসাবে টাকাটা সহজে পৌঁছে দেয়ার সুযোগও রয়েছে। রপ্তানিখাতে ঢালাওভাবে ৫ শতাংশ প্রণোদনা দাবি করা হচ্ছে, এতে লাগবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। ফলে কৃষকদের সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বেশি নয়। এটা দিলে তা যুক্তিযুক্ত ও সাম্যবাদী আচরণ হবে। গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি এখন শহরে চলে আসছে। এরপর সেটা শহর থেকে বিদেশে চলে গেছে। এটা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে টিকে থাকা বাংলাদেশের কৃষকের পক্ষে সম্ভব হবে না।

ব্যাংক খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকিং খাত নিয়ে যে কয়টি পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলো কাজে তো আসেনি বরং সবগুলোই ক্ষতিকর হয়েছে। গত জানুয়ারি অর্থমন্ত্রী বলেছেন, খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়বে না। অথচ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। এক টাকা বাড়বে না বলার পর ১৭ হাজার কোটি টাকা বাড়লো। ব্যাংকখাতে যারা সংকট সৃষ্টি করছে তাদের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংকের সুদের হার নিয়ে নাড়াচাড়া করে ব্যাংকিং খাতের সমস্যার সমাধান হবে না। এই খাতে যদি সুশাসন আনা না যায় এবং যারা ব্যাংকের টাকা তসরুফ করেছে তাদের বিচারের আওতায় না আনা যায় তাহলে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমবে। এটা কোন দেশ ও জাতির জন্য ভালো নয়। সুদহার নিয়ে নাড়াচাড়া করে যে কিছু করা যাবে না, তার প্রমাণ হলো- সুদের হার কমে গেলেও ব্যক্তি খাতের ঋণ প্রবাহ বাড়ছে না। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকে কেউ টাকা রাখছে না। যারা ঋণ নিচ্ছে তারাও ফেরত দিচ্ছে না।

বাজেট ঘাটতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিবছরই রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে প্রথম ৯ মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৫০ হাজার কোটি টাকা বলা হলেও বছর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। গত ১০ বছরে যেকোন সময়ের চেয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি চাপের মুখে আছে। এর অনুসঙ্গগুলো হলো- কর আহরণে অপারগতা। এটা বাংলাদেশের উন্নয়নে একটা অমোচনীয় প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে। এটাকে যদি অতিক্রম করা না যায় তাহলে বাংলাদেশের উন্নয়নের যে অভিলাস তা ব্যর্থ হবে। অন্য উৎস থেকে বিনিয়োগের চেষ্টা করা হলে সামষ্টিক অর্থনীতির পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

লেনদেন ঘাটতি চরম আকার ধারণ করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, কর আহরণ করতে না পারায় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় ভালো হলেও উচ্চ আমদানির কারণে লেনদেনের ঘাটতি বাড়ছে। এতে দেশের বৈদেশিক মজুদ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। কিছুদিন আগে ৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতায় থাকলেও এখন পাঁচ মাসে নেমে এসেছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের টাকার মান অবনমন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত ও চীন তা করেছে। আমাদের টাকার ৩ শতাংশ অবনমন করা উচিত। কারণ বর্তমানে মূলস্ফীতির হার ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থায় টাকার অবনমন করা হলে মানুষের পক্ষে সহ্য করা সহজ হবে। এ সময় কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া উচিত হবে না এমন অভিমত তুলে ধরে তিনি বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হলে তা আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ব্যত্যয় ঘটবে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে- ঘুষ, অনুপার্জিত আয়, কালো টাকা, পেশি শক্তির মাধ্যমে উপার্জন করা, সেগুলোকে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হবে।

পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমরা পুঁজিবাজারকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করাতে পারতাম। আমরা সঞ্চয়পত্রের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। এর থেকে বের হওয়ার জন্য প্রয়োজন। অন্যদিকে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগাতে হবে। আমরা সঠিকভাবে পুঁজিবাজারকে কাজে লাগাতে পারছি না। পুঁজিবাজারকে কাজে লাগিয়ে সরকারি বড় বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট।

অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বিশ্লেষণ করে দেখান, বোরো মৌসুমে কৃষকের ধান উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে, বিপরীতে দাম কমেছে। তিনি বলেন, হঠাৎ কৃষি খাতে মজুরিও বেড়েছে। এটা সামাল দিতে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। পর্যালোচনায় সামষ্টিক অর্থনীতি, মুদ্রার বিনিময় হার, আমদানি-রপ্তানি, পুঁজিবাজার, ব্যাংক খাত, রাষ্ট্রমালিকানাধীন কারখানাসহ সামগ্রিক চিত্র উঠে আসে। সংস্থাটি কর আদায় বাড়ানো, মুদ্রার বিনিময় হারে ব্যবস্থাপনা, বিলাসপণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার হুকুমের বদলে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া এবং সর্বোপরি সুশাসনের ওপর জোর দিয়েছে। ব্রিফিংয়ে সিপিডির পক্ষ থেকে ১০টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- রাজস্ব আহরণের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, সরকারি ব্যয় সুশৃঙ্খলভাবে করা, যাতে অবচয় না হয়, কর ছাড়ের হিসাব সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার সমন্বয় করা এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে, প্রত্যেক কৃষককে ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে, ব্যাংক কমিশন গঠন ও সুদের হার বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর ছেড়ে দিতে হবে, পুঁজিবাজারের সংস্কারের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিতে হবে, সরকারি প্রতিষ্ঠান অডিট করে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে, সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং টাকার অবমূল্যায়ন করতে হবে।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটস উম্মে শেফা রেজবানা, মোস্তফা আমির সাব্বিহ, সারাহ সাবিন খানসহ অন্য গবেষকরা।